একদিন পেরিয়ে গেছে দুর্ঘটনার—কিন্তু তখনও কিছুই জানত না পরিবার। ফেনী পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মো. গালিব (২২) মঙ্গলবার সকালে বের হয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে পাহাড়ে ঘুরতে। সবাই ধরেই নিয়েছিল, সন্ধ্যা বা রাতে ফিরে আসবে। কিন্তু রাত কেটেছে, সকালও, ফোন বেজেছে না একবারও।বুধবার (৯ জুলাই) বিকালে একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল গালিবের বাবা আব্দুর রশিদ আল কাদেরীর কাছে। ফোন ধরতেই পাশের জনের কণ্ঠে ভেসে এল বাক্যগুলো— ‘আপনার ছেলে মীরসরাইয়ের সোনাপাহাড়ে এক্সিডেন্ট করেছে…’ কথা শেষ হতেই স্তব্ধ হয়ে গেল পরিবার। এরপর যা ঘটেছে, তা যেন একটি দুঃস্বপ্ন।গালিবের সঙ্গে ফেনী থেকে মেলখুম ট্রেইলে বেড়াতে গিয়েছিল বন্ধু হৃদয় (২২)। তারা আরও তিনজনের সঙ্গে ট্রেইলে ট্রেকিং করতে গিয়ে মঙ্গলবার থেকে নিখোঁজ ছিল।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন দুপুরে মেলখুম ট্রেইলের ঝরনা ও পিচ্ছিল পথ দিয়ে নামার সময় পাহাড়ি খালে পড়ে যায় তারা। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলেও ফিরে না আসায় স্থানীয় লোকজন ও স্বজনরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। পরদিন বুধবার সকাল থেকে বারইয়ারহাট ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের একটি দল উদ্ধার অভিযানে নামে। দুপুর আড়াইটার দিকে মিরাজ, রায়হান ও ফাহিম নামে আহত তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। বিকেল ৫টার দিকে গালিব ও হৃদয়ের নিথর দেহ খালের পাথরের নিচে থেকে উদ্ধার করা হয়।ছেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম। গালিবের মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, বলতে পারছেন না একটি শব্দও। বাবা আব্দুর রশিদ আল কাদেরী কাঁপা গলায় বলছিলেন, ‘ছেলে আমার এমন তো ছিল না… খুব ঠান্ডা মাথার ছিল। পাহাড়ে কেন গেল, আমাকেও কিছু জানায়নি।’নিহত আরেক তরুণ হৃদয়ের বাড়ি ঢাকায়। গালিবের সঙ্গে কলেজ জীবন থেকে বন্ধুত্ব। ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দুজন একসঙ্গে পড়ত। পাহাড় ও প্রকৃতি ভালোবাসত তারা, এই ভালোবাসাই কেড়ে নিল জীবন।স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সোনাপাহাড়ের মেলখুম ট্রেইল জায়গাটি দুর্গম ও বিপজ্জনক। সঠিক গাইড ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া এখানে যাওয়া বিপদজনক।স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনের উচিত এসব ঝুঁকিপূর্ণ ট্রেইল ও পয়েন্টে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া এবং দুর্ঘটনা রোধে পদক্ষেপ নেওয়া।জীবনের সবে শুরু, স্বপ্ন আর সম্ভাবনায় ভরা দুই তরুণ গালিব ও হৃদয়ের জীবন থেমে গেল মেলখুম ট্রেইলের পাথরে। পরিবারের কাছে তাদের ফিরে যাওয়া হয়নি—ফেরার খবর এল মৃত্যুর বার্তা হয়ে। পর্যটনের নামে দায়িত্বহীনতা এবং প্রকৃতির প্রতি অবহেলা যেন আরও দুটি পরিবারকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিল। এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
