চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার গ্রামীণ সড়কগুলোর বেহাল দশা’য় চরম দুর্ভোগে ফেলেছে স্থানীয় কয়েক লক্ষাধিক মানুষকে। উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দীর্ঘদিন সংস্কারবিহীনভাবে পড়ে আছে। খানাখন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে রিকশা, সিএনজি, ভ্যান, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও জরুরি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সসহ নানান যানবাহন। কোনো কোনো স্থানে বৃষ্টির দিনে পানি জমে হেঁটে চলাও হয়ে ওঠে দুঃসাধ্য। হেলে দুলে জীবন হাতে নিয়েই চলছে যানবাহন। এসব সড়কের দ্রুত সংস্কার ও টেকসই উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।সারেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার ঠাকুরদীঘি থেকে ছত্ত্বরভূঞার হাট সড়কের দুর্গাপুর বাজার পেরোতেই দেখা যায় বড় বড় গর্ত। প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে কোনো দৃশ্যমান রাস্তা নেই বললেই চলে। কোথাও উঠে গেছে কংক্রিট, কোথাও জমে আছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। এই পথে রিকশা, সিএনজি কিংবা পিকআপ চালাতে হলে চালকদের নিতে হয় চরম ঝুঁকি। গর্তে পড়ে প্রায়ই উল্টে যায় গাড়ি। বৃষ্টির দিনে অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।অন্যদিকে, নিজামপুর থেকে সাহেরখালী ভোর বাজার পর্যন্ত ডিসি ওবায়দুল্লাহ সড়কের অবস্থাও করুণ। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করে শত শত স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মজীবী মানুষ। পদুয়া থেকে মনিরহাট পর্যন্ত অংশে গাড়ির চাকা যত না চলে, তার চেয়ে বেশি কাঁপে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ—সকালে স্কুলে যেতে সময়মতো পৌঁছানো যায় না, বাস কিংবা সিএনজি মাঝপথে থেমে থাকে গর্তে পড়ে গিয়ে। এবিষয়ে স্কুল শিক্ষক হামিদা আবেদিন পলি বলেন, “নিজামপুর থেকে ভোর বাজার পর্যন্ত এই সড়কে চলাচল করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। দ্রুত সংস্কার দরকার।”অপরদিকে, উপজেলার দক্ষিণের বড়দারোগাহাট-বগাচতর বেড়িবাঁধ সড়কের চিত্র আরও করুণ। একসময় গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে দিয়ে মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মানুষ যাতায়াত করলেও বর্তমানে তা প্রায় বন্ধ। এলাকাবাসী বিকল্প রাস্তায় ঘুরপথে যাতায়াত করছেন।এবিষয়ে হাইতকান্দি ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. ছালাহ উদ্দিন বলেন, “বিগত তিন-চার বছর ধরে সড়কটির এমন বেহাল দশা। সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ চোখে পড়ে না।”এছাড়াও করুণ পরিনতির দেখা মিলে জোরারগঞ্জ-মুহুরীপ্রজেক্ট সড়কটি। প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের জোরারগঞ্জ বাজার থেকে ইছামতি মন্দির পর্যন্ত এক কিলোমিটার কিছুটা ভালো থাকলেও বাকি অংশ একেবারে চলাচলের অনুপযোগী। বিষুমিয়ারহাট থেকে আজমপুর বাজার পর্যন্ত দুই কিলোমিটার অংশে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা। ছোট-বড় গর্তে ভরা এই পথ বর্ষায় রূপ নেয় কাদার সমুদ্রে। এমন অবস্থায় হঠাৎ ব্রেক কষে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারায়, গর্তে পড়ে বিকল হয়ে যায়। কেউ কেউ গাড়ি ঠেলে তুলতে হয়।এবিষয়ে সড়কটি দিয়ে সিএনজি চালক শরীফ হোসেন বলেন, “প্রতিদিন গাড়ি চালাই কিন্তু মনে হয় জীবনটা যেন ঝুঁকিতে রেখে চলছি। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।”ওচমানপুর এলাকার বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বলেন, “রাস্তার কাজ হলেও নিম্নমানের কারণে এক মাসের মধ্যে সব ভেঙে যায়। এতে করে শুধু সময় নয়, খরচও দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে।”এই সড়কের দুরবস্থার প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপরও। মো. আনোয়ার হোসেন নামে এক অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলে প্রায়ই স্কুলে দেরি করে পৌঁছায়। শিক্ষক রাগ করেন। অথচ সমস্যাটা তো ছেলের নয়, রাস্তায়।”পিকআপ চালক আরিফ হোসেন বলেন, “লোড গাড়ি গর্তে পড়ে আটকে যায়, সময় নষ্ট হয়, যন্ত্রপাতিও নষ্ট হয়। ঠিকঠাক রাস্তা থাকলে সময়মতো মালামাল পৌঁছানো যেত।”উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী মো. দিদারুল আলম জানান, “আমি কয়েকদিন আগে এখানে যোগদান করেছি। সব সড়কের অবস্থা খতিয়ে দেখে সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, “বড়দারোগাহাট-বগাচতর বেড়িবাঁধ সড়ক সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় পড়ে। সেখানে ইতোমধ্যে টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে, এখন কাজ শুরু হওয়ার অপেক্ষা।”চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোসলেহ উদ্দিন বলেন, “জোরারগঞ্জ-মুহুরীপ্রজেক্ট সড়কসহ মোট ১৮ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়নের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।শিগগিরই কাজ শুরু হবে। তিনি আরও জানান, জোরারগঞ্জ-মুহুরীপ্রজেক্টের ৭ কিলোমিটার অংশ ১৮ ফুট থেকে ৩৪ ফুট প্রশস্ত করে নতুনভাবে কার্পেটিং করা হবে। এছাড়াও মুহুরীপ্রজেক্ট থেকে বেড়িবাঁধ হয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের মূল গেট পর্যন্ত নতুন একটি সড়কের বাজেট অনুমোদন হয়েছে।”এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
