কক্সবাজারের টেকনাফের পাহাড়ে বসবাসকারীদের জন্য বৃষ্টি মানেই আতঙ্ক, ভয়ের নাম। শহরের মানুষের কাছে বর্ষা যতটা রোমান্টিক, ঠিক ততটাই বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা হাজারো পরিবারের কাছে। মেঘ জমলেই সেখানে কান্না নামে—বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘর, আশ্রয়, স্বপ্ন আর নিরাপত্তা। পাহাড় ধসের সম্ভাবনায় প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর শঙ্কায় জেগে থাকেন তারা। দিনশেষে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা আর অযোগ্য ব্যবস্থাপনাই হয়ে ওঠে এই মানুষের সবচেয়ে বড় অভিশাপ।ভুক্তভোগীরা বলছেন, অতীতের ভয়াল অভিজ্ঞতাগুলো তাদের স্মৃতিতে এখনও তাজা। ২০১০ সালের এক ভোরে টানা বর্ষণে যখন পাহাড় ধসে একে একে ৩৩টি প্রাণ ঝরে গিয়েছিল, তখন থেকেই বৃষ্টি নামলেই চোখে ভাসে সেই মৃত্যুপুরীর দৃশ্য। এরপরের বছরগুলোতে প্রশাসনের অনেক আশ্বাস এলেও বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে এখনো হাজারো মানুষ পাহাড়ের গা ঘেঁষে বাঁশ, টিন আর প্লাস্টিকে টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টা করে যাচ্ছেন; জেনেও যে, তাদের বাসস্থান আসলে একেকটা সময়নির্ধারিত মৃত্যুফাঁদ।টেকনাফ পৌর এলাকার পুরাতন পল্লান পাড়ার বাসিন্দা গৃহবধূ সমজিদা বেগম। তার ১৩ সদস্যের পরিবার। ঝুঁকিপূর্ণ বসতির কথা জেনেও গত ২০ বছর ধরে পাহাড়ের পাদদেশে টিকে আছেন। এবারও বৃষ্টি শুরু হলে প্রাণ বাঁচাতে সবাইকে নিয়ে ছুটে গেছেন পৌরসভার মায়মুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে।সমজিদা বলেন, ‘আমরা খুব গরিব মানুষ। দিনে যা পাই, তাই খাই। জমিজমা নেই, জমানো কিছু নেই। তাই বাধ্য হয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘর তুলেছি। এখন প্রতি বছর বৃষ্টি নামলেই মনে হয়, এই বুঝি সব শেষ হয়ে যাবে। এবারও কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টি দেখে আর থাকতে পারিনি। ১৩ জন সদস্য নিয়ে এই আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছি। জায়গাটা ছোট, কিন্তু অন্তত প্রাণটা তো বাঁচলো। তবে রোদ উঠলেই আবার সেই ঘরে ফিরতে হবে—এটাই সবচেয়ে কষ্টের।’সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিদ্যালয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছে অন্তত দেড়শ নারী, পুরুষ ও শিশু। তাদের মধ্যে অনেকেই হারিয়েছে ঘরবাড়ি, আবার অনেকেই মৃত্যুভয়ে পেছন ফিরে তাকায় না।চার মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন মোস্তফা খাতুন। তার চোখে-মুখে এখনও আতঙ্কের ছাপ। তিনি বলেন, ‘গতকাল রাতে যদি এখানে না আসতাম, আমার আর মেয়ের লাশ হয়তো আজ মাটির নিচে থাকত। সকালে খবর পাই—পাহাড়ের কিছু অংশ ধসে আমার ঘরের দেয়াল ভেঙে গেছে। চার মাসের রুহিকে নিয়ে দৌড়ে এসেছি। এখনো বুক কাঁপে। সরকারের কাছে আমাদের একটাই চাওয়া—একটা নিরাপদ জায়গায় পুনর্বাসন চাই। নয়তো প্রতি বছর এমন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে যেতে হবে।’পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আবদুল্লাহ বলেন, ‘ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে থাকি এখানে। মাইকিং হয় ঠিকই, কিন্তু যাবো কোথায়? পশু-পাখি ফেলে কেউ কি চলে যেতে পারে? বর্ষা এলেই আমরা জেগে থাকি। দরজা হাট করে রাখি, যাতে দৌড়ে পালাতে পারি।’এমনই একজন আবু ছৈয়দ, যিনি ২০ বছর ধরে ওই পাহাড়েই আছেন। তিনি বললেন, ‘আমার চোখের সামনে কত মানুষ মারা গেছে। কিন্তু যাওয়ার জায়গা নেই বলেই এখানেই আছি। সরকার যদি একটা খোলা জায়গা দিত, একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই বানাতাম। কিন্তু কেউ আমাদের দেখে না। বর্ষা এলেই সবাই এসে ছবি তোলে, কাঁদায়, চলে যায়। আর আমরা আবার ভেসে যাই বৃষ্টির জলে।’জুহুরা বেগম নামের আরেক বাসিন্দা জানান, ‘পাহাড় ধসে আমাদের ঘরটা শেষ। সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে এখানে (আশ্রয়কেন্দ্রে) এসেছি। কিন্তু বৃষ্টি থামলে আমরা যাবো কোথায়? মাথা গোঁজার মতো কিছু তো নেই।’টেকনাফ পুরাতন পল্লান পাড়ার সিপিপি লিডার কুলসুমা আক্তার জানান, ‘সিপিপির সদস্যরা দিনরাত কাজ করছে। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নামতে বলা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেড়শ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছে, আরও অনেকে ঝুঁকিতে রয়েছে।’স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুল বলেন, ‘মূলত বন বিভাগের কিছু দুর্নীতির সুযোগে পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাসহ অনেকেই ঘর তুলেছে। যেগুলো বর্ষা এলেই ধসে পড়ে। এদের দ্রুত সরিয়ে না নিলে বড় দুর্ঘটনা ঘটবেই।’টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে লোকজনকে সরে যেতে বলা হচ্ছে। যারা আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছে, তাদের তিন বেলা খাবার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সেন্টমার্টিনসহ টেকনাফের জন্য ১৫ টন ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের কাছেও তা পৌঁছে দেওয়া হবে।’তথ্য সূত্র বলছে, ২০১০ সালের ১৪ জুন টানা বর্ষণে টেকনাফে ৩৩ জন মারা যায় পাহাড়ধসে। এরপর ২০১০ ও ২০১২ সালে উখিয়ায় আরও ১৫ জন নারী-শিশু প্রাণ হারান। সেসব ঘটনা কেবল স্মৃতিতে রয়ে গেছে, বাস্তবতায় পরিবর্তন কিছুই হয়নি।এসআর

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
সরিষাবাড়ীতে জুলাই শহীদদের স্মরণে কবরের পাশে বৃক্ষরোপণ
সরিষাবাড়ীতে জুলাই শহীদদের স্মরণে কবরের পাশে বৃক্ষরোপণ

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ‘এক শহীদ, এক বৃক্ষ’ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। প্রত্যেক শহীদের কবরস্থানে লাগানো হয়েছে নিম, বকুল Read more

আমরা এমন রাষ্ট্র গড়ব, যা দেখে বিশ্ব অনুসরণ করবে: ড. ইউনূস
আমরা এমন রাষ্ট্র গড়ব, যা দেখে বিশ্ব অনুসরণ করবে: ড. ইউনূস

আমরা এমন রাষ্ট্র গড়তে চাই, যা দেখে বিশ্ব আমাদের অনুসরণ করবে। জুলাই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে সব ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে Read more

খালেদা জিয়ার জানাজা-দাফন ঘিরে নিরাপত্তায় ২৭ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
খালেদা জিয়ার জানাজা-দাফন ঘিরে নিরাপত্তায় ২৭ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ২৭ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা Read more

মেহেরীন চৌধুরীর আত্মত্যাগ: সমাধিতে নীলফামারীর ডিসি-এসপির শ্রদ্ধা
মেহেরীন চৌধুরীর আত্মত্যাগ: সমাধিতে নীলফামারীর ডিসি-এসপির শ্রদ্ধা

রাজধানীর উত্তরায় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা মেহেরীন চৌধুরীর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন নীলফামারীর পুলিশ সুপার Read more

গাজীপুর-২: টঙ্গীতে ধানের শীষের সমর্থনে একমঞ্চে সাত মনোনয়ন প্রত্যাশী
গাজীপুর-২: টঙ্গীতে ধানের শীষের সমর্থনে একমঞ্চে সাত মনোনয়ন প্রত্যাশী

গাজীপুর-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে একই দলের সাত মনোনয়ন প্রত্যাশী একমঞ্চে উঠেছেন। সকল ভেদাভেদ ভুলে অদৃশ্য শক্তির মোকাবিলা করে Read more

শ্যামলীতে ডিপিডিসির সংস্কার কাজে ‘চা-নাস্তার’ নামে টাকা আদায়, মই পড়ে আহত ১
শ্যামলীতে ডিপিডিসির সংস্কার কাজে ‘চা-নাস্তার’ নামে টাকা আদায়, মই পড়ে আহত ১

বিদ্যুতের জরুরি সংস্কার কাজের নামে অসম্পূর্ণ ও অপরিকল্পিত কাজে ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজধানীর শ্যামলী পিসিকালচার সোসাইটি এলাকার বাসিন্দারা। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন