বর্তমানে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন পরিচালিত হয় First Past the Post (FPTP) পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিতে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থীই জয়ী হন। এই ব্যবস্থায় একটি সমস্যা হলো, ভোট ভাগ হয়ে গেলে অধিকাংশ আসনে একটি বড় দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যায়, যদিও ভোটে তাদের প্রাপ্ত শতাংশ অতটা বেশি নয়। এতে দেখা যায়, অনেক ছোট বা মাঝারি রাজনৈতিক দল যাদের জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য ভোট আছে, তারা সংসদে কোনো আসনই পায় না।উদাহরণ হিসেবে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন তুলে ধরা যায়। এ দুই নির্বাচনে বিরোধীদলীয় ভোট ছেঁটে ফেলা গেলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দল প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ আসন দখল করে নিয়েছে। অথচ ভোটের ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রেই ছিল অল্প। এতে প্রশ্ন উঠেছে—এই ব্যবস্থায় সবাই সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে কি?সম্প্রতি দেশের কয়েকটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল সংখ্যানুপাতিক ভোট ব্যবস্থা পিআর) চালুর দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, এই ব্যবস্থায় জাতীয়ভাবে একটি দল যত শতাংশ ভোট পাবে, তত শতাংশ আসন পাবে সংসদে। ফলে বড় দলের একচেটিয়া আধিপত্য হ্রাস পাবে এবং ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে।এই দাবি গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে খারিজ করার উপায় নেই। কারণ, পিআর পদ্ধতি জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, ইসরায়েলসহ বিশ্বের বহু দেশে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত। এসব দেশে সংসদে অনেক দল অংশগ্রহণ করে, এবং কেউ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে জোট সরকার গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতা ভাগাভাগি হয়। এতে নীতিনির্ধারণে বিভিন্ন পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিআর পদ্ধতির বাস্তবায়ন সহজ নয়। কারণ এটি চালু করতে হলে সংবিধানে সংশোধন করতে হবে, যা শুধু রাজনৈতিক ঐকমত্য নয়, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছারও ওপর নির্ভর করে। তাছাড়া জনগণের মধ্যেও এই পদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই।এ ছাড়া বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব, জোট রাজনীতিতে স্বচ্ছতার সংকট, এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন-সব মিলিয়ে পিআর পদ্ধতি কার্যকর করতে হলে বেশ কিছু কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।পিআর পদ্ধতি যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে এটি সব সমস্যার সমাধান নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রধান দলের দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। এর বাইরে যে কোনো নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে হলে নতুন রাজনৈতিক চুক্তি, জবাবদিহি, এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা এবং আদর্শিক স্থিরতা থাকা জরুরি। কারণ পিআর পদ্ধতিতে সংসদে অনেক ছোট দল ঢুকে গেলে নীতিনির্ধারণ জটিল হয়ে পড়তে পারে, যদি ঐক্য ও স্থিতিশীলতা না থাকে।সংখ্যানুপাতিক ভোটব্যবস্থা নিঃসন্দেহে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি, যা ন্যায্যতা এবং প্রতিনিধি বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেয়। তবে এটি যথাযথ রাজনৈতিক কাঠামো, সাংবিধানিক সংশোধন, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, এবং সচেতন ভোটার ছাড়া সফল হবে না। ইসলামপন্থী দলগুলোর এই দাবিকে গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে আমলে নেওয়া যেতে পারে, তবে বাস্তবায়নের আগে দরকার ব্যাপক রাজনৈতিক সংলাপ, জনমত যাচাই ও আইনি প্রস্তুতি।সংখ্যানুপাতিক ভোটব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে—কিন্তু তা রাজনৈতিক পরিপক্বতা, প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর নির্ভর করে। শুধু একটি পদ্ধতির বদল নয়, দরকার পুরো ব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা।আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
