যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ঝাউদিয়ায় স্কুল ভবন ভাঙার নেপথ্যে ওয়ার্ড বিএনপির দুই নেতার অর্থবাণিজ্য বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের এমন কান্ডে দলের অন্য নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও তারা বাণিজ্যের অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, তাদের নির্দেশনা অমান্য করে স্কুলের ভবন ভাঙচুরের ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। ঘটনাটি দলের হাই কমান্ডকে অবহিত করেছেন।স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৭ নম্বর চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মশিয়ার রহমান ও সাংগঠনিক আমিরুল ইসলাম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দলের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। মাইকিং করে তাদের অনুসারীদের ডেকে স্কুলের ভবন ভাঙার কান্ডের পর থেকে তারা ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন। এতে এলাকার অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সুবিধাবাদী কয়েকজনের কাছ থেকে অর্থবাণিজ্য করে স্কুল ভবনে তাণ্ডব চালানো হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।ঝাউদিয়ার মুন্সী মেহেরুল্লাহ একাডেমী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম সময়ের কন্ঠস্বরকে জানান, অবৈধভাবে স্কুলের ভবন ভাঙচুরের ঘটনায় ৬ জুলাই যশোরের পুলিশ সুপার ও কোতোয়ালি মডেল থানায় অভিযোগ করার পর তারা আরও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। গত ৮ জুলাই স্কুলে যাওয়ার পথে তার গতিরোধ করে মশিয়ার রহমান ও তার লোকজন। এরপর থেকে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।একটি পক্ষের মালিকানাধীন জমি দাবি করে পিলার পুতে রাখার বিষয়ে আবুল কালাম জানান, যদি মালিকানাধীন জমি হয় তাহলে এর আগে রাস্তা পাকা করার সময় বাঁধা দেননি কেন? এত বছর পর এসে এখন নতুন করে রাস্তা পাকাকরণের সময় কেন জমি দাবি করে পিলার পুতেছেন? তারা প্রভাব খাটিয়ে সরকারি জমি দখল করেছেন। উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য স্কুলের ভবন ভাঙা হয়েছে।চুড়ামনকাটি ইউনিয়ন যুবদলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের কন্ঠস্বরকে জানান, নতুন করে রাস্তা পাকাকরণের কাজ শুরু হলে স্থানীয় সিরাজুল ইসলাম, মফিজ ওরফে মোফা ও শহিদুল ইসলাম নিজেদের জমি দাবি করে স্কুলের অপরপ্রান্তে রাস্তার মাঝে পিলার পুতে দেয়। ফলে রাস্তার একপাশে পিলার অন্যপাশে স্কুলের দোকান থাকায় রাস্তার কাজ থমকে যায়। তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে স্কুলের ভবন ভাঙা হয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।চুড়ামনকাটি ইউনিয়ন যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম কবির ওয়াসিম সময়ের কন্ঠস্বরকে জানান, স্থানীয় কিছু বিএনপির নেতৃবৃন্দ আওয়ামী লীগের লোকজনের সাথে হাত মিলিয়ে অতি উৎসাহি হয়ে অবৈধভাবে হামলা চালিয়ে স্কুলের ভবন ভাঙচুর করেছে। নিন্দিত এই কাজ করার আগে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সাথে আলোচনা করার উচিত ছিল বলে মনে করেন। একটি পক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে এমন কান্ড বলে তিনি শুনেছেন।চুড়ামনকাটি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও মুন্সী মেহেরুল্লাহ একাডেমী মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি আবু সাঈদ সময়ের কন্ঠস্বরকে জানান, স্কুলের অপর পাশের কয়েকজন জমিওয়ালা নিজেদের স্থানীয় কিছু লোকজনকে ম্যানেজ করে স্কুলের ভবন ভেঙে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এভাবে কেউ হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করতে পারে না। তিনি আরও জানান, ওয়ার্ড বিএনপির নেতা মশিয়ার রহমান, আমিরুল ইসলাম, টিটো ও স্বপনসহ আরও কয়েকজন ভাঙচুরের সাথে জড়িত। অবৈধভাবে ভাঙচুর না করার জন্য আগেভাগে তাদের বলা হলেও তারা শোনেননি। তাদের কান্ডে দলের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। বিষয়টি দলীয় হাইকমান্ডকে জানানো হয়েছে।চুড়ামনকাটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাস্টার মিজানুর রহমান সময়ের কন্ঠস্বরকে জানান, ওয়ার্ড বিএনপির নেতা মশিয়ার রহমান, আমিরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজনের স্কুল ভাঙচুর কান্ডে দলের সুনাম নষ্ট হয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে তারা অন্যায় করেছেন। তাদের কর্মকাণ্ডে দলে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সম্পাদককে জানিয়েছেন।এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মশিয়ার রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম সময়ের কন্ঠস্বরকে জানান, স্কুলের ভবন ভাঙচুর করা হয়নি। পথচারীদের চলাচলের সুবিধার জন্য সরকারি রাস্তার জমি দখল করে তৈরি স্কুলের দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে মানুষ ভাঙচুর কান্ডে অংশ নিয়েছিলেন। কারণ স্কুলের ওই দোকানের কারণে রাস্তার কাজ থমকে আছে। এতে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, যেসব নেতারা এমন কথা রটাচ্ছে, তারাই অর্থবাণিজ্য করেন। তারা কার কাছ থেকে কোন সুবিধা নেননি। সাধারণ মানুষের স্বার্থে তারা স্কুলের অবৈধ দোকানঘর ভেঙে দিয়েছেন। এখন দলীয় প্রতিপক্ষ তাদের নামে মিথ্যাচার শুরু করেছেন।উল্লেখ্য, চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ঝাউদিয়ার মুন্সী মেহেরুল্লাহ একাডেমী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মূল ভবনের সাথে ৪ টি শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে। পাশে গভীর সেফটি ট্যাংক বসানো হয়েছে। সম্প্রতি পুরাতন পাকা রাস্তা ভেঙে নতুন পাকাকরণের কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে স্থানীয় একটি পক্ষ কোনো কিছু না জানিয়ে নিজেরাই জমি মাপা শুরু করে। পরে তারা সেফটি ট্যাংকির ৮/১০ ফুট ভিতরে পিলার পুতে দেয়। এছাড়া ভাঙচুর করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। গত ২৯ জুন বিষয়টি নিয়ে স্কুল পরিচালনা পরিষদ জরুরি মিটিংয়ে বসেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৭ দিনের মধ্যে সেফটি ট্যাংকের ওপর নির্মিত দোকানঘর খালি করার জন্য ব্যবসায়ীকে নোটিশ দেওয়া হয়।এছাড়া সরকারিভাবে জমি মাপার জন্য গত ৩০ জুন ই-সেবার মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়। কিন্তু ৪ জুলাই বিএনপি নেতা মশিয়ার রহমান ওরফে ঠাকুর, আমিরুল ইসলামের নির্দেশে স্কুলের দুইতলার শ্রেণিকক্ষ ও নিচের দোকানঘরের সামনের অংশ ভেঙে ফেলা হয়। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। স্কুলের ভবন ভাঙচুর করা নিয়ে গত ৭ জুলাই ‘সময়ের কন্ঠস্বরে’ খবর প্রকাশ হওয়ায় হামলাকারীদের গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। তারা সাংবাদিককে নিয়ে খিস্তিখেউড় করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় (ফেসবুকে) মিথ্যাচারে লিপ্ত রয়েছেন।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
