রাজধানীর উত্তরার আবাসিক হোটেলগুলোতে অনৈতিক কার্যকলাপ ঠেকাতে পুলিশ অব্যাহতভাবে অভিযান চালাচ্ছে। নিয়মিত গ্রেফতার ও মামলার পরেও কয়েক দিনের মধ্যেই জামিনে বের হয়ে অপরাধীরা আবারও একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। ফলে কার্যত হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্থানীয়রা বলছেন, শুধু পুলিশের অভিযান নয়, সিটি কর্পোরেশনের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ভবন মালিকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনলেই এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।উত্তরার বিভিন্ন সেক্টর—৪, ৬, ৭, ৯, ১০, ১১, ১৩ ও ১৪ নম্বর এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে আবাসিক হোটেল। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি হোটেলেই ৬-৭ জন তরুণীকে দিয়ে দেহব্যবসা চালানো হয়। খদ্দেরদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ঘণ্টাপ্রতি মোটা অঙ্কের টাকা, আর পুরো রাতের জন্য ভাড়া আরও কয়েকগুণ বেশি। স্থানীয়দের অভিযোগ, হোটেল মালিকরা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের নিয়মিত উৎকোচ দিয়ে ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন।আজমপুর কাঁচা বাজারের সিঙ্গাপুর আবাসিক হোটেল ও ভবনের মালিক আওয়ামী লীগ নেতা হাসান মাহমুদের নামও উঠে এসেছে এ ধরনের অভিযোগে। শুধু তাই নয়, অনেক হোটেলের সামনে বিমান অনুমোদিত লোগো ব্যবহার করে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করারও প্রমাণ মিলেছে।বিমানবন্দর মহাসড়কের ফুটওভার ব্রিজ ও উত্তরার ফুটপাতজুড়ে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন হোটেলের রঙিন ভিজিটিং কার্ড। এসব কার্ডে দেওয়া আছে মালিকদের মোবাইল নাম্বার। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকাশ্যে কার্ড ছিটিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলাচল করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এসব কারণে নষ্ট হচ্ছে যুবসমাজ এবং ক্ষুন্ন হচ্ছে সামাজিক মর্যাদা।গত ১৩ই সেপ্টেম্বর শনিবার রাতে উত্তরা আব্দুল্লাহপুর এলাকায় ড্রিম গার্ডেন ও প্রাইম আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ ৪ নারী ও ৬ পুরুষকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন—প্রান্তর (২০), ফয়সাল (২১), আব্দুল কাদের (৫০), আল-আমীন (২০), শ্রী তনয় ওরফে অপু (৪০), সাঈদ মিয়া (২২), লিপি আক্তার (২৪), সাবিয়া আক্তার (২০), রেজিয়া খাতুন (২৩) ও মেহনাজ তাহজিন মিন (২৮)।গত কয়েক মাসে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের অভিযানে অন্তত দুই শতাধিক নারী-পুরুষ গ্রেফতার হয়ে আদালতে চালান হয়েছে। তবে নিয়মিতই দেখা যায়, কয়েক দিনের মধ্যে অভিযুক্তরা জামিনে ফিরে এসে আবারও একই ব্যবসা শুরু করছে।আবাসিক হোটেলগুলোকে কেন্দ্র করে শুধু অনৈতিক কার্যকলাপই নয়, ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকের ব্যবসাও দেদারসে চলছে। তরুণ-যুবকদের আড্ডা, কলগার্লদের আনাগোনা এবং ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে গোপনে ব্যবসা সবকিছুই উত্তরার বাস্তব চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কম বয়সীরা লেখাপড়া বাদ দিয়ে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। টাকার জোগান দিতে তারা চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধেও লিপ্ত হচ্ছে।এ প্রসঙ্গে উত্তরা পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুর রহিম মোল্লা বলেন, তথ্য পেলেই আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। অন্যদিকে উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা নিয়মিত রেইড দিচ্ছি। তবে অপরাধীরা জামিনে বের হয়ে নাম-ঠিকানা পরিবর্তন করে আবারও একই অপরাধ শুরু করে। সীমিত জনবল নিয়ে বিশাল এলাকায় কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।তিনি আরও জানান, প্রতি ১,৫০০ মানুষের বিপরীতে একজন পুলিশ কাজ করছে। একটি থানায় গড়ে ১২০ জন সদস্য থাকলেও তাদের নানা ধরণের অপরাধ দমন করতে হয়। এ কারণে শত চেষ্টা করেও কিছু অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা যায় না।স্থানীয়দের মতে, পুলিশের অভিযান একা যথেষ্ট নয়। সিটি কর্পোরেশনের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আবাসিক হোটেলের অনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ সম্ভব নয়। পাশাপাশি তারা সামাজিক আন্দোলনেরও আহ্বান জানিয়েছেন।সার্বিক চিত্র বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অব্যাহত চেষ্টা চালাচ্ছে, তবে প্রশাসনিক শিথিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও দ্রুত জামিনের সুযোগকে পুঁজি করে উত্তরার আবাসিক হোটেলগুলোতে অসামাজিক কার্যকলাপ দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
