কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে উর্ধতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী পথ (পিডব্লিউ) আনিসুজ্জামান রাজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের শেষ নেই। কর্মচারীদের টাকা আত্মসাৎ থেকে শুরু করে আওয়ামী দোসরদের সংঘবদ্ধ করাসহ আরও বেশ কয়েকটি অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।চলতি বছরের শুরুর দিকে কিশোরগঞ্জে যোগদানের পর থেকেই কার্যালয়ে না এসে গ্রামের বাড়ি মানিকখালি ও কিশোরগঞ্জ শহরের বাসাতেই বেশিরভাগ সময় কাটান রাজন। কালেভদ্রে অফিসে এসে হাজিরা খাতায় সই দিয়ে আবারও চলে যান। কিন্তু তার দায়িত্বে থাকা রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ তদারকি করার থাকলেও তা করতে দেখা যায় না।এদিকে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তিন বছরের অধিক কিশোরগঞ্জে কর্মরত থাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আনিসুজ্জামান রাজনের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠে। রেলওয়ে শ্রমিকলীগের নেতা-কর্মীদের দিয়ে গড়ে উঠে রাজনের রাজত্ব। কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুললেই চলে অন্যত্র বদলির আদেশ। পুনরায় কিশোরগঞ্জে ফিরে পতিত সরকারের দোসরদের সংঘবদ্ধ করে তুলতে পিডব্লিউ রাজন বিভিন্ন কারসাজি করে যাচ্ছেন।রাজনের অধীনে রেলওয়ের ৭৫ কি.মি জায়গা রয়েছে। সেখানে রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন কাজ করেন তার অধীনস্থ কর্মচারীরা এবং তা দেখাশোনা করার জন্য রয়েছে একজন হেড মেইট। হেড মেইটের তত্ত্বাবধানে মোট ১১টি গ্যাং প্রতিদিনই রেললাইনের বিভিন্ন অংশে কাজ করে। রেললাইনের পাশে সাধারণ মানুষ কিছু করলেই সেখানে রাজনের অধীনস্থ কর্মচারীরা রেলের প্রভাব কাটিয়ে চাঁদা দাবি করে দেন পুলিশের হুমকি।এর আগে গত ৩ জুলাই আঠারোবাড়ি গাছ কাটা নিয়ে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে ওসি মো: লিটন মিয়া ক্লোজড হলেও বহাল তবিয়তে আছেন প্রকৌশলী রাজন, যদিও তার লোকেরাই প্রথমে ওই বাড়িতে গিয়ে গাছ কাটায় বাঁধা দেন, পরে রাজন সেখানে পুলিশ পাঠায়।অভিযোগ রয়েছে রাজনের অধীনে ৭নং গ্যাংয়ে কর্মরত ওয়েম্যান কাজ না করেও বেতন তুলছেন আর বেতনের একাংশ দিচ্ছেন তাকে। এ বিষয়ে ৭নং গ্যাংয়ে কর্মরত এক ওয়েম্যান বলেন, ‘বর্তমানে ৭নং গ্যাংয়ে আমরা ৫ জন কাজ করার থাকলেও কিন্তু কাজ করছি ৪ জন। ওয়েম্যান এনায়েত কাজ না করে মিস্ত্রি সনজিত ও পিডব্লিউ স্যারকে টাকা দিয়ে হাজিরায় খাতায় সই করে বেতন তুলে নিচ্ছে। একই কথা বলেন ৭নং গ্যাংয়ে কর্মরত আরেক ওয়েম্যান।’ তিনি জানান, ‘এনায়েত অসুস্থতার জন্য ছুটি নেয়। ছুটি শেষ হলেও কাজে না এসে মিস্ত্রি সনজিতের মাধ্যমে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে নেন। একদিন এনায়েত আসলে জিজ্ঞেস করলে বলে, মিস্ত্রিকে ৬ হাজার, পিডব্লিউ স্যারকে ৬ হাজার টাকা দিয়ে ম্যানেজ করি। গত ১০-১২ দিন ধরে এনায়েত নিয়মিতই কাজে আসছে, কিন্তু এর আগে মাঝে মধ্যে এসে হাজিরা দিয়ে চলে যেত’ বলে জানান ওয়েম্যানরা।ওয়েম্যান এনায়েত বলেন, এক্সিডেন্ট করে হাতে ব্যথা পাই, এরপর ছুটিতে থাকি। ছুটি শেষে কাজ যোগ দিলেও অসুস্থতার কারণে ঠিকঠাক মতো কাজ করতে পারি না। অন্যরা কেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে তা নিয়ে তিনি কিছু জানেন না এবং কোনো টাকা-পয়সার লেনদেন হয়নি বলে তিনি জানান।রাজনের অধীনে কাজ করা হেড মেইট নাভিদ আহমেদ প্রতিদিনই কোনো না কোনো গ্যাং তদারকি করার কথা। কিন্তু গত জুন মাসের হাজিরা খাতায় দেখা যায় ৬ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত টানা ৮ দিন হাজিরা খাতায় তার অবস্থান উল্লেখ নেই। পরবর্তীতে হাজিরা খাতায় দেখা যায় বিভিন্ন গ্যাংয়ে অবস্থানের কথা উল্লেখ রয়েছে।এ বিষয়ে ৭নং গ্যাংয়ের মিস্ত্রি সনজিত রঞ্জন ঘোষ বলেন, ‘আমি পরিপূর্ণ কাজ আদায় করার জন্য তাগাদা দেয়ায় আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ তুলেছে।’ এনায়েত অসুস্থ থাকায় সে ছুটিতে ছিল, বর্তমানে প্রতিদিনই গ্যাংয়ে আসে, কিন্তু অসুস্থতার কারণে ঠিক করে কাজ করতে পারে না। টাকা দেয়ার বিষয়টি মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি।এ বিষয়ে পিডব্লিউ কার্যালয়ের টাইমকিপার নোমান মিয়া বলেন, হেড মেইটের দায়িত্ব পুরো গ্যাং তদারকি করা। একেকদিন একেক গ্যাংয়ের দায়িত্ব পালন করায় হাজিরা খাতায় তার স্বাক্ষরের বদলে শুধু অবস্থান উল্লেখ করা হয়। হেড মেইট নাভিদ আহমেদ ৮ দিন অনুপস্থিত থেকে হাজিরা খাতায় অবস্থান উল্লেখ করার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে বলেন, এ বিষয়ে স্যারের সাথে কথা বলেন, আমি কিছু বলতে পারবো না।অভিযোগের বিষয়ে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে উর্ধতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী পথ (পিডব্লিউ) আনিসুজ্জামান রাজনের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে একটি চক্র এসব মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছে। সকল অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে তিনি আরও বলেন, আমার নিজের জেলা হওয়ায় আমি ভালো কাজ করে যেতে চাই, কিন্তু দুষ্টু চক্রটি তাদের স্বার্থ পূরণ বা হওয়ায় আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে।’এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আহসান হাবিবের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি জানান, ‘এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
