আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বুধবার (২৩ জুলাই) ‘জুলাইয়ে হাসিনার ৩৬ দিন (Hasina 36 Days in July)’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশ করেছে। এতে গত বছরের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া গোপন নির্দেশনার ভয়ংকর বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি আজ বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) প্রকাশিত হবে বলে জানা গেছে।আল জাজিরার দাবি, তাদের হাতে এসেছে গোপনে রেকর্ড করা একাধিক ফোনালাপ, যেখানে শেখ হাসিনা নিজেই ছাত্রদের উপর গুলি চালানোর ‘ওপেন অর্ডার’ দেওয়ার কথা বলেছেন। শুধু তাই নয়, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর ঘটনাও উঠে এসেছে রেকর্ডিংয়ে। প্রামাণ্যচিত্রটিতে ২০২৪ সালের ওই আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ মহলের ভেতরের আলোচনা, সিদ্ধান্ত ও দমননীতির বিস্তৃত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।১৫০০ নিহত, গুলি ছোড়া হয়েছে ৩০ লাখের বেশিতিন সপ্তাহব্যাপী চলা আন্দোলনে ১৫০০ জন নিহত হয়েছেন, ২৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন এবং সরকার দলীয় নিরাপত্তা বাহিনী ৩০ লাখেরও বেশি রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে দাবি করেছে আল জাজিরা।প্রকাশিত একটি ফোনালাপে, ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে শেখ হাসিনা ঢাকার দক্ষিণের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপশকে বলেন, ‘আমার নির্দেশ তো আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। আমি তো পুরোপুরি ওপেন অর্ডার দিয়ে দিয়েছি। এখন ওরা মারবে, যেখানে পাবে সেখানে গুলি করবে… আমি তো এতদিন থামিয়ে রেখেছিলাম। আমি ছাত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছিলাম।’অন্য এক রেকর্ডিংয়ে তিনি বলেন, ‘যেখানে তারা কোনো জটলা দেখছে, সেটা উপর থেকে—এখন তো উপর থেকেই হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েক জায়গায় শুরু হয়ে গেছে। শুরু হয়ে গেছে। কিছু সরেছে।’প্রামাণ্যচিত্রে একজন চিকিৎসক নিশ্চিত করেন, বহু আন্দোলনকারী হেলিকপ্টার থেকে চালানো গুলিতে নিহত ও আহত হয়েছেন।আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড: ৫ বার বদলানো হয় পোস্টমর্টেমআন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা ছাত্র আবু সাঈদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রামাণ্যচিত্রে দাবি করা হয়, সরকার হুমকি ও ঘুষের মাধ্যমে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ফোনে আবু সাঈদের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট সংগ্রহে তৎপর ছিলেন।তদন্তে জানা গেছে, রিপোর্টটি পাঁচবার পরিবর্তন করে গুলির কোনো উল্লেখ মুছে ফেলা হয়। পরে আতঙ্কে থাকা আবু সাঈদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করানো হয়।ইন্টারনেট বন্ধে ‘কৌশল’আল জাজিরার দাবি, তারা ফাঁস হওয়া গোপন নথিপত্রে দেখেছে কীভাবে শেখ হাসিনার সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে সহিংসতার ছবি বিশ্ববাসীর কাছ থেকে গোপন রেখেছিল।আওয়ামী লীগের বক্তব্য: রেকর্ডিং অস্বীকারআল জাজিরাকে পাঠানো বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ বলেছে, শেখ হাসিনা কখনও ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহারের নির্দেশ দেননি এবং ১৮ জুলাইয়ের রেকর্ডিংকে ভুয়া বলেছে তারা। একইসঙ্গে, আবু সাঈদের পরিবারের আতঙ্ক নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেও, সরকার বাহিনীর অসদাচরণ তদন্তে শেখ হাসিনার আগ্রহ ছিল বলেও দাবি করেছে।তারা আরও জানায়, ইন্টারনেট বন্ধের কারণ ছিল আন্দোলনকারীদের ‘ভাঙচুরে’ ইন্টারনেট অবকাঠামোর ক্ষতি।আল জাজিরার আই-ইউনিট গোপনে রেকর্ড করা ফোন কল পেয়েছে যা প্রকাশ করে যে কীভাবে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র বিক্ষোভকারীদের উপর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।‘হাসিনা – ৩৬ ডেজ ইন জুলাই’স’ নামে অনুসন্ধানী অনুষ্ঠানটি দর্শকদের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শাসনের শেষ দিনগুলিতে তার ঘনিষ্ঠ মহলে নিয়ে যায়।তিন সপ্তাহের রক্তাক্ত বিক্ষোভে পনেরো শতাধিক মানুষ নিহত হয়, পঁচিশ হাজারেরও বেশি আহত হয় এবং শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বাহিনী ত্রিশ লক্ষেরও বেশি গুলি ছোড়ে।শেখ হাসিনার করা ফোন কলগুলি তার নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা রেকর্ড করেছিল, একটি নির্মম নেটওয়ার্ক যা তাকে বাংলাদেশকে শক্ত হাতে শাসন করতে সাহায্য করেছিল। আল জাজিরার তদন্ত প্রকাশ করে যে, কীভাবে সেই গুপ্তচররা যারা তার রেকর্ড করা প্রমাণ রক্ষা করতো, যারা এখন একটি শাসনব্যবস্থার ‘পদ্ধতিগত নৃশংসতা’ করার অভিযোগে অভিযুক্ত।১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে একটি রেকর্ডিংয়ে শেখ হাসিনা ঢাকা দক্ষিণের প্রাক্তন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে বলেন, ‘আমার নির্দেশ ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। আমি সম্পূর্ণরূপে একটি উন্মুক্ত আদেশ জারি করেছি। এখন তারা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে, যেখানেই পাবে সেখানেই গুলি করবে…..এটা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আমি এখন পর্যন্ত তাদের থামিয়েছি….আমি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভাবছিলাম।’রেকর্ডিংগুলি আকাশ থেকে বিক্ষোভ দমন করার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহারের কথাও প্রকাশ করে: ‘…যেখানেই তারা কোনও সমাবেশ লক্ষ্য করে, তা উপর থেকে—এখন এটি উপর থেকে করা হচ্ছে—এটি ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি জায়গায় শুরু হয়েছে। এটি শুরু হয়েছে। কেউ কেউ সরে গেছে।’ছবিতে, একজন ডাক্তার হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে অনেক বিক্ষোভকারী নিহত এবং আহত হওয়ার দাবির সত্যতা প্রমাণ করেন।অনুষ্ঠানটি আরও প্রকাশ করে যে, ছাত্র আবু সাঈদের পুলিশ হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার কীভাবে হুমকি এবং ঘুষ ব্যবহার করেছিল; তার মৃত্যু জাতীয় ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।গোপন ফোনকল প্রকাশ করে যে শেখ হাসিনার সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র সালমান এফ রহমান কীভাবে সাঈদের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। আমরা প্রকাশ করছি যে বন্দুকের কোনও উল্লেখ মুছে ফেলার জন্য কীভাবে পাঁচবার এটি পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং কীভাবে তার পরিবার, তাদের জীবনের ভয়ে, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে বাধ্য হয়েছিল।অনুষ্ঠানটি আরও প্রকাশ করে যে কীভাবে আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্র আবু সাঈদের পুলিশ হত্যার ঘটনাটি গোপন করার জন্য হুমকি এবং ঘুষের আশ্রয় নিয়েছিল, যার মৃত্যু জাতীয় ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। গোপন রেকর্ডিং দেখায় যে শেখ হাসিনার সবচেয়ে প্রভাবশালী মিত্র সালমান এফ রহমান সাঈদের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন, কীভাবে তার মৃত্যুর সময় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কোনও উল্লেখ মুছে ফেলার জন্য পাঁচবার এটি পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং কীভাবে তাদের নিরাপত্তার ভয়ে সাঈদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে বাধ্য করা হয়েছিল।আল জাজিরার তদন্তকারী ইউনিট কর্তৃক অ্যাক্সেস করা গোপনীয় নথিগুলি ইন্টারনেট বন্ধ করতে এবং সহিংসতার রক্তাক্ত ছবি বিশ্বে পৌঁছাতে না দেওয়ার জন্য হাসিনার সরকার কর্তৃক ব্যবহৃত নোংরা কৌশলগুলি প্রকাশ করে।আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের একজন মুখপাত্র বলেছেন, শেখ হাসিনা কখনও ‘মারাত্মক অস্ত্র’ শব্দটি ব্যবহার করেননি এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের জন্য বিশেষভাবে অনুমোদন বা নির্দেশ দেননি। এটি ১৮ জুলাই ২০২৪ সালের রেকর্ডিংয়ের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক করে।এটি আরও বলেছে যে আবু সাঈদের পরিবার যদি ভয় অনুভব করে তবে এটি দুঃখিত, তবে নিরাপত্তা বাহিনীসহ সম্ভাব্য অসদাচরণের তদন্তের জন্য পূর্ববর্তী সরকারের দৃঢ় সংকল্প সত্য।এটিতে বলা হয়েছে যে শেখ হাসিনা বিশ্বাস করেন যে বিক্ষোভকারীদের দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতির কারণে ইন্টারনেট বন্ধ ছিল।এসকে/এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
