আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের হার বাড়ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত—এই পাঁচ মাসে সবচেয়ে বেশি অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তথ্য যাচাইকারী সংস্থা রিউমার স্ক্যানারের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।ফেসবুকেই অপতথ্যের আধিক্যচলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নির্বাচন কেন্দ্রিক ৩৯টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার, যা একই সময়ে শনাক্ত হওয়া মোট ভুল তথ্যের (১৪৮৪) প্রায় তিন শতাংশ। শনাক্তকৃত এসব অপতথ্যের মাস ও সপ্তাহভিত্তিক – এই দুই ধরণের উপাত্তই বিশ্লেষণ করেছে রিউমার স্ক্যানার।বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব অপতথ্যের ৭৪ শতাংশই প্রচার করা হয়েছে সবশেষ দুই মাসে। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ এপ্রিলে এবং ৩৬ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে মে মাসে। আর বছরের প্রথম তিন মাসে ছড়িয়েছে বাকি ২৬ শতাংশ অপতথ্য।বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, এই সময়ে তথ্যকে বিকৃত করা হয়েছে এমন ঘটনা শনাক্ত হয়েছে ১৯টি, পুরোপুরি মিথ্যা বা ভুয়া ঘটনা সম্বলিত অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে ১৮টি।এর মধ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত অপতথ্য ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে গেল পাঁচ মাসে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ফেসবুক। শনাক্ত হওয়া ৩৯টি অপতথ্যের ৩৮টিরই হদিশ মিলেছে এই প্ল্যাটফর্মে। এছাড়া, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে দুইটি করে এবং থ্রেডসে একটি অপতথ্য ছড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ছাড়াও দেশের গণমাধ্যমও নির্বাচন সংক্রান্ত ভুল তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। গত পাঁচ মাসে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে এমন দুইটি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।ভুয়া মন্তব্যের শিকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাভুয়া ও বিকৃত মন্তব্যের সবচেয়ে বড় শিকার হতে হয়েছে বিএনপিকে। দলটির নেতাকর্মীকে জড়িয়ে গেল পাঁচ মাসে আটটি ভুয়া মন্তব্য ও সাতটি বিকৃত মন্তব্য প্রচার করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারকে জড়িয়ে পাঁচটি, জামায়াতে ইসলামীকে জড়িয়ে সাতটি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) জড়িয়ে তিনটি ভুয়া ও বিকৃত মন্তব্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা ও জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া-সংক্রান্ত ছয়টি করে অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।অপতথ্য বেশি বিএনপিকে নিয়েগত পাঁচ মাসে বিএনপিকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি (১৯) অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি সাতটি অপতথ্য ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে পাঁচটি এবং মির্জা আব্বাসকে নিয়ে দুটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সাতটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিও তিনটি অপতথ্যের শিকার হয়েছে। পাঁচ মাসে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে দুটি এবং গণঅধিকার পরিষদকে জড়িয়ে একটি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।নির্বাচন-সংক্রান্ত অপতথ্যের শিকার হতে হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকেও। সরকারকে জড়িয়ে পাঁচটি নেতিবাচক অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জড়িয়ে চারটি এবং উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে জড়িয়ে একটি অপতথ্য রয়েছে।অপতথ্যে গিনিপিগ গণমাধ্যম ফটোকার্ডযে কোনো সংবাদ বা তথ্য পাওয়ার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ভাবা হয় গণমাধ্যমকে। মাধ্যমটির বিশ্বাসযোগ্যতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপতথ্যের প্রচারে রীতিমতো গিনিপিগ বানানো হচ্ছে গণমাধ্যমগুলোকে। গণমাধ্যমকে জড়িয়ে প্রচারিত এসব অপতথ্যের সিংহভাগই রাজনীতিবিদদের ভুয়া ও সম্পাদিত মন্তব্য সম্বলিত।রিউমার স্ক্যানার বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গণমাধ্যমের ফটোকার্ডকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া ও অপতথ্যের প্রচার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। গত পাঁচ মাসে সম্পাদিত ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ১৩টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ২৭টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। অপতথ্য প্রচারে কালের কণ্ঠের নাম সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। এর পর যমুনা টিভি, কালবেলা ও জনকণ্ঠের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।এছাড়াও সম্প্রতি, ‘আমরা নিবার্চনের কথা বললে আপনারা গালি দিবেন না’ শীর্ষক মন্তব্যটি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর দাবিতে সময়ের কণ্ঠস্বরের ডিজাইন সম্বলিত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বাস্তবিক অর্থে এমন কোনো ফটোকার্ড কিংবা সংবাদ প্রচার করেনি সময়ের কণ্ঠস্বর। রিউমার স্ক্যানারের বিশ্লেষণে এটি উঠে এসেছে। অর্থাৎ গণমাধ্যমটির এই ফটোকার্ডটিতে থাকা শিরোনামটি ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে পরিবর্তন করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।গণমাধ্যমকে জড়িয়ে প্রচারিত এসব অপতথ্যের সিংহভাগই রাজনীতিবিদদের ভুয়া ও সম্পাদিত মন্তব্য সংবলিত। খোদ সাংবাদিকসহ দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বরাও প্রায়ই বিভ্রান্ত হয়ে সেসব শেয়ার দেন।আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
