দিনাজপুরের হিলিতে হাসপাতাল থেকে রোগীর ছাড়পত্র দেওয়াকে ঘিরে মশিউর রহমান নামের এক চিকিৎসককে মারধর করে পিটিয়ে আহত করাসহ মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল্লাহ আল মামুন নামের এক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতার বিরুদ্ধে। প্রতিবাদে দেড় ঘণ্টা কার্যক্রম বন্ধ রাখেন হাসপাতালে কর্মরতরা। ঘটনার কারণে চিকিৎসকদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) দুপুর পৌনে ২টার দিকে হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের সামনে এই ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ আল মামুন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন হাকিমপুর পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়কের দায়িত্বে রয়েছেন। পরবর্তীতে হাসপাতালের এক স্টাফের মাধ্যমে সেই মোবাইল ফেরত দেয় সে।হাসপাতালে থাকা রোগীর স্বজন নাসরিন আকতার বলেন, ডাক্তার এসে ওয়ার্ডের সব রোগীকে দেখার পর যখন কেবিনে থাকা রোগীকে দেখে নিচে নেমে যায়, সে সময় কেবিনের লোক প্রচুর চিৎকার চেচামেচি করছিল। ডাক্তারকে ‘বাপ করে ডাকাবো, চাকরি খাবো, পিটাবো’ এই ধরনের হুমকি ধামকি দিতে থাকে। এসব শুনে আমি নিচে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর এসে শুনি ডাক্তারকে নাকি মারধর করেছে, সেসব নিয়ে নিচে গোলমাল চলছে।হাসপাতালের ২নং কেবিনে থাকা রোগীর স্বজন ফাইম বাবু বলেন, আমার বাবাকে দেখার পরে পাশের ৩নং কেবিনে ঢোকে ডাক্তার। এসময় সেখানে থাকা রোগীকে বলে, ‘তোমার সময় শেষ, তুমি বাড়ি চলে যাও, আবার কিছু দিন পরে আসো বা অন্য কোন হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলে।’ এই নিয়ে ডাক্তার ও রোগীদের মাঝে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখি। পরে আমি নিচ থেকে ওষুধ নিয়ে এসে শুনি তারা ডাক্তারকে মারধর করেছে, যা মোটেই ঠিক করেনি।হাসপাতালে কর্মরত ফয়সাল হোসেন বলেন, দুপুর দেড়টার দিকে স্যার নামাজের উদ্দেশ্যে বাইরে যাচ্ছেন, ঠিক এমন সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাকে রুম থেকে বাইরে আসতে বলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন ব্যক্তি গিয়ে স্যারকে মুখে ঘুষি ও শরীরে লাথি মারতে থাকে। সাথে সাথে আমরা গিয়ে সেখানে তাদেরকে আটকানোর চেষ্টা করি। কোনভাবেই তাদেরকে থামানো যাচ্ছিল না। জরুরি বিভাগ থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালের সামনে ৪/৫ জন মিলে তার গলা চেপে ধরে। আমি আটকাতে গিয়ে তাদের হামলায় আহত হয়েছি।হাসপাতালে কর্মরত উপসহকারি কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার রুহুল আমিন বলেন, তারা আমাদের চিকিৎসককে মারধর করে আবার তার মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় আমরা যারা কর্মরত ছিলাম, সকলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ি। এই ঘটনায় জরুরি সেবা বাদে সকল ধরনের সেবা দেড় ঘণ্টার মতো বন্ধ রাখা হয়। আমরা তো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ছয় মাস আগেও আমাদের আরেক স্যারের উপর হামলা হয়েছিল, তার কয়েক মাস না যেতেই আজকে আবার একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটলো। এই অবস্থার মধ্যে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করবো কীভাবে? আমাদের নিজেদেরই যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে কিভাবে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাবো?ভুক্তভোগী চিকিৎসক মশিউর রহমান জানান, উমর ফারুক ও সুখি নামের দুজন রোগী আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ১৪ দিন ধরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩নং কেবিনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের চিকিৎসা চলমান আছে, তাদের বড় ধরনের কোন সমস্যা নেই। আজ সকালে রাউন্ডে গিয়ে অবস্থা ভালো হওয়ায় তাদের বাড়িতে বিশ্রাম নেওয়ার কথা বলা হয়। সেই লক্ষ্যে তাদের দুজনকে ছুটি দেওয়ার কথা জানালে তারা রেগে যায় এবং খারাপ ব্যবহার করে ছুটি নিবে না বলে জানায়। এরপরে আমাকে সহ নার্সদের হুমকি ধামকি প্রদান করে। পরবর্তীতে দুপুর ১২টার দিকে মামুন নামের স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হুমকি দেয় তাকে ছুটি না দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি সেই রোগীকে ছুটি দিয়ে দিই। দুপুর দেড়টার একটু পরে জরুরি বিভাগের সামনে পেয়ে মামুন ও তার সহযোগীরা আমার উপর আক্রমণ করে। তারা মুখে ঘুষি মারে, শরীরে লাথি মারে, পরবর্তীতে আমার গলা চেপে ধরে। এসময় হাসপাতালে কর্মরতরা এগিয়ে আসলে তারা চলে যায়। তবে এসময় তারা আমার ব্যবহৃত মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে যায়।হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ভর্তি রোগীকে ছুটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে জরুরি বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক মশিউর রহমানের উপর হামলা চালিয়ে শারীরিকভাবে আঘাত ও লাঞ্চিত করা হয়েছে। এতে করে আমরা হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকসহ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। সেই সাথে এই ঘটনাকে ঘিরে সকলেই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। হাসপাতালে মাত্র ২জন চিকিৎসক দিয়ে উপজেলার সকল মানুষের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। এমন সময়ে এই ধরনের হীনমন্যতামূলক আচরণ ও আক্রমণ কোনভাবেই সহ্য করার মতো নয়। আমরা এই ঘটনার আশু প্রতিকার ও যথাযথ বিচার প্রত্যাশা করছি। এ বিষয়ে সিভিল সার্জন স্যারকে অবগত করা হয়েছে, সেই সাথে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে।হাকিমপুর পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক মামুন বলেন, ডাক্তার আমাকে ধাক্কা দেয়, তখন এই ঘটনা ঘটে। তবে আমি তাকে মারিনি, আমার সাথের লোকজন এই ঘটনা ঘটিয়েছে। উনার মোবাইল ফোন ঘটনার পরপরই ফেরত দেওয়া হয়েছে।হাকিমপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দুপুরের দিকে হাসপাতাল থেকে ডাক্তার পরিচয়ে একজন ফোন করে বলেন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ডাক্তারকে মারপিট করা হচ্ছে। সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে মোবাইল টিম পাঠানো হয়। কিছুক্ষণ পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমাকে বিষয়টি জানালে আমি নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই।এসময় ডাক্তারদের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখতে পাই। তবে এ বিষয়ে যদি ডাক্তাররা কোন ধরনের আইনগত সহায়তা চান বা কোন অভিযোগ দেন, তাহলে আমরা বিধি মোতাবেক সার্বিক আইনগত সহায়তা করবো।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
