নগরকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখতে ২০১৫ সালে আড়াই কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন স্থানে এবং সড়কের মোড়ে মোড়ে ২৬১টি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল।তবে সরকার নগরবাসীর সুবিধার স্বার্থে এত টাকা ব্যয় করে সিসি ক্যামেরা লাগালেও আজ পর্যন্ত তার কোনো সুফল পাওয়া যায়নি এবং নগরবাসীর জন্য কোনো উপকারে আসেনি।ইতোমধ্যে চুরি হয়ে গেছে অধিকাংশ ক্যামেরাসহ ক্যামেরার ক্যাবল। তবে সিটি করপোরেশনের কর্তৃপক্ষ বলছেন, নগরীতে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরাগুলোর বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রথম থেকেই এ ক্যামেরাগুলো যেভাবে চালু করার কথা ছিল, সেভাবে চালু হয়নি।তাই ক্যামেরাগুলো স্থাপন করার পর দীর্ঘ একযুগের বেশি সময় ধরে ল্যাম্পপোস্টে বিকল অবস্থায় ঝুলছে। ব্যবহার না করা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সিসি ক্যামেরাগুলো নষ্ট এবং চুরি হয়ে গেছে। নতুন করে বরাদ্দ পেলেই খুব শীঘ্রই বিষয়টি দেখা হবে।এদিকে সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা ও সাবেক মেয়রদের উদাসীনতা আর অবহেলাকে দায়ী করেছেন বরিশালের সচেতন মহল।নগরীর সদর রোড এলাকার বাসিন্দা ইমরান মল্লিক বলেন, সড়কের মোড়ে মোড়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের মাথায় একযুগের বেশি সময় ধরে অচল অবস্থায় ঝুলছে সিটি করপোরেশনের সিসি ক্যামেরা।তবে দেখে বোঝার উপায় নেই যে ল্যাম্পপোস্টে থাকা সিসি ক্যামেরাগুলো দীর্ঘ বছর ধরে কার্যক্রম নেই। শুধু তাই নয়, সিসিটিভি নিয়ন্ত্রণ বুথও অচল। এভাবেই অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে সিসি ক্যামেরা ও এর বুথগুলো। কোনো কোনো বুথের দরজা জানালাও নেই। নেই বিদ্যুৎ সংযোগও। বেশিরভাগ এলাকার সিসি টিভির তার ঝুলে আছে, তবে ক্যামেরার কোনো হদিস নেই। আবার ক্যামেরা আছে, সংযোগ নেই।সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নগরের সিটি করপোরেশন সংলগ্ন তিন রাস্তার মোড় রাজাবাহাদুর সড়ক, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বান্দ রোড, বঙ্গবন্ধু উদ্যান, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, আমতলা মোড়, লঞ্চ ঘাট, নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল, রূপাতলী গোল চত্বর, সদর রোড, জিলা স্কুলের মোড়, হাসপাতাল রোড, জেলখানার মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা রয়েছে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষসহ ক্যামেরাগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।বরিশাল সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় নগরীর নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর সিটি করপোরেশন একটি প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করে অনুমোদন নেয়। ২০১৫ সালের শেষ দিকে ২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ওই প্রকল্পের আওতায় নগরীর বিভিন্ন স্থানে ২৬১টি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু হয়। ক্যামেরাগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৮টি বুথ নির্মাণ করা হয়।২০১৬ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। তখন সিটি করপোরেশন ও মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে দুটি মনিটর স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।নগরবাসীর অভিযোগ, তখনকার সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামালের সময় সিসি ক্যামেরাগুলো নগরীতে স্থাপন করা হয়েছিল। প্রথমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়।পরে ২০১৭ সালে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে সংযোগ দেওয়া হলেও করপোরেশন সিসি ক্যামেরা পরিচালনায় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তখনকার মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার একাধিকবার অনুরোধ করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। এরপর ক্যামেরাগুলো আর কোনো কাজে আসেনি। সুফলও আজ পর্যন্ত পায়নি তারা।সদর রোডের বাসিন্দা পাপ্পু হোসেন বলেন, সিটি করপোরেশনে দায়িত্বশীল পদে মেয়র ও কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকলেও আজ পর্যন্ত নগরবাসীর কথা চিন্তা করে কেউই অচল সিসি ক্যামেরা সচল করতে কোনো উদ্যোগ নেননি।তিনি আরো বলেন, আমার প্রশ্ন একটাই, সরকারের এত টাকা ব্যয় করে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে কী লাভ হলো? যে ক্যামেরা চলে না, এবং চালানোর মতো কেউর কোনো আগ্রহ বা দায়িত্ব নেই, তাহলে কেন সরকারের টাকা খরচ করা হলো?নগরীর সাধারণ বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, বহু টাকা ব্যয় করে সিটি ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও তার কোনো সুবিধা আজ পর্যন্ত আমরা পাইনি। এমন অবস্থায় শহরের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তাই পুলিশ প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি আমাদের।জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম বরিশালের সভাপতি ও সচেতন নাগরিক অ্যাডভোকেট মহসিন মন্টু বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে যারা মেয়র ছিলেন তারা সুস্থ এবং স্বাভাবিক ছিলেন না। তাদের কার্যক্রমই ছিল অস্বাভাবিক ও অসুস্থ। শহরের গুরুত্বপূর্ণ হলো সিসি ক্যামেরা, তা নিয়ে তাদের ভাবার সময়ই ছিল না। তারা নিজেদের কার্যক্রম নিয়ে ছিলেন, নাগরিকদের নিয়ে ভাবার সময় ছিল না।বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী বলেন, শহরে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরাগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রথম থেকেই এ ক্যামেরাগুলো যেভাবে চালু করার কথা ছিল, সেভাবে চালু হয়নি। তাই অচল অবস্থা ঝুলছে। বরাদ্দ পেলেই আমরা অচল ক্যামেরা সচল করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: রায়হান কাওছার নাগরিক নিরাপত্তায় নিজেদের নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে ক্যামেরাগুলো পুনঃস্থাপন করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য মতে, গত জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নগরীতে থাকা ১২০টি সিসি ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সেগুলো ঠিক করে পুনঃস্থাপন করা হবে।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
