দিনব্যাপী নানা বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ১০৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (০১ জুলাই) সকাল ৯.৪৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর সংলগ্ন স্মৃতি চিরন্তনের সামনে থেকে এই শোভাযাত্রা শুরু হয়। সকাল ১০টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সম্মুখস্থ পায়রা চত্বরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলসমূহের পতাকা উত্তোলন এবং কেক কাটা হয়। এ সময় সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জাতীয় সংগীত ও দেশাত্মবোধক গান এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অন্য একটি সংগীত পরিবেশিত হয়।পরে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে (টিএসসি) আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ। তিনি বলেন, আজকের এই গৌরবময় দিনে- ১ জুলাই ২০২৫, আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক শতাব্দী ও চার বছরের এক দীপ্ত ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক, সভ্যতা গঠনের শিকড় ও স্বাধীনতার জাগরণগাথা। আজ যে দিনটি আমরা উদযাপন করছি, তার প্রতিপাদ্য- ‘বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি আমাদের বোধ, আমাদের নৈতিক দায় এবং আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মই হয়েছিল বৈষম্য দূরীকরণের তাগিদে। তাই আজকের এই প্রতিপাদ্য ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যেমন যুক্তিযুক্ত, তেমনি বর্তমান সময়ের বিবেচনায় তা অত্যন্ত উপযোগী।তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ অর্জন হচ্ছে এর অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশিষ্ট্য। এখানে ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, নারী-পুরুষ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘু সবাই পেয়েছেন সমান মর্যাদা। এখানে প্রতিটি কণ্ঠের রয়েছে মূল্য, প্রতিটি স্বপ্নের রয়েছে ছুঁয়ে দেখার অধিকার।সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান- এই ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলো একে অপরের পরিপূরক। এগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর যেকোনো অপচেষ্টা আমরা প্রতিহত করবো। এসব আন্দোলনই আমাদের অহংকার, আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, বড় রাজনৈতিক ভূমিকা পালনের পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নেও আমরা দায়বদ্ধ। যারা গণঅভ্যুত্থানে রক্ত দিয়েছে, প্রাণ দিয়েছে তারা আমাদের কাঁধে কিছু দায় ও দায়িত্ব রেখে গেছে। সেই দায়িত্ব হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে বিশ্বাস ও সহযোগিতার বন্ধন অটুট রাখা।এ সময় উপাচার্য আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র ৬০ জন শিক্ষক ও ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে। আজ সেই প্রতিষ্ঠান পরিণত হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার এবং শিক্ষক আছেন প্রায় ২ হাজার। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে ২০০টি প্রতিষ্ঠান, যেখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। নিঃসন্দেহে, এটি আমাদের জন্য একটি গর্বের বিষয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা কখনো শুধু একাডেমিক পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণগুলোতে সমাজের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এই চলার পথ বহু শ্রম, ঘাম ও রক্তে রঞ্জিত এ কথা আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে। ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ এবং ১৯৯০-এর প্রতিটি আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান ইতিহাসে গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান আমাদের সংগ্রামের নতুন অধ্যায়। দেশের মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভরসা রেখেছে বলেই প্রতিটি ক্রান্তিকালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকে সাড়া দিয়েছে, রাস্তায় নেমেছে, আন্দোলন করেছে এবং অধিকার আদায় করে নিয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি জনগণের অগাধ বিশ্বাসের কারণে।তিনি বলেন, আমরা ২০২৪-এর অভ্যুত্থানকে একাডেমিকভাবে মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। এরই অংশ হিসেবে আমাদের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যৌথভাবে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করেছে। ইতিহাসে কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে বিশেষত ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে তাদের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা আমাদের প্রেরণা জোগায়। আমাদের ২৪-এর অভ্যুত্থানের সঙ্গে এই ঘটনাগুলোর একটা ঐতিহাসিক সাদৃশ্য রয়েছে।শিক্ষার্থীরা থাকবে পড়ার টেবিলে, আর শিক্ষকরা উদারতা ও সহনশীলতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে যাবেন উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, তবেই আমরা একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সচেতন জাতি গঠনের পথে এগিয়ে যেতে পারবো। সীমাবদ্ধতা আমাদের আছে। তবুও আমরা জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিরূপ। কেবল সরকারের সহায়তায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যেতে পারে না। সমাজকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের পথ চলতে হবে। সে লক্ষ্যেই কমিউনিটি আউটরিচ আমাদের অঙ্গীকার।আলোচনা সভায় আরও অংশ নেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান দুদু। সঞ্চালন করেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দীন আহম্মদ।এসআর

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচন: প্রধান উপদেষ্টা
২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচন: প্রধান উপদেষ্টা

আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধের যেকোনো একটি দিনে অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।শুক্রবার Read more

চৌগাছা উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক গ্রেফতার
চৌগাছা উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক গ্রেফতার

যশোরের চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ফুলসারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহেদি মাসুদ চৌধুরী আটক হয়েছে। অপারেশন ডেভিল হান্ট অভিযান-২ Read more

পত্রিকা: ‘নেপথ্যে ক্ষমতাচ্যুত আ.লীগের ইন্ধন’
পত্রিকা: ‘নেপথ্যে ক্ষমতাচ্যুত আ.লীগের ইন্ধন’

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে প্রকাশিত বেশিরভাগ পত্রিকার প্রথম পাতায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য, Read more

ঢাকা রুটে দুইদিনের ফ্লাইট বাতিল করলো এয়ার চায়না
ঢাকা রুটে দুইদিনের ফ্লাইট বাতিল করলো এয়ার চায়না

চীনের বেইজিং থেকে ঢাকা রুটের ২ দিনের ফ্লাইট বাতিল করেছে এয়ার চায়না। ১৭ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।আজ Read more

৮৩ সন্তানের মা হচ্ছেন বিশ্বের প্রথম ‌‘এআই মন্ত্রী’
৮৩ সন্তানের মা হচ্ছেন বিশ্বের প্রথম ‌‘এআই মন্ত্রী’

সম্পতি বিশ্বের প্রথম এআই মন্ত্রী ডিয়েলাকে নিয়োগ দিয়ে চমকে দিয়েছিল আলবেনিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এডি রামা জানান, ডিয়েলা নাকি ‘গর্ভবতী’। শুধু Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন