টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরের নাগরিক জীবনের ছন্দপতনের পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বাজারেও নেমে এসেছে দামের দাবদাহ। শহরের ছোট-বড় সব বাজারেই ছড়িয়েছে সবজি ও মাছের দামে অস্থিরতা। বিশেষ করে কাঁচা মরিচের মূল্যবৃদ্ধি যেন মধ্যবিত্ত ও স্বল্পআয়ের মানুষের মুখে মরিচের ঝাল নয়, আগুনই লাগিয়ে দিয়েছে।বহদ্দারহাট, চকবাজার ও কর্ণফুলী কমপ্লেক্স বাজার ঘুরে দেখা গেছে–টানা বৃষ্টির কারণে ফসলের মাঠে পানি জমে নষ্ট হয়েছে অনেক সবজি। এর প্রভাব পড়েছে সরবরাহে। আর সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে বাজারে বেড়ে গেছে প্রায় সবজির দাম। ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হওয়া সবজি এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা পর্যন্ত। আর সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে কাঁচা মরিচ। গত সপ্তাহে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া মরিচ এই সপ্তাহে পৌঁছেছে ২৫০ টাকায়!কর্ণফুলী কমপ্লেক্স বাজারের সবজি বিক্রেতা রহিম মিয়া সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানান, ‘মরিচ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বৃষ্টিতে মাঠে মরিচ পঁচে গেছে। নতুন মরিচ আসতেও দেরি হচ্ছে। আবার আমদানি বন্ধ থাকায় দাম আকাশছোঁয়া।’তবে তিনি আশা করেন, আগামী সপ্তাহে ভারত থেকে আমদানি করা মরিচ বাজারে আসলে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক আড়তদার মাহমুদউল্লাহ বলেন, ‘আমরা এখন মরিচ বিক্রি করছি ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে। বাজারে মরিচের চাহিদা প্রচুর, কিন্তু জোগান সীমিত। আমদানি না এলে আরও দাম বাড়তে পারে।’বৃষ্টির কারণে শুধু মরিচ নয়, চট্টগ্রামের বাজারে প্রভাব পড়েছে বরবটি, ঝিঙে, করলা, পটোল, বেগুন, কাঁকরোল, ফুলকপি, গাজর–সবজির দামে। বাজারে খুচরা দামে সবজির মূল্যবৃদ্ধি গড়ে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। সবজির শাকপাতা যেমন কচুশাক, পুঁইশাক, লালশাক, মিষ্টিকুমড়ার শাক এখন ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম বড় পাইকারি বাজার রিয়াজউদ্দিন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবজির দাম এখনও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখানকার অধিকাংশ সবজি ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। তবে আড়তদারদের ভাষ্য–সড়কপথে পরিবহন সংকট ও কৃষকের মাঠে বৃষ্টির ক্ষয়ক্ষতি সামনে আরও প্রভাব ফেলতে পারে পাইকারিতেও।মাংসের বাজারে এখনো বড় ধরনের অস্থিরতা নেই। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়, সোনালি মুরগি ২৮০ থেকে ৩১০ টাকা এবং দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৫৮০ টাকা কেজি দরে। গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকা ও খাসির মাংস ১২০০ থেকে ১২৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এ দাম মধ্যবিত্তের জন্য এখনও বোঝা।চট্টগ্রামের মাছের বাজারে লইট্যা মাছের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, যেখানে এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১৪০ টাকায়। অন্যান্য মাছের দামও চড়া। রুই মাছ ৩০০ থেকে ৫৫০, কাতলা ৩৫০ থেকে ৪৫০, চিংড়ি ৯০০ থেকে ১৪০০, কাঁচকি ৪০০, চাষের কই ২৫০ থেকে ৩০০, পাবদা ৪০০ থেকে ৬০০, শিং ৫০০ থেকে ১২০০ ও ট্যাংরা ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।বাজারে এই অস্থিরতার সময়েও নেই কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি। কোথাও নেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, নেই মূল্যতালিকার বাধ্যবাধকতা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ সংকটে দাম বাড়লেও সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। সাধারণ ভোক্তারা এর প্রতিবাদ জানাতে পারছেন না, বরং নীরবে কষ্ট করে যাচ্ছেন প্রতিদিন।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেদ মাহমুদ সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাকলে কিছু প্রভাব পড়বে–এটা সত্য। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, নিয়মিত নজরদারি না থাকায় বাজারে অনৈতিক মুনাফার সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিদিনের দামের তালিকা প্রকাশ করা ও ভোক্তা অধিকার সংস্থাকে সক্রিয় করা।’চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারে দেখা গেলো, এক নারী ভোক্তা রাগে ফুঁসছেন। হাতে মাত্র এক কেজি মরিচ, গলায় ক্ষোভের আগুন। তিনি সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ‘মরিচ কিনতে গিয়ে মনে হচ্ছে গহনা কিনে ফেললাম। এটা কোনো বাজার পরিস্থিতি না, এটা এক প্রকার শোষণ।’তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে প্রয়োজন জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ–সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সড়ক পরিবহন স্বাভাবিক রাখা, আমদানি সহজতর করা ও বাজারে ভ্রাম্যমাণ টিম চালু করা।অসংখ্য সাধারণ মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছেন–প্রাকৃতিক দুর্যোগ একদিকে থাক, বাজার দুর্যোগ তো রোধ করা যায়। তাহলে কেন এই দুর্বলতা?এআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
