বাংলাদেশের খামার ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সংমিশ্রণে প্রাণিসম্পদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে হিট স্ট্রেস বা তাপচাপজনিত চাপ। এতে কমে যাচ্ছে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আচরণগত সমস্যা। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-প্রাণিরা নিজেদের অস্বস্তি প্রকাশ করতে না পারায় খামারিরা তা আগে থেকে বুঝতে পারেন না।এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পশুপালন অনুষদের ৫৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আল মোমেন প্রান্ত উদ্ভাবন করেছেন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-চালিত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, যা পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম।প্রযুক্তিটি উন্নত সেন্সরের মাধ্যমে খামারের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত Temperature-Humidity Index (THI) অনুসারে পরিবেশের হিট স্ট্রেস পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে। THI-এর ভিত্তিতে সিস্টেমটি বুঝতে পারে প্রাণিরা অস্বস্তিতে আছে কি না, এবং সেই অনুযায়ী অটোমেশন সিস্টেম সক্রিয় হয়ে খামারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।হিট স্ট্রেস যখন সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখন সিস্টেমটি নিজে থেকেই ব্যবস্থা নেয়, আবার পরিবেশ স্বাভাবিক হলে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। ফলে অপ্রয়োজনীয় শক্তি অপচয় হয় না এবং খামার রয়ে যায় পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর।আল মোমেন প্রান্ত বলেন, ‘উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে প্রাণিসম্পদের মধ্যে তাপচাপজনিত চাপ তৈরি হয়, যা দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন হ্রাস করে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনায় হিট স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ এখন একটি বৈজ্ঞানিক অগ্রাধিকার।’তিনি বলেন, ‘আমার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি উন্নত সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে কাজ করে, যা প্রাণির জন্য আরামদায়ক তাপমাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করে। এর মাধ্যমে শুধু উৎপাদনশীলতা নয়, প্রাণিসম্পদের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার নিশ্চিত করাও সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি, এই প্রযুক্তি আগামীদিনের বিজ্ঞানভিত্তিক ও দায়িত্বশীল খামার ব্যবস্থার পথপ্রদর্শক হবে।’ আল মোমেন প্রান্ত আরও বলেন, “এই সিস্টেমের একটি বড় সুবিধা হলো- এটি সম্পূর্ণভাবে স্বয়ংক্রিয় এবং মানুষনির্ভর নয়। খামারে কেউ উপস্থিত না থাকলেও এটি নিজস্ব ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে প্রাণির ‘অবস্থা’ বুঝে প্রযুক্তির সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা প্রাণিসম্পদ কল্যাণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।এছাড়া এই উদ্ভাবন খামারের অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বিদ্যুৎ ব্যয় ও শ্রমব্যয় কমিয়ে ফার্ম পরিচালনায় সময় ও খরচ সাশ্রয় করে। অর্থাৎ, এটি একসঙ্গে খামারির আর্থিক লাভ, প্রাণিসম্পদের কল্যাণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।” এই গবেষণার তত্ত্বাবধানে ছিলেন বাকৃবির অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রকিবুল ইসলাম খান, এবং বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা দিয়েছেন সহকারী অধ্যাপক এস. এম. আরিফুল ইসলাম।এই উদ্ভাবন শুধু একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, এটি প্রাণিসম্পদের প্রতি সহানুভূতি, পরিবেশ সচেতনতা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির এক মেলবন্ধন। ভবিষ্যতের খামার ব্যবস্থাপনা যেখানে বিজ্ঞান ও মানবিকতা একসাথে হাঁটে, এই উদ্ভাবন সেখানেই পথ দেখায়।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
