By: Daily Janakantha

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদি.) এর স্বপ্ন

উপ-সম্পাদকীয়

16 Jun 2022
16 Jun 2022

Daily Janakantha

গত শুক্রবারের কলামে আমরা মহীয়সী মহিলা হযরত আয়েশার (রাদি.) জীবনের পবিত্র হজসহ নানা শিক্ষণীয় পূণ্যস্মৃতি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেছিলাম। আয়েশার জীবন ও ইতিহাস ইসলামেরই ইতিহাস ও আমল। কারণ, নবীজীর (সা.) নিকটতম লোক ও প্রিয়তম স্ত্রী ছিলেন তিনি। তার কক্ষেই আজকের মহানবীর (সা.) রওজা শরীফ অবস্থিত। একবার হযরত আয়েশা (রাদি.) স্বপ্ন দেখলেন যে, তার ঘরে একের পর এক তিনটি চাঁদ ছুটে পড়ছে। তিনি এ স্বপ্নের কথা পিতা আবু বকরকে (রা.) বলেন। এরপর যখন রাসূলে করিম (সা.) এর ইন্তেকাল হয় এবং তাকে আয়েশার ঘরে দাফন করা হলো তখন আবু বকর (রা.) মেয়েকে বললেন, তোমার স্বপ্নে দেখা সেই তিন চাঁদের একটি এই অর্থাৎ তোমার ঘরে হুজুর (সা.) এর মহান লাশের অবস্থান এবং (তিন চাঁদের) সবচেয়ে ভালটি। পরবর্তী ঘটনা প্রমাণ করেছে যে তার স্বপ্নের দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাঁদ ছিলেন আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)।
হযরত আবুবকর (রা.) মাত্র দুই বছর খিলাফত পরিচালনার সুযোগ পান। হিজরী ১৩ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার যখন অন্তিম দশা তখন মেয়ে আয়েশা পিতার শিয়রে বসা। এর আগে সুস্থ অবস্থায় তিনি মেয়েকে কিছু বিষয় সম্পত্তি ভোগ দখলের জন্য দিয়েছিলেন। এখন অন্য সন্তানদেরও বিষয় সম্পত্তির প্রয়োজনের কথা মনে করে বললেনÑ আমার কলিজার টুকরো মেয়ে! তুমি কি ওই বিষয় সম্পত্তি তোমার অন্য ভাইদের দিয়ে দেবে? মেয়ে বললেনÑ অবশ্যই দিব। তারপর তিনি মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন রাসূলের (সা.) কাফনে কয়টি কাপড় ছিল? মেয়ে বললেন, তিনখানা সাদা কাপড়। আবার জিজ্ঞেস করলেণ্ড তিনি কোন্ দিন ওফাত পান? বললেন, সোমবার। আবার জিজ্ঞেস করলেন, আজ কি বার? বললেন, সোমবার। বললেন তাহলে আজ রাতে আমাকে যেতে হবে। তারপর তিনি নিজের চাদরটি দেখালেন। তাতে জাফরানের দাগ ছিল। বলল, এ কাপড়খানি ধুয়ে তার ওপর আর দুইখানি কাপড় দিয়ে আমাকে কাফন দেবে। মেয়ে বললেন, এই কাপড় তো পুরনো। বললেন, মৃতদের চেয়ে জীবিতদেরই নতুন কাপড়ের প্রয়োজন বেশি। সেইদিন রাতেই তিনি ওফাত পান। হযরত আয়েশার হুজরার মধ্যে রাসূলের (সা.) পাশে একটু পায়ের দিকে সরিয়ে তাকে দাফন করা হয়। হযরত আয়েশার হুজরায় পতিত এটা হলো দ্বিতীয় চাঁদ। এত অল্প বয়সে স্বামী হারানো মাত্র দুই বছরের মধ্যে তিনি পিতাকে হারালেন।
খলিফা হযরত উমরের (রা.) বাসনা ছিল, আয়েশার (রাদি.) হুজরায় রাসূলুল্লাহর (সা.) কদম মুবারকের কাছে দাফন হওয়ার। কিন্তু এ কথা তিনি লজ্জায় ও নানা সংশয় সঙ্কোচে নবীপত্মীর কাছে ব্যক্ত করতে পারছিলেন না। একেবারে অন্তিম মুহূর্তে এসব চিন্তায় তিনি বড় পেরেশান ছিলেন। শেষমেশ ছেলেকে পাঠালেন এই বলে যে, ‘উম্মুল মুমিনীনকে আমার সালাম পেশ করে বলবে, ‘উমরের বাসনা হলো তার দুই বন্ধুর পাশে দাফন হওয়ার।’ আয়েশা (রাদি.) বললেন, ‘যদিও আমি ওই স্থানটি নিজের জন্য রেখেছিলাম, তবে আমি সন্তুষ্টচিত্তে তাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’
উম্মুল মুমিনীন ‘আয়েশার (রাদি.) এই অনুমতি পাওয়ার পরেও শেষ নিশ্বাস ত্যাগের পূর্বে উমর (রা.) অসিয়াত করে গেলেন, আমার লাশবাহী খাটিয়া তার দরজায় নিয়ে গিয়ে আবার অনুমতি চাইবে। যদি তিনি অনুমতি দান করেন তাহলে ভেতরে দাফন করবে। অন্যথায় দাফন করবে সাধারণ মুসলমানদের গোরস্তানে। খলিফার ইন্তেকালের পর তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা হয়। আয়েশা (রাদি.) দ্বিতীয়বার অনুমতি দান করেন এবং লাশ ভেতরে নিয়ে দাফন করা হয়। আর এভাবে তিনি হলেন হযরত আয়েশার (রাদি.) স্বপ্নের তৃতীয় চাঁদÑ যার মাধ্যমে তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে হযরত আয়েশা (রাদি.) ছিলেন দানের ক্ষেত্রে খুবই দরাজহস্ত। অন্তরটাও ছিল অতি উদার ও প্রশস্ত। বোন হযরত আসমাও (রাদি.) ছিলেন খুবই দানশীল। দুই বোনের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য দানশীলতা। আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা.) বলেন, তাদের দুইজনের চেয়ে বড় দানশীল ব্যক্তি আর কাউকে দেখিনি। তবে দুইজনের মধ্যে পার্থক্য এই ছিল যে, হযরত আয়েশা (রাদি.) অল্প অল্প করে জমা করতেন। যখন কিছু জমা হয়ে যেত, তখন সব একসঙ্গে বিলিয়ে দিতেন। আর হযরত আসমার (রাদি.) হাতে কিছু এলে জমা করে রাখতেন না, সঙ্গে সঙ্গে বিলিয়ে দিতেন। হযরত আয়েশা (রাদি.) হিজরী ৫৮ সনের ১৭ রমজান মোতাবেক ১৩ জুন ৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে ৬৬ বছর বয়সে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তখন হযরত আমিরে মুয়াবিয়ার খিলাফতকালের শেষ পর্যায়। ইতোপূর্বে কিছুকাল রোগগ্রস্ত অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। এ সময় তিনি অসিয়ত করেন আমাকে রাসূলুল্লাহর (সা.) অন্য স্ত্রীদের সঙ্গে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করবে। মৃত্যু যদি রাতে হয় তাহলে রাতেই দাফন করে দেবে। তার ওফাত হয় রাতের ভেতর নামাজের পরে। সুতরাং তখনই তাকে দাফন করা হয়। তার ইন্তেকালে ও জানাজায় আনসাররা ব্যাপকভাবে ঘর থেকে বের হয়ে আসে এবং শোকের শহরে পরিণত হয় মদিনা শহর। সত্যিই যেন তারা এক মহীয়সী মাকে হারালো। তখনকার মদিনা নগরীর গবর্নর আবু হুরায়রা (রা.) তার জানাজার নামাজ পড়ান।
হযরত আমির মুয়াবিয়া (রা.) একদিন দরবারের এক ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলেন, আচ্ছা আপনি বলুন তো, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় ‘আলিম কে? লোকটি বলল, আমিরুল মুমিনীন! আপনি। মুয়াবিয়া (রা.) বললেন, না। আমি কসম দিচ্ছি, আপনি সত্য কথাটি বলুন। তখন লোকটি বলল, যদি তাই হয়, তাহলে আয়েশা (রাদি.)।
ইসলামের বিকাশ ও নবীজীর উসওয়ায়ে হাসানা বা উত্তম চরিত্রের অনুপম সাক্ষী ও ভাষ্যকার ছিলেন হযরত আয়েশা (রাদি.)। কুরআনের তাফসির, হাদিসের বর্ণনা, ইসলামী আইন বা ফিকাহর সমাধান, সাহিত্য চর্চা সর্বক্ষেত্রে তার দৃঢ় বিচরণ ছিল। হাদিস বর্ণনাকারীদের মধ্যে এক বর্ণনায় হযরত আবু হুরায়রা (রা.), আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.), আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.), জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) ও আনাস ইবন মালিক (রা.) এরপর হযরত আয়েশার (রাদি.) স্থান। তার বর্ণিত হাদিস সংখ্যা ২২১০টি। একবার সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন উমর ফতোয়া দেন গোসলের সময় মেয়েদের চুলের খোপা খুলে চুল ভিজানো জরুরী। আয়েশা (রাদি.) এ কথা শুনে বললেন, তিনি মহিলাদের এ কথা কেন বলে দেন না যে, তারা যেন তাদের খোঁপা কেটে ফেলে। আমি রাসুলুল্লাহর সামনে গোসল করতাম এবং চুল খুলতাম না। (সহীহ মুসলিম ও সুনানে নাসাঈ)। পোশাকের বিষয়ে শরিয়তের বিধিবিধানের প্রতি অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। একবার ভাতিজি হাফসা বিনতে আবদির রহমান মাথায় একটি পাতলা ওড়না দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তিনি সেটা নিয়ে ছিড়ে ফেলেন এবং বলেন, তুমি জান না আল্লাহ তায়ালা সূরা নূরে কি বলেছেন। তারপর একটা পুরু ওড়না এনে তাকে দেন। (তাবাকাত ৮/৪৮)। আরেকবার তিনি এক বাড়িতে মেহমান হিসেবে অবস্থান করেন। গৃহকর্তার বাড়ন্ত বয়সের দুটি মেয়ে ছিল। তিনি দেখলেন চাদর ছাড়াই তারা নামাজ পড়ছে। তখন বললেন, ভবিষ্যতে আর কোন মেয়ে যেন চাদর ছাড়া নামাজ না পড়ে। (মুসনাদ ৬/৭৯৬)।
হযরত আয়েশা (রাদি.) আমাদের পারিবারিক জীবন, সাংসারিক ও দাম্পত্য জীবন ইসলামের নিত্য অনুশাসন জানা ও মানার উত্তম আদর্শ। আমরা তার জীবনাদর্শের চর্চা করলে ঘরে ঘরে মা আয়েশার প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি হতো।

লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব
mi_rafiq@yahoo.com

The Daily Janakantha website developed by BIKIRAN.COM

Source: জনকন্ঠ

সম্পর্কিত সংবাদ
স্বগর্বে ফিরলেন সেই আবুল হোসেন

স্বগর্বে ফিরলেন সেই আবুল হোসেন জাতীয় 25 Jun 2022 25 Jun 2022 Daily Janakantha অনলাইন ডেস্ক ॥ পদ্মা সেতুর উদ্বোধন Read more

নকশীকাঁথার গানে পদ্মা সেতু

নকশীকাঁথার গানে পদ্মা সেতু সংস্কৃতি অঙ্গন 25 Jun 2022 25 Jun 2022 Daily Janakantha সংস্কৃতি প্রতিবেদক ॥ স্বপ্নের পদ্মা সেতু Read more

নানা আয়োজনে নজরুল জয়ন্তী উদ্যাপন

নানা আয়োজনে নজরুল জয়ন্তী উদ্যাপন সংস্কৃতি অঙ্গন 25 Jun 2022 25 Jun 2022 Daily Janakantha নিজস্ব সংবাদদাতা, শাহজাদপুর ॥ নানা Read more

আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের করিডর

আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের করিডর উপ-সম্পাদকীয় 25 Jun 2022 25 Jun 2022 Daily Janakantha ২৫ জুন ২০২২ উদ্বোধনের পর চালু হবে বাঙালীর Read more

ঈদের নাটকে শামীমা নাজনীন

ঈদের নাটকে শামীমা নাজনীন সংস্কৃতি অঙ্গন 25 Jun 2022 25 Jun 2022 Daily Janakantha সংস্কৃতি প্রতিবেদক ॥ হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ Read more

আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘ছিটমহল’

আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘ছিটমহল’ সংস্কৃতি অঙ্গন 25 Jun 2022 25 Jun 2022 Daily Janakantha সংস্কৃতি ডেস্ক ॥ উপমহাদেশের ৬৮ বছরের Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন