আজ আবু সাইদের শাহাদাৎ বরণের ১ বছর। ছেলের খুনিদের বিচার দেখে মরতে চান শহীদ আবু সাঈদের বাবা-মা। শুধু তাদের ছেলে আবু সাঈদ না, সকল শিক্ষার্থী হত্যার বিচার চান তারা। আল্লাহ যেন ছেলে হত্যার বিচার না দেখিয়ে মৃত্যু না দেন-এটাই কামনা করেন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন।আজকের এই দিনে আবু সাঈদের মৃত্যুতে অগ্নিগর্ভে রূপ নেয় কোটা আন্দোলন। কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। মৃত্যুঞ্জয়ী ছাত্র-জনতার গণপ্রতিরোধের মুখে ৫ আগস্ট টানা ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর আবু সাঈদকে স্মরণের মধ্যদিয়ে নতুন বাংলাদেশ সংস্কারে শুরু হয় নানা কার্যক্রম। কিন্তু বিচার এখনো অধরা। গ্রেপ্তার হয়নি আবু সাঈদ হত্যা মামলার মূলহোতারা। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী ও শিক্ষকসহ সকলের একটাই প্রশ্ন- ‘বিচার হবে তো?’আবু সাঈদ ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিল। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেরোবি সমন্বয়ক ছিলেন। এই আন্দোলনের প্রথম শহীদও তিনি। বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে। বাবা মকবুল হোসেন একজন কৃষক ও মা মনোয়ারা বেগম গৃহিণী। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিল সাঈদ।ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন আবু সাঈদ। তাকে ঘিরে আকাশসম স্বপ্ন ছিল দরিদ্র মা-বাবার। গ্রামের জুনুদেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন আবুু সাঈদ। পরে এলাকার খালাশপীর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন রংপুর সরকারি কলেজে। সেখান থেকেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বপ্ন দেখতেন বিসিএস দিয়ে প্রশাসনে যোগ দেবেন।হতদরিদ্র পরিবারের ভরসা ছিলেন তিনি। কিন্তু কোটার মারপ্যাচে যাতে মেধাবীরা বঞ্চিত না হয়, সেজন্য হাজারো শিক্ষার্থীর সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যুক্ত হয়েছিলেন ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনে’। মৃত্যুর পরও আবু সাঈদের মেধার স্বাক্ষর উজ্জ্বল হয়ে দেখা দেয়। ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষায় পাস করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি পেয়ে উত্তীর্ণ হন। আবু সাঈদ সিজিপিএ ৩.৩০ পেয়ে সম্মিলিত মেধাতালিকায় ১৪তম স্থান অধিকার করে।আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, আমার ছেলের স্বপ্ন ছিল প্রশাসনিক ক্যাডারে যোগ দিয়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ছেলে হারিয়ে আজও আমি আদালতের দোরগোড়ায় ঘুরছি। বিচার চাই, শুধু আমার ছেলের না, সেই দিনের সকল শিক্ষার্থীর হত্যার বিচার চাই। আল্লাহ্ যেন আমার ছেলে হত্যার বিচার না দেখিয়ে মৃত্যু না দেন। আমি বিচার দেখার জন্য বাঁচতে চাই।ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ছেলে হারানোর বেদনা কোনোভাবে সহ্য করা যাচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডের বিচার হলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি পাবো।ছেলেকে হারানোর এক বছর পেরিয়ে গেলেও মা মনোয়ারা বেগম সেই দিনটার কথা ভুলতে পারেননি। ভুলতে পারেননি ছেলের নিথর দেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়ির দুয়ারে আসার সেই ক্ষণের কথা। যেই ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলে ছুটে আসতেন মায়ের কোলে। সেই মায়ের চোখের সামনে এখন ভেসে বেড়ায় ১৬ জুলাই পুলিশের গুলির সামনে বুক টান করে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শেষ দৃশ্যটা। যা ক্যামেরাবন্দি হয়ে কোটি মানুষের অন্তরে গেঁথে আছে।মা মনোয়ারা বেগমও জীবদ্দশায় হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখতে চান। চান সকল হত্যার ন্যায় বিচার। তিনি বলেন, ও আমাকে বলেছিল, আর কষ্ট করতে হবে না। আমি চাকরি করব, তোমাদের সব দায় আমি নেব। আজ সেই ছেলে নেই। আর স্বপ্নও নেই।তিনি আরও বলেন, আমার বুকের সন্তান আর কখনো ফিরে আসবে না, এটা বুঝি। তবু বারবার মনে হয়, ওই দরজাটা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসবে, বলবে—‘মা, খাইছো? আমি এখন কিছুতেই মন দিতে পারি না। চোখ বন্ধ করলেই সেই মুখটা দেখি, যে মুখে কোনো ভয় ছিল না, শুধু বিশ্বাস ছিল।এসকে/এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
