“ওরা আমাকে বলত, ‘তোর বাবা কই, ফোন দে, না হইলে তোকে খুন কইরা ফালামু।’ আমি কাঁদতাম, আমার বাবা আবার কাঁদতে কাঁদতে টাকা পাঠাইতো। কিন্তু কোনোদিনই জানতাম না, আমি বাঁচব কিনা।” কথাগুলো বলছিলেন শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও ইউনিয়নের মনুয়া এলাকার আলতাফ হোসেন ছৈয়াল (৩০)। ৮ মাস আগে যিনি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিলেন ইতালির স্বপ্নে বিভোর হয়ে। আর ফিরে এসেছেন ক্ষতবিক্ষত শরীর আর আতঙ্কিত মন নিয়ে।তার মতো একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন ভেদরগঞ্জের আইজারা এলাকার আহসান উল্লাহ বলি (৩০)। তারা দুজনই লিবিয়া হয়ে ইতালি যাবার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু পৌঁছাতে পারেননি গন্তব্যে। পেরিয়েছেন শুধু এক ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের গল্প—যা এখন তাদের জীবনের স্থায়ী দুঃস্বপ্ন।আলতাফ ও আহসান উল্লাহর পরিবার দালাল হারুন লস্করের সঙ্গে চুক্তি করেন ১৬ লাখ টাকায়, যাতে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে পৌঁছে দেওয়া হবে। হারুন বলেন, দুবাই ও মিসর হয়ে ছেলেরা লিবিয়ায় যাবে, সেখান থেকে নৌপথে ইতালি।চুক্তির পর আত্মীয়দের কাছে ধারদেনা, এনজিও ও ব্যাংক ঋণ, এমনকি জমিজমা বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেন তারা। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর সেসময় আলতাফের বাবা দুলাল ছৈয়াল দালাল হারুন লস্করকে দেন ১২ লাখ টাকা।২০২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ভারত হয়ে শ্রীলঙ্কা, সেখান থেকে মিশর হয়ে আলতাফ হোসেন পৌঁছান লিবিয়ায়। বিমানবন্দর থেকে হারুনের লোকেরা তাকে তুলে নেয় একটি ছোট ঘরে, যেখানে আগে থেকেই ছিল ৩০–৩৫ জন। সেখান থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ বন্দিদশা।দুই দিন পর নেয়া হয় একটি ক্যাম্পে। এক মাস ২৬ দিন একের পর এক ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। এরপর ১৩ নভেম্বর লিবিয়ার ত্রিপোলি সাগরপাড় থেকে কাঠের নৌকায় ১৬০ জনকে তুলে একটি সাজানো নাটকের মাধ্যমে পুলিশের হাতে তুলে দেয় দালাল চক্র। পরে নিজেরাই আবার পুলিশের কাছ থেকে ‘উদ্ধার’ করে নেয় একটি গুদামে।সেখান থেকেই শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের প্রকৃত রূপ। প্রতিদিনই চলত মারধর। ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিবারকে নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। আলতাফের পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় আরও ২৬ লাখ টাকা।২৯ ডিসেম্বর আরেকটি নাটক সাজিয়ে তাদের আবার ৬০ জনসহ নৌকায় তোলে চক্রটি। পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার ভান করে আবার উদ্ধার করে আরেক চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। ৩১ ডিসেম্বর ৬৫ জনকে নিয়ে একটি ‘গেম’-এ পাঠানো হয়—সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকায় পানি উঠে যায়। সেই দুঃসময়ে পরিবারে ফোন করে আদায় করা হয় আরও ২৩ লাখ টাকা।সব মিলিয়ে আলতাফের পরিবারের ব্যয় দাঁড়ায় ৬৪ লাখ টাকা। তবে ইতালির বদলে তিনি ফিরে এসেছেন একটি বিধ্বস্ত শরীর আর এক গৃহবধূর মতো অসহায় পিতার ঘরে।আহসান উল্লাহ বলি জানান, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয়া হয়। একটি অন্ধকার কক্ষে আটকে রাখা হয়। পালানোর চেষ্টা করায় তাকে বিচ্ছিন্নভাবে মারধর করা হয়। বলেন, “বৈদ্যুতিক শক দিত, প্লাস দিয়ে নখ তুলে ফেলত, বৈদ্যুতিক তার দিয়ে পেটাত, খেতে দিত না।”বলেন, “আমি ভেবেছিলাম, আর ফিরতে পারব না। আমার পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ৬৫ লাখ টাকা।”গত ৭ মে মুমূর্ষু অবস্থায় দেশে ফেরেন তিনি। বলেন, “আমি বিচার চাই। আর কেউ যেন এই পথে না যায়। ভেদরগঞ্জ থানায় হারুন লস্কর, তার ছেলে পাপ্পু ও ইমন লস্করের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছি।”আহসান উল্লাহ বলির মা লুৎফা বেগম বলেন, “আমার ছেলে গেছে ইতালি যাওয়ার আশায়। কিন্তু জীবনটাই শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের লাখ লাখ টাকা দেনা। পাওনাদাররা আসলে আমরা পালিয়ে থাকি। আমি এই অন্যায়ের বিচার চাই।”শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “দুই তরুণ দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় গেছে এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে মুক্তিপণের মাধ্যমে ফিরেছে। বেশ কয়েকটি চক্র শনাক্ত করেছি, আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।”জানা গেছে, একই ইউনিয়নের আরও ১১ জন যুবক গত দুই মাস ধরে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে যাওয়ার পথে নিখোঁজ রয়েছে।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
