প্রাকৃতিক ঝড়-বন্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সম্মুখভাগ থেকে লড়াই করতে হয় মুজিবনগর, চর কুকরি-মুকরি ও ঢালচর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের। এই তিনটি ইউনিয়ন ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার মূল ভূখন্ড থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। বিশেষত বঙ্গোপসাগর মোহনায় ঘেরা থাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত লাগে প্রথমেই। দুর্যোগ শুরু হলে দুর্বিষহ জীবন কাটে ২৭টি গ্রামের প্রায় ২৪ হাজার খেটে খাওয়া মানুষের। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করলেও হারাতে হয় সাজানো বসতঘর, পোষা প্রাণী ও চাষের মাছ। প্রতিবছর অন্যান্য দুর্যোগের মতো এবারও ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি ও মন্থা’ আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছে সেখানকার তিন শতাধিক ঘরবাড়ি, ভেসে গেছে পোষা প্রাণী ও কোটি টাকা মূল্যের চাষের মাছ। ওই তিনটি ইউনিয়নজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বিধ্বংসী আঘাতের ক্ষতচিহ্ন।সোমবার (২ জুন) দুপুরে বিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। গৃহহীন রয়েছে বহু পরিবার। নিঃস্ব এসব মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি। কিছু পরিবার নিজস্ব উদ্যোগে কোনমতে তাদের বসতঘর মেরামত করছেন। কেউবা সরকারি সহায়্যের আশায় খোলা আকাশের নীচে দিন পার করছেন। টিউবওয়েলগুলো অকেজো থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। যদিও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্যোগের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও খাওয়ার সেলাই বিতরণ করা হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। দুর্যোগ পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসনা শারমিন মিথি। সরেজমিনে এসব তথ্য জানিয়েছেন, চালচর ইউনিয়নের ভদ্রপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. রফিক (৪৫)।মো. রফিক পেশায় একজন দুধ বিক্রেতা। তার বসতঘরটি এখন ধ্বংসস্তুপ। তিনি বলেন, ‘গত ২৯ তারিখ রাতে বাহিরে তুফান চলছিল, ঘরের মধ্যেই ছিলাম এবং ঘরের চারপাশে পানি ছিল। ওইদিন রাতে নদীর দমা (ঢেউ) আর বাতাসে পিডাইয়া আমার ঘর তছনছ করে দিছে। পরে রাতের অন্ধকারে পানির মধ্য দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছি।’একই এলাকার মো. রফিকের মতো মো. মিলন (৩৬) ও কুলছুম বেগম (৩২) তাদের বসতঘর হারিয়ে খোলা আকাশের নীচে দিন-রাত পার করছেন। তাদের দাবি, সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা জরুরি প্রয়োজন।এদিকে বসতঘরের পাশাপাশি তিনটি খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৮ কোটি ৫৪ লাখ ১৯ হাজার ৮৮০ টাকা নির্ধারণ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এর মধ্যে প্রাণীসম্পদ খাতে ২৯ লাখ ১৯ হাজার ৮৮০ টাকা, কৃষি খাতে ৪ কোটি, মৎস্য খাতে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। যদিও ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে বলে ধারণা করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা।উপজেলা প্রাণীসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের তথ্যমতে, এ উপজেলায় গবাদিপশুর সংখ্যা ২২ লাখ ৮২ হাজার ১৯১টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৯৮৮টি মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ১৩ হাজার ১৯৬টি। এ ছাড়াও ২১১ একর চারণভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণীসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. রাজন আলী বলেন, ‘মৃত গবাদিপশুর ক্ষতির পরিমাণ ২০ লাখ ২ হাজার ৮৮০ টাকা। এ ছাড়াও খামারের অবকাঠামো, শুকনো খড়, ঘাস, দানাদার খাবারসহ অন্যান্য ক্ষতির পরিমাণ ২৯ লাখ ১৯ হাজার ৮৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারণ করা এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।’উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, ‘কৃষি খাতে ৪ কোটি টাকা ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে আউশধানের বীজতলা ৩৪ হেক্টর, সদ্য রোপা আউশধান ১০৫ হেক্টর, শাকসবজি ১৪৪ হেক্টর ক্ষতি হয়েছে। এতে ২ হাজার ৯৬০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, ‘মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাছের ঘের ১২০টি, পুকুর ও দীঘি ১ হাজার ২০০টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৮ লাখ পোনা ও ১৫৩ দশমিক ০৩৬ মেট্রিক টন মাছ ভেসে গেছে। এ ছাড়াও ৩২টি মৎস্য নৌযানের আংশিক ক্ষতি হয়েছে।’চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসনা শারমিন মিথি বলেন, ‘ঢালচর, চর কুকরি-মুকরি, চর পাতিলা ও মুজিবনগরসহ বিভিন্ন গ্রামে তিন শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের তহবিল থেকে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে টিন প্রদান করা হয়েছে। গৃহহীন পরিবারগুলোর মাঝে ৪০ বান টিন বিতরণ করেছি। পর্যায়ক্রমে আরো টিন বিতরণ করা হবে। এ ছাড়াও শুকনো খাবার, শাড়ি কাপড় বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। তবে উল্লেখিত তিনটি খাতের ক্ষতিপূরণ সরকারিভাবে প্রদান করার সুযোগ নেই।’ভোলা জেলা প্রশাসক মো. আজাদ জাহান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ভোলা জেলায় ৬৪ হাজার মানুষ চিহ্নিত হয়েছে। ৫ হাজার ৩৬৫টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এর মধ্যে ১০৮টি ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। আমরা দুর্গতদের ত্রাণের চাল ও শুকনো খাবার দিয়েছি। ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করা হবে।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
