চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-বান্দরবান মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু সাতকানিয়ার কেরানীহাট। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত এ অঞ্চলটি শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, হাসপাতাল, মসজিদ, বাজার, যানবাহন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র হিসেবে সাতকানিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।তবে, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এই এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক সংলগ্ন সরকারি জমিতে গজিয়ে উঠেছিল শতাধিক অবৈধ দোকান ও স্থাপনা। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদে গড়ে ওঠা এসব অবৈধ স্থাপনার কারণে সৃষ্ট হয়েছিল চরম যানজট, জলাবদ্ধতা ও নাগরিক দুর্ভোগ।গত বুধবার (১৮ জুন) কেরানীহাটে বড় পরিসরের এক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে প্রশ্ন হলো—এরপর কী হলো?সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উচ্ছেদ কার্যক্রম শেষ হলেও জায়গাগুলো এখনও ছড়ানো-ছিটানো কাঠামো, ভাঙা টিন, বাঁশের খুঁটি, ঝুলে থাকা বৈদ্যুতিক তার এবং নানারকম ধ্বংসাবশেষে পূর্ণ। সড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এখনো নিরাপদ নয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, ঝড়-হাওয়ার সময় এসব পরিত্যক্ত বস্তু উড়ে গিয়ে যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে অঙ্গহানি এমনকি প্রাণহানি পর্যন্ত হতে পারে।পথচারী মো. হান্নান বলেন, ‘প্রশাসন দোকান ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু এই ভাঙাচোরা জিনিসগুলো ফেলে রেখেছে। এখন যদি বড়সড় ঝড় আসে, কারো মাথায় পড়ে গেলে কে দায় নেবে?’এদিকে, উচ্ছেদের কয়েকদিনের মধ্যেই আবারও কিছু লোক জমি ‘দখলের প্রস্তুতি’ নিতে শুরু করছে। এর মধ্যে রয়েছে আগের দোকান মালিকদের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা। জানা গেছে, প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী ইতোমধ্যে তাদের ‘মাসিক ভাড়াটে’ ব্যবসায়ীদের আশ্বাস দিয়েছে—“সামান্য চুপ থাকো, কয়েকদিন পর সব আগের মতো হয়ে যাবে।”কেরানীহাটের মানুষ মুখে মুখে যাদের নাম করে তারা হলো—স্থানীয় চাঁদাবাজ চক্র। যারা সরকারি জায়গা জবরদখল করে গড়ে তোলে কাঠ, টিন আর পলিথিন দিয়ে তৈরি অস্থায়ী দোকান। পরে প্রতি দোকান থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাড়া আদায় করতো তারা। কেরানীহাটের ফুটপাতগুলো যেন ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় রূপ নিয়েছিল। প্রতি দোকান থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় হতো, যার বিনিময়ে কোনো রশিদ দেওয়া হতো না। এই অবৈধ অর্থায়নের একটি অংশ ‘উপরে’ পৌঁছাতো, যা দীর্ঘদিন ধরে এই দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে।প্রতিটি দোকান থেকে উৎপন্ন বর্জ্য—পলিথিন, পচা তরিতরকারি, ময়লা আবর্জনা, নোংরা পানি—সরাসরি সরকারি ড্রেনে ফেলা হতো। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই কেরানীহাটে তৈরি হতো জলাবদ্ধতা। জমে থাকা পানিতে দুর্গন্ধ ছড়াতো পুরো বাজার এলাকাজুড়ে।কেরানীহাট বাজার, হাসপাতাল, মসজিদ—সবই একে অন্যের গায়ে গায়ে। অথচ গাড়ি রাখার জায়গা ছিল না। উচ্ছেদ অভিযানে যে জায়গাগুলো ফাঁকা হয়েছে, সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে অন্তত রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, বাজার করতে আসা ক্রেতার গাড়িও রাখার জায়গা পেত।সচেতন মহল বলছেন, উচ্ছেদ করাই যথেষ্ট নয়, এরপর কীভাবে জায়গাটি ব্যবহার হবে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছি, এখন এলাকাটি কীভাবে ব্যবহার হবে তা নিয়ে পরিকল্পনা চলছে। পুনরায় কেউ দখল করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙা কাঠামো সরিয়ে নিতে শ্রমিক নিয়োগ করা হবে।’এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
