‘গাঙে (নদী) আমাগো সব লইয়া গ্যাছে, আমাগো বাপদাদার ভিটেমাটির উপর দিয়া এহন জাহাজ চলে। চোখের পলকে সব ভাইঙা লইয়া গ্যাছে গাঙে। এহন আবার গাঙ ধারে আ্যইয়া পড়ছে, আমরা কই যামু।’ এভাবেই কথা গুলো বলছিলেন ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের কালিকীর্তি গ্রামের বাসিন্দা আ. খালেক মাঝি। তিনি ৮০ বছরের বৃদ্ধ। মেঘনার তীব্র ভাঙনে এই বয়সেও ভিটেমাটি হারানোর চিন্তায় রয়েছেন। এই পর্যন্ত মেঘনার কাছে বসতভিটা হারিয়েছেন ৩ বার। তীব্র ভাঙনে এবারও বসতভিটার কাছে চলে এসেছে নদী। রাতে কখনো কখনো মেঘনার তীব্র গর্জনে ঘুম ভেঙে যায় তার। গেল দু’দিন আগে টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি) ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনিও।মেঘনার তীব্র ভাঙনে তার মতো অসহায় হাজার হাজার বাসিন্দা। ভাঙনে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। হুমকির মুখে পড়েছে শত শত বাড়িঘর, দোকানপাট, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ অসংখ্য মাছের ঘের।ভোলা শহর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার পূর্বদিকে রয়েছে শিবপুর ইউনিয়ন। তার পাশে রয়েছে পার্শ্ববর্তী দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়ন। এই দুই ইউনিয়নের ৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। শহররক্ষা বাঁধ থেকে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিটার দূরে আছে। অতি জোয়ারে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হওয়ার শঙ্কায় দিন পার করেছেন এখানকার মানুষ।মানচিত্র থেকে বিলীনের পথে এই দুই ইউনিয়ন। এরই মধ্যে ইউনিয়ন দু’টির আয়তনের অর্ধেক নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রাচীনতম বেশ কিছু নিদর্শন। এছাড়াও হুমকির মুখে ১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২টি মাদ্রাসা, ৪টি বাজার ও অসংখ্য মসজিদ।ইউনিয়ন দুটির বাকি অংশ বাঁচাতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ চেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ঘেরাও কর্মসূচি করেছে এই দুই ইউনিয়নের মানুষ।গেল সোমবার সকালে ভোলা-চরফ্যাশন আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর সড়ক অবরোধ করে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি করেন তারা। এ সময় তারা ‘আমার মাটি আমার মা, বিলীন হতে দেব না’, ‘ভাইঙা গেলে বসতবাড়ি, আমরা দিবো গলায় দড়ি’, ‘বালি বস্তার সাত্বনা, মানি না মানবো না’, ‘দাবী মোদের একটাই, টেকসই বাঁধ চাই’ মানলে দাবী সাধুবাদ, নইলে হবে প্রতিবাদ’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দেখা গেছে।পরে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া আশ্বাসে ঘেরাও কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন তারা। এর আগেও, নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান চেয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি করছেন এখানকার মানুষ।ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি) সূত্রে জানা যায়, গেল ৫০ বছরে ভোলার মানচিত্র থেকে মেঘনার পেটে বিলীন হয়েছে ২৫৭ বর্গকিলোমিটার। প্রতি বছরে বিলীন হচ্ছে ২ থেকে ৩ বর্গকিলোমিটার। তবে, এই পর্যন্ত কী পরিমাণ মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারিয়েছেন তার নির্দিষ্ট কোন তালিকা বা হিসেব নেই স্থানীয় প্রশাসন কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে।এদিকে, ভাঙা গড়ার খেলায় দিন দিন ছোট হয়ে আসছে দ্বীপজেলা ভোলার মানচিত্র, হুমকির মুখে জেলা শহরসহ বহু স্থাপনা। বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাসকূপগুলো অন্যতম।বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী শাসনে স্থায়ী কোন বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ না করায় অস্তিত্ব হারাতে বসেছে এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ। শুধু জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে নদী ভাঙন ঠেকাতে চায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। অভিযোগ, এ রকম অকার্যকর পদ্ধতিতে ক্ষতি হচ্ছে শুধু রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা। ভাঙন রোধে কার্যকর কিছুই হচ্ছে না।শিবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এ.কে.এম. নুর হোসেন মিয়া বলেন, ‘মেঘনার তীব্র ভাঙনে দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে শিবপুর ইউনিয়ন। নদী ভাঙন রোধ চেয়ে ঢাকায় বহু আন্দোলন সংগ্রাম করলাম। তাতেও সরকার কোন ভূমিকা নিচ্ছে না। তাই গেল সোমবার পানি উন্নয়ন বোর্ড ঘেরাও করেছি। তারা দুই মাসের মধ্যে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।’আরেক বাসিন্দা ইয়াসির আরাফাত সোহাগ বলেন, ‘মেঘনার ভাঙনে ইতিমধ্যে আমাদের একটি মাছঘাট ভেঙে গেছে। গরীবের দুই খ্যাত বালুর মাঠটি অর্ধেক ভেঙে মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে।’আরেক বাসিন্দা আবুল বশার বলেন, ‘বাবা-মায়ের ভিটেমাটি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখান আবার আমার নিজের ভিটেমাটি টুকুও নদীগর্ভে যাওয়ার পালা। নদী শাসনে সরকারের কার্যকর কোন ভূমিকা নেই। এভাবে চলতে থাকলে ভোলা মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাবে।’মেদুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান, ‘মেঘনার গর্জনে মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে যায়। চিন্তায় থাকি রাতের আধাঁরে কখন যেন ভেঙে সব নিয়ে চলে যায়। এবার ভাঙলে আর কোথাও যাওয়ার উপায় থাকবে না। টেকসই বাঁধ নির্মাণ করে মেঘনার ভাঙন থেকে আমাদের রক্ষা করার জোর দাবী জানাচ্ছি সরকারের কাছে।’এছাড়াও ভোলার রাজাপুর, কাঁচিয়া ও মাঝের চরের তীব্র ভাঙনেও বিলীন হয়েছে কয়েক কিলোমিটার এলাকা। সেখানকার বাসিন্দারাও ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন। গেল দুই মাসে মেঘনার ভাঙনে শিকার হয়ে বসতভিটা হারিয়েছেন প্রায় শতাধিক বসতবাড়ি, একটি বাজার, মাছঘাটসহ ২টি মক্তব।সম্প্রতি ভোলার ভাঙন কবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এনামুল হক। তিনি সদর উপজেলার ভাঙনকবলিত শিবপুর ইউনিয়নের মাছঘাট ও স্লুইজগেট এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন, ভোলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মিজানুর রহমান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী মো. হাসানুজ্জামান।পরে, ভোলার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি) ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি বৃহৎ প্রকল্প প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এটি অনুমোদন হলে নদী ভাঙন সম্পূর্ণ রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন কর্মকর্তারা।ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়া উদ্দিন আরিফ জানান, মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বৃহৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খুব শীঘ্রই কাজ শুরু করা হবে। আপাতত জিও ব্যাগ ও ডাম্পিং পদ্ধতির মাধ্যমে নদী ভাঙন কিছুটা রোধ করার চেষ্টা চলছে।এইচএ

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
সখীপুর থানার নবাগত ওসির সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময়
সখীপুর থানার নবাগত ওসির সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময়

নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের নতুন প্রত্যয় বুকে ধারণ করে টাঙ্গাইলের সখীপুর থানার নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভুঞা  প্রেসক্লাবের Read more

ক্ষেতলালে গভীর নলকূপের লাইনম্যানকে হত্যা
ক্ষেতলালে গভীর নলকূপের লাইনম্যানকে হত্যা

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় গভীর নলকূপের লাইনম্যানকে হাত-পা বেঁধে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার (১৫ আগস্ট) গভীর রাতে উপজেলার বরাইল ইউনিয়নের কালাইগাড়ি Read more

৩১ অক্টোবর: নামাজের সময়সূচি
৩১ অক্টোবর: নামাজের সময়সূচি

আজ শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ইংরেজি, ১৫ কার্তিক ১৪৩২ বাংলা, ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৭ হিজরি। ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার Read more

গাইবান্ধায় বিয়ের প্রলোভনে নৌকায় ধর্ষণ, গ্রেফতার যুবক
গাইবান্ধায় বিয়ের প্রলোভনে নৌকায় ধর্ষণ, গ্রেফতার যুবক

গাইবান্ধার ফুলছড়িতে প্রেমিকাকে নৌকায় করে ঘুরতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে প্রেমিকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সাদিকুল ইসলাম কনক (২৫) Read more

বিশেষ নিরাপত্তায় সাবেক এমপি মুক্তি বিশ্বাসকে নড়াইল কারাগারে
বিশেষ নিরাপত্তায় সাবেক এমপি মুক্তি বিশ্বাসকে নড়াইল কারাগারে

নড়াইল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতা বি এম কবিরুল হক মুক্তি বিশ্বাসকেনাশকতার চারটি মামলায় হাজিরার জন্য ঢাকা Read more

জীবননগরের হাসাদহ বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সবাই ফেল
জীবননগরের হাসাদহ বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সবাই ফেল

ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর যোগ না হওয়ায় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার হাসাদহ বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি ভোকেশনাল বিভাগ Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন