চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন কক্সবাজার জেলায় এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ধস দেখা গেছে। পাশের হার ও জিপিএ-৫- দুটোতেই কমেছে চোখে পড়ার মতো হারে। জেলায় গড় পাশের হার কমে এসেছে ৭০ দশমিক ৭৬ শতাংশে, যা গত বছরের তুলনায় ১২.৮৮ শতাংশ কম। পাশাপাশি, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ১১১ জন।বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০ হাজার ২৫৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৪ হাজার ৩৩৩ জন। মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ১৯০ জন শিক্ষার্থী।চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, এ বছর ১১ হাজার ৮৩৩ জন মেয়ে পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৮ হাজার ২৬৭ জন। পাশের হার ৭০.৪৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬০২ জন। অন্যদিকে, ৮ হাজার ৫৪৯ জন ছেলে পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬ হাজার ৬৬ জন। পাশের হার ৭১.২২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৮৮ জন।তবে বরাবরের মতো এবারও বিজ্ঞান বিভাগ এগিয়ে। ১,১৯০ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ১,১০৭ জনই এসেছে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে।ফলাফলে জিপিএ-৫ এর দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৩৩ জন) ও কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (১২৫ জন)। তবে জেলার অনেক খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে ব্যাপক ফল বিপর্যয়।এক সময়ের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার মডেল হাই স্কুল এ বছর চরম ধসের মুখে পড়েছে।ফল প্রকাশের পর থেকেই কক্সবাজারের শিক্ষা মহলে বইছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। পাশের হার ও জিপিএ-৫ হ্রাস পাওয়াকে অনেকেই দেখছেন দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, শিক্ষক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিদ্যালয়ভিত্তিক দলাদলির পরিণতি হিসেবে।বিশেষ করে কক্সবাজার মডেল হাই স্কুলসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ক্লাসে গাফিলতি, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও শৃঙ্খলার অভাব—সব মিলিয়ে এ পতনের দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।২০২৫ সালে পরীক্ষার্থী ২৫২ জন, পাশ করেছে ২২০ জন, ফেল করেছে ৩২ জন, পাশের হার ৮৭.৩০%, জিপিএ-৫ মাত্র ১৬ জন। অথচ গত তিন বছর এ প্রতিষ্ঠানের পাশের হার ছিল প্রায় ৯৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে পাশের হার ছিল ৯৭.৪৯%, জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২১ জন। ২০২৩ ও ২০২২ সালেও জিপিএ-৫ পায় যথাক্রমে ২৫ ও ৩৬ জন।কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের ঠিকভাবে পাচ্ছি না। মোবাইল ফোনের আসক্তি, টিউশন নির্ভরতা আর এক ধরনের অবহেলা থেকে শিক্ষার্থীরা স্কুলে অনিয়মিত হচ্ছে। শিক্ষার পরিবেশ যেমন দুর্বল, তেমনি শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়েছে।কক্সবাজার বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমির সিনিয়র শিক্ষক বলেন, শুধু শিক্ষার্থী নয়, অনেক শিক্ষকও এখন দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে পড়েছেন। বিদ্যালয়ে ক্লাস কম হচ্ছে, অথচ অভিভাবকরা জানতেই পারছেন না সন্তান কী করছে। অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয় একেবারে ভেঙে পড়েছে।অভিভাবকদের অভিযোগ, এই হঠাৎ পতনের পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা। নুরুল আমিন নামের এক অভিভাবক বলেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়ার জন্য গত বছর কিছু শিক্ষক, প্রাক্তন ছাত্র ও বহিরাগতদের দিয়ে আন্দোলন করানো হয়েছিল। এখন একজন বয়োবৃদ্ধ শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যিনি শারীরিকভাবেও অক্ষম এবং আগামী মাসেই অবসরে যাবেন। মূলত এই ফাঁকে কিছু স্বার্থান্বেষী শিক্ষক ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে।তিনি আরও বলেন, ক্লাসে যাওয়া অনিয়মিত, শিক্ষার্থীদের কোনো মনিটরিং নেই, কেউ তিন দিন আসছে, কেউ একদিন- এরকম চলেছে পুরো বছর। ফলাফল তারই প্রতিফলন।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রাক্তন ছাত্র বলেন, স্কুলে এখন পড়াশোনার কোনো পরিবেশই নেই। ক্লাস হয় ইচ্ছেমতো। এমনকি ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আগে কেউ স্কুলে না গেলে অভিভাবকদের কাছে এসএমএস যেত। এখন স্কুল টাইমে ছাত্ররা ঝাউবাগান বা সমুদ্র পাড়ে ঘোরাঘুরি করে, কেউ কেউ তো সিগারেট খায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে।অভিভাবক ইছমত আরা জানান, স্কুলের ওয়াশরুমে সিগারেট খাওয়া, ছুরি নিয়ে মারামারি- এসব আমাদের ছেলেমেয়েরা করছে। শিক্ষকরা কিচ্ছু বলেন না। যে স্কুল এক সময় জেলার গর্ব ছিল, এখন সেটা আতঙ্কের জায়গা।মো. শফিকুল ইসলাম তার ছেলেকে কক্সবাজার মডেল হাই স্কুলে পড়াচ্ছেন, তিনি বললেন, গত বছরের তুলনায় এবার ফল এমন খারাপ হবে ভাবিনি। স্কুলে ডিজিটাল হাজিরা বন্ধ, শিক্ষকদের রাজনৈতিক ভাগাভাগি, আর ছাত্রদের শৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। আমাদের ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যৎ হারাচ্ছে।ঈদগাঁওর এক শিক্ষিকা বললেন, ‘জিপিএ-৫ কমা মানে কেবল নম্বর কম পাওয়া নয়, এটা আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে প্রশ্ন। যতদিন না নীতিনির্ধারক ও অভিভাবকরা একসঙ্গে কাজ করবেন, ততদিন এ পতন রোধ হবে না।’ইসমত আরা নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘স্কুলে গিয়ে দেখি, ছাত্ররা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। কিছু শিক্ষক আছে যারা ক্লাসে না গিয়েই মাস শেষে বেতন তুলছেন। অভিভাবকদেরও এখন ঘুরে দাঁড়াতে হবে।’খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একদিকে যেমন কিছু প্রতিষ্ঠান শতভাগ পাশ করেছে (যেমন- রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল, বদিউল আলম স্মৃতি বিদ্যাপীঠ), অন্যদিকে অনেক বিদ্যালয়ে পাশের হার ৬০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।ঈদগাহ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পেয়েছে সর্বোচ্চ ১৪টি জিপিএ-৫, পাশের হার ৭৫.৩৫%। ঈদগাহ জাহানারা ইসলাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পাশের হারে শীর্ষে- ৯০.৯১%।অন্যদিকে পোকখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, দ্বীপশিখা একাডেমি, সাইমম সারোয়ার কমল উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পাশের হার ৬০ শতাংশের নিচে, জিপিএ-৫ শূন্য।শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ফলাফলের এই নিম্নমুখী চিত্র প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতা, রাজনীতি প্রভাবিত নিয়োগ ও দুর্বল তদারকির ফল।রামুর এক প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘শিক্ষকদের মধ্যে উৎসাহ নেই, শিক্ষার্থীরা লক্ষ্যহীন, অভিভাবকরা অসহায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ, কঠোর নজরদারি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা।’একজন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, ‘কক্সবাজারে এবার ফলাফল খুবই হতাশাজনক। আমরা প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে তদন্ত করব- ফলাফল কেন এমন হয়েছে, কোন শিক্ষকেরা দায়িত্বহীন ছিলেন, তা খুঁজে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘স্কুলে ডিজিটাল হাজিরা পুনরায় চালু, শৃঙ্খলা রক্ষায় অভিভাবক ও প্রশাসনের সমন্বয়, শিক্ষক মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা, শিক্ষার্থীদের জন্য মনিটরিং সেল, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষা পরিবেশ করতে পারলে এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।’তাদের মতে, ‘একটি জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত যদি কাঁপে, তাহলে শুধু ফলাফল নয়- ভবিষ্যৎও ঝুঁকির মুখে পড়ে। কক্সবাজারের মডেল হাই স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানের পতন আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এখনই না জাগলে, সামনে হয়তো আরও গভীর অন্ধকার।’এসআর

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুসহ নিহত দুই
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুসহ নিহত দুই

বাউফল-লেবুখালী মহাসড়কে যাত্রীবাহী ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা ও টমটমের সংঘর্ষে শিশুসহ দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল ৯টার দিকে দুমকি Read more

শীতের নিঃশব্দ আগ্রাসন, কুয়াশায় ঢাকা দিনাজপুরের ভোর
শীতের নিঃশব্দ আগ্রাসন, কুয়াশায় ঢাকা দিনাজপুরের ভোর

ভোরের ঘড়িতে তখন ছয়টা বাজে। দিনের আলো আসার কথা থাকলেও দিনাজপুর যেন আলো পেতে দেরি করছে। চারদিক ঘন কুয়াশায় মোড়ানো। Read more

তিতাস নদীর পানি ব্যবহারের পরিকল্পনা ত্রিপুরা সরকারের
তিতাস নদীর পানি ব্যবহারের পরিকল্পনা ত্রিপুরা সরকারের

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরা পানীয় জলের বিকল্প উৎস হিসেবে বাংলাদেশের তিতাস নদীর পানি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক Read more

গুলি করে হত্যা করা সেই ফিলিস্তিনি শিশুর লাশ এখনো ফেরত পায়নি পরিবার
গুলি করে হত্যা করা সেই ফিলিস্তিনি শিশুর লাশ এখনো ফেরত পায়নি পরিবার

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)-এর এক সহায়তা বিতরণ কেন্দ্রে ত্রাণ নেওয়ার কিছুক্ষণ পরই আমির নামে এক শিশুকে Read more

বান্দরবানে বিজিবির অভিযানে ইয়াবাসহ মাদক কারবারি আটক
বান্দরবানে বিজিবির অভিযানে ইয়াবাসহ মাদক কারবারি আটক

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়  সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর অভিযানে ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ এক রোহিঙ্গা মাদক কারবারীকে Read more

জীবিকার খোঁজে এসেছিলেন সাতকানিয়ায়, ফিরলেন লাশ হয়ে
জীবিকার খোঁজে এসেছিলেন সাতকানিয়ায়, ফিরলেন লাশ হয়ে

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় শঙ্খ নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হওয়া মোহাম্মদ করিম (২১) নামের এক যুবকের লাশ নিখোঁজের ২৩ ঘণ্টা পর Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন