শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার মাঝিরঘাটে পদ্মা সেতু প্রকল্পের সংলগ্ন তীর রক্ষা বাঁধে আবারও ধস দেখা দিয়েছে। সোমবার (৭ জুলাই) বিকেলে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় ১০০ মিটার বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও প্রায় ২০০ মিটার বাঁধ ভেঙে পড়ে পদ্মা নদীতে। ফলে নদীতীরবর্তী অন্তত ১০টি বসতবাড়ি এবং ৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে নদীতে তলিয়ে গেছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জিও ব্যাগ ফেলতে শুরু করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।নদীতে পানি বৃদ্ধি ও স্রোতের তীব্রতায় ভাঙন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বহু পরিবার তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ ঘরের আসবাবপত্র খোলা মাঠে তুলে রাখছেন। হুমকির মুখে পড়েছে আশপাশের সড়কপথ, হাটবাজার এবং শতাধিক বসতঘর।স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমরা প্রতি বছরই নদীভাঙনের শিকার হই, কিন্তু এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। মাত্র এক ঘণ্টায় চোখের সামনে ১০টি ঘর নদীতে চলে গেল। এখন আর ঘুম হয় না। নদীর পাড়ে কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে শুধু আশ্বাস আসে, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেই। আমরা দ্রুত স্থায়ী বাঁধ চাই, নইলে পুরো এলাকা নদীতে হারিয়ে যাবে।’স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে ড্রেজিং চলায় পদ্মা নদীর স্রোতের ধারা ও গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে, যার ফলে ভাঙনের তীব্রতা দিনদিন বাড়ছে। গত দুই বছরে শুধু মাঝির ঘাটেই প্রায় ৪০০ মিটার রক্ষা বাঁধ নদীতে বিলীন হয়েছে।হাজী আব্দুল কাদের নামে একজন ক্ষতিগ্রস্ত বলেন, ‘প্রতিবারই ভাঙনের সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধু আশ্বাস দেয়, কিন্তু কোন স্থায়ী উদ্যোগ নেয় না। এবারও যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে পুরো বাজারটাই পদ্মায় চলে যাবে।’ভাঙনে ঘর হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া হাসিনা বেগম বলেন, ‘এটাই ছিল আমাদের শেষ সম্বল। পদ্মা সব নিয়ে গেল। এখন বাচ্চাগুলারে নিয়ে কোথায় যামু?’বাঁধ ধসের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পানি উন্নয়ন বোর্ড ফরিদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শাজাহান সিরাজ। তিনি বলেন, ‘ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে জিও ব্যাগ ফেলানো শুরু হয়েছে, খুব দ্রুত ব্লক বসানোর কাজও শুরু হবে। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার ৩০টিরও বেশি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু ২০১৮ সালেই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে সাড়ে ৫ হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি এবং শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এমনকি নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনটিও পদ্মায় বিলীন হয়।পরিস্থিতি মোকাবেলায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় পদ্মা তীর রক্ষা প্রকল্প হাতে নেয়। প্রায় ১,৪১৭ কোটি টাকার এ প্রকল্পের আওতায় নড়িয়ার সুরেশ্বর লঞ্চঘাট থেকে জাজিরার সফি কাজীর মোড় পর্যন্ত ১০.২ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধ এবং ১১.৮ কিলোমিটার নদীর চর খনন করা হয়। তবে বাস্তবে অনেক জায়গায় এই বাঁধ কার্যকারিতা হারিয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।এসকে/এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
