By: Daily Janakantha

দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা নিয়ে তৈরি পদ্মা সেতু

উপ-সম্পাদকীয়

25 Jun 2022
25 Jun 2022

Daily Janakantha

সবধরনের আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও মানদন্ড মেনে নির্মিত হয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর জীবনকাল ধরা হয়েছে ১০০ বছর। যদিও এই সেতু একশ’ বছরের বেশি স্থায়ী হবে। পৃথিবীতে আমাজনের পর পদ্মা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী খরস্রোতা নদী। ফলে এই নদীর চরিত্র বুঝে সেতুর নির্মাণ কাজ করতে হয়েছে। এই সেতুর নদীশাসন কাজ অনেক জটিল ও কঠিন ছিল। সেতু নির্মাণে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে সব ধরনের দুর্যোগের কথা। ঘূর্ণিঝড় হলে তা কত জোরে আঘাত হানতে পারে, সেই আঘাত মোকাবেলা করার সক্ষমতা নিয়েই নির্মিত হয়েছে এই সেতু।
পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প নির্মাণে অনেকগুলো পক্ষ থাকে। একটা হচ্ছে মালিক অর্থাৎ, বাংলাদেশ সরকার, সরকারী কর্মকর্তা। দ্বিতীয় পক্ষ হচ্ছে কনসালটেন্- যারা উপদেষ্টা, ডিজাইন, কনস্ট্রাকশন ইত্যাদি কাজগুলো করে। সবার ওপরে হচ্ছে প্যানেল অব এক্সপার্ট। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট যেখানে বড় প্রজেক্ট করে সেখানে প্যানেল অব এক্সপার্ট বিশেষজ্ঞকে নিয়ে আসে, তারা টেকনিক্যাল মেরিট অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। কাজ করতে গেলে ডিজাইন বদলাতে হয়। পদ্মা সেতুর ডিজাইন সর্বশেষ বদলেছে মাস দুয়েক আগে। কারণ, কিছু কাজ করতে টেকনিক্যালগত সমস্যা হচ্ছিল। পদ্মা সেতুর শুধু সেতু অংশটা কমপ্লিট হয়েছে, নদীশাসন কমপ্লিট করতে আরও এক বছর লাগবে। এর কারণ হচ্ছে নদীটা বিশেষ নদী।
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। পদ্মা সেতুর নদীশাসন এতটা জটিল ও কঠিন যে, সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। এ ধরনের সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সাধারণত আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও মানদ- মানা হয়। সেখানেও তাই করা হয়েছে। আমাজনের পর পদ্মাই সবচেয়ে শক্তিশালী নদী। ফলে এই নদীর চরিত্র বুঝে কাজ করতে হয়েছে।
প্রথমদিকে সেতু হবে কি হবে না- তা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক বলেছে এর কোন অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নেই। প্রায় একটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এর কার্যক্রম চালাতে হয়েছিল। পরিবেশগত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পদ্মা সেতু তৈরিতে বিভিন্ন ধরনের সমীক্ষার মধ্যে যেতে হয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। যমুনা সেতুকে মাথায় নিয়ে নদীশাসনকে গুরুত্ব দিয়ে যেভাবে সেটি তৈরি করা হয়েছিল, পদ্মার ক্ষেত্রেও এটি মাথায় রেখে করতে হয়েছে নদীশাসন। নদীর মূল পানির প্রবহটা হয় মাত্র দুই থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে। যখন সেতু নির্মাণ শুরু হয় তখন মাওয়া ঘেঁষে প্রবাহিত হতো। এখন কিন্তু সেতুর এক কিলোমিটার সরে পশ্চিম দিকে দুই থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে প্রবাহিত হতো। পশ্চিম দিকে ছিলো বালুর চর। এখন এই চর ভেঙ্গে যাচ্ছে। পশ্চিমদিকে চর জানাজা নামে যে চর আছে এটা আগামীতে আর থাকবে না। গবেষকরা ১৫০-২০০ বছরের ডেটা রিসার্চ করে দেখেছে যে, দীর্ঘ ১২ কি.মি. যাওয়ার পরে আবার উল্টোদিকে রওনা করে ১২ বছরের মধ্য অসিলেট করে ৬ কি.মি. জায়গা জুড়ে। সেতু নির্মাণ ৩ কি.মি. জায়গা জুড়ে হতে পারত, কিন্তু নদী এটা মানত না। সেই কারণে ব্রিজের দৈর্ঘ্য বাড়ানো হয়েছে। পদ্মা সেতু করা হয়েছে ৬ কি.মি. এলাকা জুড়ে। পদ্মা সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৯.১৫ কি.মি.। প্রায় সব পত্রিকা ৬ কি.মি. বলে ভুল তথ্য দেয়। মূল সেতু ৬ কি.মি. নদীর ওপর এবং এ্যাপ্রোচ রোড যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে নদীতে ওঠার সেতুর অংশ- যেটা দুই পাশে ১.৫ কি.মি. করে ৩ কি.মি.। সাধারণ সেতু মধ্যভাগে উঁচু হয়। কিন্তু পদ্মা সেতু ফ্ল্যাট। কারণ হচ্ছে একবার পূর্বদিকে, আরেকবার মধ্যখানে, পশ্চিম দিকে- অর্থাৎ, মূল নেভিগেশন চ্যালেঞ্জ যে কোন জায়গায় থাকতে পারে। সে কারণে নেভিগেশন ঢিলিয়ারেন্স দিতে হয়েছে পুরো সেত ুজুড়ে। সেতুর দুই দিকে ভায়াডাক্ট থাকে। মাওয়া সাইটে ভায়াডাক্টের কারিগরি কাজ খুব কঠিন ছিল। কারণ, এখানে শক্ত লেয়ার আছে। সে জায়গায় বড় ভূমিকম্প হলে মাটিটা পানির মতো গলে যেতে পারে। এখানে সারা বছর যেন নৌ চলাচল করতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা মাথায় নিয়ে এর ডিজাইন করা হয়েছে। এ কারণে খরচও বেশি হয়েছে।
কোন কোন ফরমুলাতে া২ঢ়ড়বিৎ ৯:২৫ এই রেশিওতে কাজ করে। কাজেই এটার ফাউন্ডেশন ডিজাইন করা হলো ৩ মিটার ডায়ামিটারের সমান। স্টিলের পাইপ পিটিয়ে ঢোকানো হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী হ্যামার, যার একটা আঘাতের শক্তি ২ হাজার টন ওজনের। কিন্তু এটা দিয়ে কুলাবে না বিধায় পরবর্তীতে ৩ হাজার টনের হ্যামার দিয়ে ১০ ফুটের পাইপগুলো ঢোকানো হয়েছে। এটা ঢোকাতে গিয়ে শব্দ যাতে না হয় সে জন্য এক ধরনের মাপলার ব্যবহার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ ছিল যে, পরিবেশগত মান আর সেতু নির্মাণের মানের ওপর কম্প্রোমাইজ হবে না।
বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক সক্ষমতার দেশ। প্রতিটি অঙ্গনে অপ্রতিরোধ্য গতিতে উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করে চলেছে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী অর্থাৎ ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ৪৮ শতাংশ মানুষ ছিল হতদরিদ্র। আর বর্তমানে বাংলাদেশে দরিদ্রতার হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ; যা ২০১৫ সালেও ছিল ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২৮২৪ মার্কিন ডলার। যা নিকট ভবিষ্যতে আমাদের সুনিশ্চিতভাবেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করবে। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে শতকরা ৭ দশমিক ২৫ শতাংশে। ২০২০-২১ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৭০ টাকা, যা ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৮ টাকা, বা ২ হাজার ৫৯১ মার্কিন ডলার।
সরকারের নেয়া মেগা প্রকল্পগুলোর অন্যতম একটি পদ্মা সেতু। যেটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দুই যুগের বেশি সময়ের লালিত স্বপ্ন। ২৫ জুন জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হবে সেতুটি। এই সেতু চালুর ফলে দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসার ঘটবে। ইতোমধ্যেই এটাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে নতুন নতুন শিল্পকারখানা।
পদ্মা সেতুর সুবিধা কাজে লাগিয়ে শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। অর্থনীতিতে পদ্মা সেতুর ভূমিকা নিয়ে এর আগে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, সেতুটি বাস্তবায়িত হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যাবে। আর প্রতিবছর দারিদ্র্য নিরসন হবে শূন্য দশমিক ৮৪ ভাগ। এর মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার প্রায় ৬ কোটি মানুষের ভাগ্যে পরিবর্তন আনবে পদ্মা সেতু। ২০৩৫-৪০ সালে বাংলাদেশ যে উন্নত দেশ হবে, সেক্ষেত্রে এই সেতু নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বপ্নের এই সেতুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। সোনালি স্বপ্ন এখন কল্পনা নয়, সত্যিই দৃশ্যমান। অনেকগুলো স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। নিশ্চয়ই এ সেতু অর্থনীতির সেতুবন্ধন ও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করবে। সমগ্র জাতি সে প্রত্যাশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা সরাসরি সারা দেশের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘব হবে। ঢাকা থেকে খুলনা, মংলা, পায়রা, বরিশাল, কুয়াকাটা অর্থনৈতিক করিডর খুলে যাবে। এ সেতুকে ঘিরে বিশদ অঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠবে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক। ফলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং ত্বরান্বিত হবে দেশের শিল্পায়নের গতি।
লেখক : ট্রেজারার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

The Daily Janakantha website developed by BIKIRAN.COM

Source: জনকন্ঠ

সম্পর্কিত সংবাদ
রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন নিতে চায় দুই দল

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক এমন নতুন দলগুলোর কাছে নিবন্ধন নেওয়ার জন্য আবেদন চেয়ে গত ২৬ মে গণবিজ্ঞপ্তি জারি Read more

ওয়ালটন ডেভেলপমেন্ট কাপ নারী হকি প্রতিযোগিতা চলতি মাসে

ক্রীড়াবান্ধব প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় ও বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের আয়োজনে চলতি মাসে (আগস্ট) শুরু হতে যাচ্ছে ‘ওয়ালটন ডেভেলপমেন্ট কাপ নারী Read more

ইসরায়েল ৫০টি ‘হলোকস্ট’ চালিয়েছে বলায় মাহমুদ আব্বাসের নিন্দা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি ইউরোপে গণহারে যে ইহুদী নিধন চালিয়েছিল, সেটিকে 'হলোকস্ট' বলে বর্ণনা করা হয়। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল Read more

সিরাজগঞ্জে তাঁত শিল্পে ধস 

৫০ কাউন্টের এক বস্তা সুতা এক বছর আগেও ছিল ১৪ হাজার ৫০০ টাকা, এখন সেই সুতার বস্তা ২২ হাজার ২০০ টাকা।

প্রাক্তন স্বামীকে বিয়েতে নিমন্ত্রণ করবেন তিয়াসা

ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের জনপ্রিয় মুখ তিয়াসা লেপচা। ‘কৃষ্ণকৃলি’ ধারাবাহিকে শ্যামা চরিত্রে অভিনয় করে দারুণ পরিচিতি লাভ করেন।

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কবলে চীনের ৫০ লাখ মানুষ

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ৫০ লাখ মানুষ ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছে। তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন