চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ভূচিত্রে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ পর্যন্ত তিনবার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এখানে বিজয়ী হন। তবে এরপর থেকে জাতীয় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে বিএনপি এ আসনে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি।দীর্ঘদিনের বিভক্তি, গ্রুপিং, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও সাংগঠনিক দুর্বলতায় যখন স্থানীয় বিএনপি এক রকম কোণঠাসা—তখন হঠাৎই শুরু হয় ভিন্ন সুরে পথচলা। দলের উচ্চপর্যায় থেকে আক্ষরিক অর্থেই হস্তক্ষেপ আসে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করতে নির্দেশ দেন।এই নির্দেশ বাস্তবায়নে মাঠে নামেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম। তাঁর উদ্যোগেই দীর্ঘদিন পর সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া বিএনপির সাতটি সক্রিয় গ্রুপের শীর্ষ নেতারা একই টেবিলে বসেন।গত ১৭ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদে একটি রেস্টুরেন্টে হয় সেই ঐতিহাসিক বৈঠক। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া বিএনপির বিভিন্ন গ্রুপের শীর্ষ নেতারা দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে একত্র হন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়—আর কোনো গ্রুপিং নয়, পুরনো বিভেদ পেছনে ফেলে সবাই মিলে কাজ করা হবে।১৭ জুলাইয়ের বৈঠকের পরপরই শুরু হয় ‘মধ্যাহ্নভোজ কূটনীতি’। ১৯ জুলাইয়ের দ্বিতীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়—রাজনৈতিক বৈঠকের চেয়ে কর্মী-নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ, একসাথে খাওয়া-দাওয়ার মধ্য দিয়েই আস্থার সেতুবন্ধ গড়ে তোলা হবে।গত ২১ জুলাই দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান নিজ বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। সেখানে অংশ নেন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। এরপর ২৩ জুলাই একই ধরণের আয়োজন হয় শেফায়েত উল্লাহ চক্ষুর বাড়িতে।এসব অনুষ্ঠানে অতীতের মতবিরোধের বিষয়ে কেউ আলোচনা করেননি। বরং সবাই খোঁজ নিয়েছেন একে অপরের পরিবারের, রাজনৈতিক ভবিষ্যতের, এমনকি ব্যক্তিগত সুস্থতার। এক সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বীর বাড়িতে চা খেতে বসেছেন পুরনো বিরোধীরা।দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এ আসনটিকে মূলত জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা বলা হলেও, বাস্তবতা হচ্ছে জামায়াত কখনোই এককভাবে জয় পায়নি। তারা সবসময় বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ থেকে জয়লাভ করেছে। আমি মনে করি, বিএনপি যদি সত্যিকার অর্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে, তাহলে আসন্ন নির্বাচনেই এই আসনটিতে আমরা জয়লাভ করতে পারবো।’তিনি আরও বলেন, ‘আসনটি ঘিরে যে ঐক্যপ্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, তা নিছক কৌশল নয়, এটি সময়ের দাবি। তৃণমূলে কর্মীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে নির্বাচনী মাঠে বিএনপি আগের চেয়ে বেশি সংঘবদ্ধ হবে।’চট্টগ্রাম-১৫ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে জামায়াত ইসলামীর সাংগঠনিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী বিজয়ী হন।বর্তমানেও সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার ইউনিয়ন পর্যায়ে জামায়াতের সাংগঠনিক প্রভাব আছে। প্রতিটি ইউনিয়নে জামায়াত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় বিএনপির ভেতরে যে ঐক্য তৈরির চেষ্টা চলছে, সেটি যদি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ আবারও এক উত্তপ্ত নির্বাচনী এলাকা হয়ে উঠবে।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
