চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ করে চার বন্ধু মিলে এসেছিলেন কক্সবাজারে। উদ্দেশ্য- সমুদ্রের ঢেউয়ে ডুবে খানিকটা প্রশান্তি খোঁজা। কিন্তু সেই আনন্দঘন ভ্রমণ এক লহমায় পাল্টে গেল চরম বিষাদে। এখন আর সমুদ্র তাদের কাছে বিনোদনের উৎস নয়, বরং ভয়, অপেক্ষা আর কান্নার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।হিমছড়ি সৈকতে গোসল করতে নেমে স্রোতের টানে নিখোঁজ হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের দুই শিক্ষার্থী- অরিত্র হাসান (২২) ও আসিফ আহমেদ (২২)। মঙ্গলবার (৮ জুলাই) সকাল ৭টায় সাগরে নামার পর থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা নয় ঘণ্টা কেটে গেলেও তাদের খোঁজ মেলেনি। উত্তাল সাগর, অদৃশ্য গুপ্তখাল আর তীব্র স্রোতের বিরুদ্ধে লড়ছেন উদ্ধারকারীরা, কিন্তু দুই তরুণের খোঁজ এখনও অধরা।তাদের সঙ্গে ছিলেন আরও এক বন্ধু, কে এম সাদমান রহমান। ঢাকার মিরপুরের এই শিক্ষার্থীও একই বিভাগের। তিনজন একসঙ্গে সাগরে নেমেছিলেন। কিছুক্ষণ পরই সাদমানের নিথর দেহ ভেসে ওঠে সৈকতে। জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষার শেষে জীবনটাই শেষ হয়ে গেল তার জন্য।বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা জানায়, গতকাল সোমবার শেষ হয় প্রথম বর্ষের লিখিত পরীক্ষা। বিকেলে সাদমানসহ পাঁচ বন্ধু রওনা দেন কক্সবাজারের পথে। রাতে ইনানী এলাকার ক্যাম্প-ইন-কক্স রিসোর্টে উঠেছিলেন তারা। সকালে গোসলে নেমেই ঘটল দুর্ঘটনা।ঘটনার পর সকাল ১০টার দিকে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। লাইফ গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, পর্যটন পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সদস্যরা তল্লাশি চালাচ্ছেন। কিন্তু উত্তাল ঢেউয়ের বাধা পেরিয়ে নিখোঁজদের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না।সি সেফ লাইফ গার্ডের আঞ্চলিক পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘হিমছড়ি সৈকত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে একাধিক গুপ্তখাল রয়েছে- যেগুলো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে টান তৈরি করে। আমাদের ধারণা, নিখোঁজরা হয়তো সেসব খালে আটকে গেছেন।’বঙ্গোপসাগরে চলমান লঘুচাপের কারণে সাগর এখন বেশ উত্তাল। জানিয়ে পর্যটন পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক আপেল মাহমুদ বলেন, ‘সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে লাল পতাকা ওড়ানো হয়েছে সতর্কবার্তা হিসেবে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অনেকেই সাগরে নেমে ঝুঁকিতে পড়ছেন।’তথ্য বলছে, এই দুর্ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাগরে মৃত্যুর ঘটনা কক্সবাজারে যেন নিয়মিত দুঃসংবাদে পরিণত হয়েছে। গত এক মাসেই ছয়জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে সাগরে গোসল করতে গিয়ে।সি সেফ লাইফ গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র ২৬ জন লাইফ গার্ড। কিন্তু হিমছড়ি, দরিয়ানগর, ইনানীসহ বাকি ১১৫ কিলোমিটার এলাকায় কার্যকর কোনো উদ্ধার ব্যবস্থাই নেই। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে নির্ভর করতে হয় ভাগ্যের ওপর।এদিকে নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের পরিবার এখন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের চোখে-মুখে আতঙ্ক, বিষণ্নতা আর প্রতীক্ষা- যেন আশায়-নিরাশায় দোল খাচ্ছে একটি অন্ধকার দিন। কক্সবাজারের রৌদ্রস্নাত সৈকত আজ তাদের কাছে কেবল কান্নার জলছবি।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
