চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার– একসময় সারি সারি সবুজে মোড়া পাহাড়, পাখির কলতান আর প্রকৃতির শান্ত নীরবতায় ভরা ছিল এ অঞ্চল। আজ সেখানে পাহাড় যেন কেবলই স্মৃতির অংশ। মতিঝর্ণা টিলা, চানমারি পাহাড়, শাহাজান পাহাড়, ওয়াবি পাহাড়, অবাঙ্গালী পাহাড়, বাটালি পাহাড় ও সিআরবি পাহাড়– নামগুলো এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু পাহাড়গুলো কেটে, চেঁছে গিলে খেয়েছে মানুষের লোভ।এই পাহাড়গুলো ছিল নগরের ফুসফুস, বৃষ্টির জল ধারণের প্রাকৃতিক বাঁধ। অথচ বিগত কয়েক দশকে একে একে সেগুলো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গিয়েছে অবৈধ দখল, পাহাড় কাটার যন্ত্রণা আর প্রশাসনিক উদাসীনতার কাছে।লালখান বাজারে ভারী বৃষ্টি মানেই পাহাড় ধসের শঙ্কা। বড় দুর্ঘটনা ঘটলে প্রশাসনের নজরে আসে, কিন্তু ছোটখাটো ধস বেশিরভাগ সময় আড়ালেই থেকে যায়। অবৈধ বসবাসকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে এই ঘটনাগুলো গোপন রাখে, যেন উচ্ছেদের মুখোমুখি না হতে হয়। সিটি করপোরেশনও যেন ‘জানার চেষ্টা’ করে না– এমনই অভিযোগ স্থানীয়দের।গত ২৮ জুলাই সকালে মতিঝর্ণা এলাকার ৬ নম্বর গলিতে ঘটে এমনই এক ধসের ঘটনা। কিরণ নামে এক ব্যক্তির পাহাড়ি জমির রিটেইনিং ওয়াল ভেঙে তালেব আলীর সেমিপাকা ঘরে মাটি ঢুকে পড়ে। হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও বসবাস এখন সেখানে মৃত্যুঝুঁকির সমান।ঘটনাস্থলে গিয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, শ্রমিকরা মাটি ও ভেঙে পড়া দেওয়াল সরিয়ে নিয়েছে। তালেব আলীকে পাওয়া না গেলেও তাঁর ছেলে সোহেল সময়ের কণ্ঠস্বর-কে বলেন, ‘ওয়ালটা অনেকদিন ধরে হেলে ছিল। বৃষ্টির কারণে ধসে পড়েছে, এখন ঘরের দেওয়ালে ফাটল ধরেছে।’এদিনই একই এলাকায় আরেকটি পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে, যা কেউ প্রকাশ করতে চাইছিল না। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য– চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওয়াচ টাওয়ারের নিরাপত্তা অফিসের সামনেই ৪০-৪৫ ফুট উঁচু থেকে পাহাড় ধসে পড়েছে। সকাল ৯টার দিকে বিকট শব্দে বিশাল গাছসহ পাহাড়ের অংশ ভেঙে বসতবাড়ির পাশে গিয়ে থামে।চসিকের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের কণ্ঠস্বর-কে জানান, ধসের পর মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবুও বিপদ কাটেনি– পাহাড়ে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে কয়েকটি বড় গাছ, যা যে কোনো মুহূর্তে নতুন ধস নামাতে পারে।মতিঝর্ণা টিলা বা টাংকি পাহাড়ের ওপর থেকে তাকালে দেখা যায়– খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় দু’হাজার কাঁচা-পাকা বসতবাড়ি। পুরনো ঘরের পাশেই নতুন দালান উঠছে। রেলওয়ে মালিকানাধীন অন্তত ২৫ একর পাহাড়ি এলাকা রাতের আঁধারে কেটে নেওয়া হচ্ছে। দিনে শান্ত, রাতে ড্রেজার আর শাবলের শব্দে কেঁপে ওঠে পাহাড়।২০০৮ সালে এই এলাকাতেই পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছিল এক পরিবারের ১২ জন। তবুও প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে দখলদাররা বহাল তবিয়তে আছে। বিদ্যুৎ ও পানির অবৈধ সংযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে এসব বসতিতে, যা পাহাড়ের মৃত্যু ত্বরান্বিত করছে।পরিবেশবিদদের তথ্য মতে, চট্টগ্রাম ইতোমধ্যে ১২০টির বেশি পাহাড় হারিয়েছে। বর্ষায় নিয়মিত পাহাড় ধস আর প্রাণহানি ঘটছে। এই ধারা চলতে থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে চট্টগ্রাম ‘পাহাড়হীন শহর’ হয়ে যাবে।পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (চট্টগ্রাম মহানগর) সোনিয়া সুলতানা সময়ের কণ্ঠস্বর-কে জানান, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি ৫টি জোনে কাজ করছে। ২৮ জুলাই মতিঝর্ণা এলাকায় ধসের পর অবৈধ বসতি সরাতে নোটিশ ও মাইকিং করা হয়েছে। ‘বৃষ্টির আগে থেকেই সতর্কতা দেওয়া হয়, কিন্তু অনেকে জায়গা ছাড়তে চায় না, কারণ দখল ধরে রাখতে চায়,’ বলেন তিনি।রেলওয়ে ও বন বিভাগকে তাদের জমি দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাহাড় কাটার প্রমাণ মিললেই মামলা ও জরিমানা করা হয় বলে জানান সোনিয়া সুলতানা।চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনরা বলছেন, চট্টগ্রামের পাহাড় একসময় ছিল শহরের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ– বৃষ্টির স্রোতকে বুকে ধারণ করে প্রাণ দিতো সমতলের নদী-খালকে। আজ সেই পাহাড়ের বুক চিরে দালান গজিয়েছে, রাতের আঁধারে দাঁত বসেছে ড্রেজার ও শাবলের। প্রকৃতির সতর্কবার্তা আমরা শুনছি না– বৃষ্টির জল আর কাদামাটির ঢল যেন কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং মানুষের হাতে নির্মিত বিপর্যয়।পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা মাটির স্রোত আসলে আমাদের নিজেদের ধ্বংস করছে– যেখানে লোভ, দখলদারি আর প্রশাসনিক নীরবতা মিলে তৈরি করছে এক অদৃশ্য মৃত্যুকূপ। যদি এখনই থামানো না যায়, তাহলে একদিন এই শহর শুধু পাহাড় নয়, নিজের অস্তিত্বও হারাবে।এই প্রসঙ্গে মতামত জানতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।এসআর

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
এবার যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন ভিসার ফি বাড়ছে ১৩৫ শতাংশের বেশি
এবার যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন ভিসার ফি বাড়ছে ১৩৫ শতাংশের বেশি

আগামী ১ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন ভিসার (বি১/বি২) ফি বাড়তে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে গত মাসে ‘বিগ বিউটিফুল Read more

বিষাক্ত ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন দিল্লি, বায়ুদূষণ ১৬ গুণের বেশি
বিষাক্ত ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন দিল্লি, বায়ুদূষণ ১৬ গুণের বেশি

ভারতের নয়াদিল্লি বায়ুদূষণের বিষাক্ত ধোঁয়াশায় ঢেকে গেছে। দীপাবলির আতশবাজি, যানবাহনের ধোঁয়া ও কৃষিজ ফসল পোড়ানোর ফলে দূষণ এতো বেড়েছে যে, Read more

মোবাইল ফোনের ব‍্যাটারি কত শতাংশ থাকলে চার্জ দেবেন?
মোবাইল ফোনের ব‍্যাটারি কত শতাংশ থাকলে চার্জ দেবেন?

আমাদের নিত্যদিনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। দিনের বেশিরভাগ সময়ই কোনো না কোনো ভাবে এটা ব্যবহার করতে হয়। সে Read more

ঘুষ না পেয়ে যুবকের হাত ভাঙল পুলিশ!
ঘুষ না পেয়ে যুবকের হাত ভাঙল পুলিশ!

রিমান্ডে নেওয়ার পর আসামির পরিবার ঘুষ না দেওয়ায় থানা হেফাজতে এক যুবকের হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত Read more

জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চেয়ে পাগলা মসজিদের দানবাক্সে চিঠি
জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চেয়ে পাগলা মসজিদের দানবাক্সে চিঠি

কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদে টাকা, সোনা-রুপা, বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়াও অনেক ধরনের চিঠি পাওয়া যায়। যা আল্লাহকে উদ্দেশে করে পাগলা মসজিদের দান Read more

ইসরায়েলের হামলায় আহত হন ইরানের প্রেসিডেন্টও, অল্পের জন্য বেঁচে যান
ইসরায়েলের হামলায় আহত হন ইরানের প্রেসিডেন্টও, অল্পের জন্য বেঁচে যান

তেহরানে ইসরায়েলের একটি হামলায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আহত হয়েছিলেন। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চলাকালে গত ১৫ Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন