“যুবলীগ নেতার পক্ষে ‘দায়সারা’ তদন্ত প্রতিবেদন এসআই মোস্তফার!”—শিরোনামে সময়ের কণ্ঠস্বরে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার বিতর্কিত উপপরিদর্শক (এসআই) মুহাম্মদ গোলাম মোস্তফাকে শাস্তিস্বরূপ বদলি করা হয়েছে। গত ৬ মে, পুলিশ সুপার আকতার হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তাকে জেলার রামগতি থানায় বদলি করা হয়। তবে আদেশ জারির এক সপ্তাহ পরও তিনি এখনও সদর থানায় অবস্থান করছেন।জানা গেছে, তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে গত ৭ মে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)-এ বদলির জন্য আবেদন করেন। এ সংক্রান্ত তদবিরে অংশ নিতে ১০ মে তিনি চট্টগ্রামে যান এবং সেখানে দুই দিন অবস্থান করেন। তার এমন আচরণ বদলির আদেশ ঘিরে পুলিশের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এটি তার পূর্বের আচরণেরই পুনরাবৃত্তি। এর আগেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাকে সদর থানা থেকে হাজিরহাট ফাঁড়িতে বদলি করা হলেও তিনি তদবির করে আদেশ বাতিল করান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন একই জেলায় দায়িত্ব পালন করার সুবাদে এসআই মোস্তফার সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে, যা একপর্যায়ে একধরনের প্রভাবশালী ‘সিন্ডিকেটে’ রূপ নেয়। এই সিন্ডিকেটের ছত্রচ্ছায়ায় থেকেই তিনি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যান।তার বিরুদ্ধে থানায় সালিশ বাণিজ্য, তদন্তের নামে ঘুষ গ্রহণ, ভুয়া রিপোর্ট প্রদান, এবং মীমাংসার জন্য দুই পক্ষকে থানায় ডেকে এনে ‘টেবিল খরচ’ নামে অর্থ আদায়ের একাধিক অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তিনি বেশিরভাগ সময় সরেজমিনে না গিয়ে অফিসে বসেই ইচ্ছেমতো মনগড়া তদন্ত প্রতিবেদন দিতেন। দীর্ঘদিন সদর থানায় থাকার ফলে তার সঙ্গে একটি প্রভাবশালী দালাল চক্রও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই চক্রের মাধ্যমেই তিনি মামলা ও অভিযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করতেন।এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পটপরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীতে যখন ব্যাপক রদবদল শুরু হয়, তখন অধিকাংশ কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও এসআই মোস্তফা সদর থানাতেই বহাল থাকেন। কারণ হিসেবে অনেকেই বলছেন, আওয়ামী ঘনিষ্ঠ পরিচিতি ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় সেই সময়েও তিনি বদলির হাত থেকে রক্ষা পান।এসআই গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলে ধরে গত ৯ এপ্রিল সময়ের কণ্ঠস্বর-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের পর পুলিশ বিভাগে তাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের নজরে এলে তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় বলে গোলাম মোস্তফা নিজেই স্বীকার করেছেন।এসআই গোলাম মোস্তফার অপকর্মের বিষয়ে একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘সে অনেক দুষ্ট। সে যেই থানাতেই যাবে, সেখানেই দুষ্টুমি করবে। তাকে নিয়ে আমরা বিব্রত।’জানা গেছে, এসআই মোস্তফার বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। ২০১৬ সালে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর থানায় যোগদানের মাধ্যমে জেলার সঙ্গে তার কার্যত স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাঝে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, চাঁদপুরের কচুয়া, ও ফেনীর ফুলগাজীতে দায়িত্ব পালন করলেও ২০২৩ সালের মার্চে ফের লক্ষ্মীপুর সদর থানায় বদলি হন তিনি। এরপর টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে সদর থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন।এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ওসি মো. আব্দুল মোন্নাফ বলেন, ‘এসআই গোলাম মোস্তফার রামগতি থানায় বদলি হয়েছে, ইতিমধ্যে থানা থেকে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তার কাছে কিছু মামলা রয়েছে, সেগুলো শেষ করেই আজই চলে যাবেন।’ তবে সিএমপিতে বদলির আবেদন সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য জানেন না বলেও জানান। এ সময় ওসি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে যারা ছিলেন, তাদের কাউকে রাখা হচ্ছে না। পর্যায়ক্রমে সবারই বদলি হবে।’এ বিষয়ে পুলিশ সুপার আকতার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব দেননি।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
