মানসিক প্রতিবন্ধী মোস্তফা খান (৬০)। বয়সের ভারে অসুস্থ তিনি। ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। এদিক-ওদিক থেকে কুড়িয়ে আনা শাক বিক্রি করে প্রায় আড়াই দুই যুগ ধরে চলছে তার সংসার। কখনো সকালে, কখনো বিকেলে বরিশাল নগরীর ফকির বাড়ি রোডের মাঝখানে ত্রিমুখে রাস্তার পাশে বিভিন্ন শাক নিয়ে প্রতিদিনই বসতে দেখা যায় তাকে।মোস্তফার কাছে সময়ের কণ্ঠস্বরের প্রতিবেদক জানতে চাইলেন, কত দিন ধরে এখানে আপনি শাক বিক্রি করেন। প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা বলেন, ‘আমি সদর রোড ও ফকির বাড়ি রোড এলাকায় এরশাদের আমল থেকে (প্রায় দেড় যুগ) ধরে আমার গ্রামের বাড়ি বরিশালের সদর উপজেলার সায়েস্তাবাদ থেকে কুড়িয়ে আনা শাক বিক্রি করি। আর আমার শাক বিক্রি টাকার উপরে ভরসা করে সংসার ও ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা।’মোস্তফা খান বরিশাল সদর উপজেলার সায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের চরআইচা গ্রামের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত আদম আলী খানের ছেলে।নগরীর ফকির বাড়ি রোডের বাসিন্দা শাখাওয়াত সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘জীবনে ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। প্রাত্যহিক কাজকর্ম ছাড়াও নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে সময় ব্যয় করতে হয় আমাদের। বিশেষ করে শহরের বসবাস করা চাকরি জীবীদের এই ব্যস্ততা আরও বেশি। শত ব্যস্ততার মাঝেও যে কাজে সময় ব্যয় করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না, সেটি হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার। এসব ব্যস্ত মানুষের কথা চিন্তা করে তাদের শাক কেটে, ধুয়ে পুরো প্রস্তুত করে বিক্রি করার জন্য প্রতিদিনই সাজিয়ে রাখেন মোস্তফা।’শাখাওয়াত আরো বলেন, ‘আমার যখন যুবক বয়স, সেই থেকে মোস্তাফা নামে শাক বিক্রি করা এই লোকটিকে দেখতে পাই। তবে তিনি মানসিক প্রতিবন্ধী। শাক বিক্রির পাশাপাশি মানুষের কাছে ৫ টাকা ভিক্ষা চাইতে দেখি তাকে।’স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোস্তাফার আনা শাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও টাটকা হওয়ায় ফকির বাড়ি রোডসহ বিভিন্ন স্থানের মানুষ তার কাছ থেকে শাক কিনে থাকে। আর এই শাক বিক্রি করেই নাকি চলছে তার সংসার।স্থানীয়রা সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানিয়েছেন, ‘প্রায় আড়াই যুগ ধরে ফকির বাড়ি রোডের রাস্তার পাশে বসে শাক বিক্রি করে যাচ্ছেন এই মানসিক প্রতিবন্ধী মোস্তফা খান। তবে তিনি অসহায় ও মানসিক প্রতিবন্ধী হয়েও পান না কোনো সরকারি অনুদান। গ্রামগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করা শাক এনে বিক্রি করে ২/৩শ টাকা আয় হয়। আবার কোনো কোনো দিন হয় না কোনো আয়-রোজগার। এভাবেই চলছে তার জীবনযুদ্ধ।’অল্প দিয়েই ছেলে-মেয়ের পড়ালেখা সহ চালাচ্ছে ৪ জনের সংসার।হঠাৎ সময়ের কণ্ঠস্বরের প্রতিবেদকের সাথে মোস্তফা খান দেখা হয়। তাকে দেখে প্রতিবেদক শাক বিক্রির গল্প জানতে চাইলে মোস্তফা বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পরেই পিতা-মাতা মারা যান। আত্মীয়-স্বজনের কাছেই তিন ভাই-বোনসহ বড় হয় মোস্তফা।’এরপর মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে তেমন গ্রহণযোগ্যতা পাননি সমাজ এবং পরিবারের কাছে। বহু প্রতিকূলতার মাঝেই চলতে থাকে জীবন।বর্তমানে তিন ভাই-বোনসহ বহু আত্মীয়-স্বজন স্বচ্ছল থাকলেও কেউ ফিরেও তাকায় না তার দিকে।স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা সরকারি কোনো অনুদান মেলে না সচরাচর। ঈদ অথবা কোরবানিতে প্রতিবেশীরা সাহায্য সহযোগিতা করে তাকে। আবার মেম্বার থেকে ১০ কেজি চাল পান বছরে একবার।তাই গ্রামগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করা শাক বিক্রি করেই চালাতে হয় সংসার। মোস্তফা আবেগাপ্লুত হয়ে আরো বলেন, ‘আমার আত্মীয়-স্বজন কেউ আমার খোঁজ-খবর নেয় না। তবে আল্লাহ্ আমায় খাওয়ান।’মোস্তফা এই শাক বিক্রি করে ১০ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত একটি মেয়ের পড়ালেখা সহ আরেকটি সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে। গণমাধ্যমের প্রচারের মাধ্যমে সুশীল সমাজের সকল দানবীরদের থেকে সাহায্য সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
