By: Daily Janakantha

প্রকৃতিকে সহজাত বৈশিষ্ট্যে টিকিয়ে রাখা জরুরী

চতুরঙ্গ

13 Jun 2022
13 Jun 2022

Daily Janakantha

বিশ্বময় আলোড়ন সৃষ্টি করে যাচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। প্রাক শিল্প যুগে নিসর্গ তার অবারিত বৈভবে আমাদের যে মাত্রায় নিরাপত্তা এবং স্বস্তি দিয়েছে সভ্যতা সূর্যের মধ্য গগনে তা বিলুপ্তপ্রায়। নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে পৃথিবী এগিয়েছে বহুদূর কিন্তু চরম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় প্রকৃতি হারাচ্ছে তার সহজাত স্নিগ্ধতা এবং নির্মল বিশুদ্ধতা। মানুষও পড়ছে অনাকাক্সিক্ষত সঙ্কট এবং বৈরী প্রতিকূল অবস্থায়। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব মানব সভ্যতার যে দ্বার উন্মোচন করে তা ইতিবাচক ছিল বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বিজ্ঞানের নব অভিযানের পাশর্^ প্রতিক্রিয়ায় ধরিত্রী চলে যায় এক অসহনীয় দুর্ভোগের কোপানলে। বিশ্বময় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবল দাপটে যেন আজ সভ্যতা সূর্য আড়াল হওয়ার উপক্রম। সঙ্গত কারণে ধরিত্রীকে বাঁচাতে সবার উদাত্ত আহ্বান- বাসযোগ্য করে বিশ্বকে নিরাপত্তার বেষ্টনী দিতে হবে। সেটা কেমন করে? সমূহ ক্ষতি যা হওয়ার ইতোমধ্যে তা প্রকট আকারে দৃশ্যমান হচ্ছে। অগ্নিস্ফুরণে বনাঞ্চল উজাড়, শ্যামল স্নিগ্ধ প্রকৃতিকে উত্তরোত্তর কশাঘাত করার দাম গুনতে হচ্ছে নিরীহ মানুষকে। পাহাড় ধস, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় এমন সব প্রাকৃতিক আঘাত সহ্য করে তাদের জীবন নির্বাহ করতে হচ্ছে। সেখান থেকে মুক্ত নিসর্গে ফেরার পথ বর্তমানে কতখানি উন্মুক্ত তাও ভেবে দেখার বিষয়।
প্রযুক্তি আমাদের আধুনিক জীবন উপহার দিলেও তার অপব্যবহার যেন বিপন্ন পরিস্থিতির আবর্তে ঠেলে দিচ্ছে। শুধু শিল্পোন্নত দেশগুলোই নয়, সারা পৃথিবীই আজ বিষময় প্রতিবেশের সম্মুখীন। সেখান থেকে বের হয়ে আসতে প্রতিবছরই পালন করা হয় বিশ^ পরিবেশ দিবস। এবারের মূল বার্তা ছিল ‘একটাই পৃথিবী’ তাকে অনিবার্যভাবে সুরক্ষা দেয়া প্রত্যেকের অন্যতম দায়বদ্ধতা। ইতিহাসের সাক্ষী অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লব। তখন অবধি প্রকৃতি অনেকটাই স্বচ্ছ এবং স্বাভাবিক গতিতে বহমান ছিল। ১৭৬০ সালে জেমস ওয়াটের ষ্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারে পৃথিবীতে নতুন এক জগৎ দৃশ্যমান হয়। গ্রীন হাউস এফেক্টের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের সহজাত প্রাকৃতিক আবহকে দুঃসহ বলয়ের দিকে ধাবিত করে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে শুরু হওয়া উষ্ণতার মাত্রা বাড়ছে বৈ কমার কোন লক্ষণ এখনও অপসৃত। প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রকোপে যে মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ হয় সেখান থেকে বায়ুম-ল তার শুদ্ধতা এবং স্বাভাবিকতাকে ক্রমান্বয়ে নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর করতে থাকে। ষড়ঋতুর হরেক রকম বৈশিষ্ট্যে প্রকৃতির যে অবারিত সম্ভার সেটাও যেন ক্রমশ তার সহজাত রূপকে হারিয়ে ফেলে। এ শুধু পরিবর্তন নয় একেবারে মহাবিপর্যয়। তারই প্রেক্ষিতে ১৯৯২ সালে জলবায়ুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য হারানোকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ কর্তৃক ‘রিও ডি জেনিরো’ সম্মেলন আহ্বান করাও ছিল তৎকালীন অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ, সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রকৃতির ক্রমাগত ভারসাম্যহীনতার করুণ প্রতিবেশে বিশ^ময় যে মহাসঙ্কট মাথা চাড়া দেয় সেখানে নিসর্গ বিশেষজ্ঞরাও আর চুপ করে থাকেননি। ১৯৯৪ সালেই পরিবেশ আন্দোলনকারীরা ‘কপ’ সংগঠনে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার জোর প্রত্যয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়। ‘কপ সম্মেলনে’র শুভযাত্রার মধ্য দিয়ে বিশ^ময় প্রথম ‘ধরিত্রী বাঁচাও’ স্লোগানে জোর আওয়াজ তোলা হয়। দীর্ঘ ২৮ বছর এই ‘কপ’ সংগঠন পৃথিবীকে উষ্ণতার প্রকোপ থেকে সুরক্ষা দিতে নিত্যনতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করে আসছে সচেতন দায়বদ্ধতায়। জলবায়ু পরিবর্তনই শুধু নয়, বায়ুম-লে কার্বন নিঃসরণের নেতিবাচক প্রক্রিয়ায় দূষিত প্রকৃতিকে শুদ্ধতার আবহে নিতে হরেক রকম গবেষণা কার্যক্রমও পাশাপাশি চলতে থাকে। এই পর্যন্ত হওয়া প্রতিটি সম্মেলনেই বায়ুম-লে কার্বন নির্গমন কমানোর ওপর সমধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপটে জরুরী কোন সুশৃঙ্খল পদক্ষেপের ঘাটতিতে আশানুরূপ ফল এই কপ সংগঠনটিও দেখাতে ব্যর্থ হয়। সঙ্গত কারণে নেতিবাচক প্রতিবেশে ক্রমাগত উষ্ণতার দিকে ধাবিত হওয়া এক অবশ্যম্ভাবী বিপদ সঙ্কেত। শান্ত, স্নিগ্ধ প্রকৃতি উত্তাপের অসহনীয় মাত্রায় দিনে দিনে পৃথিবীকে এক অসহনীয়, অসম লড়াইয়ে দাঁড় করায়। আর বিশ^ পরিবেশ দিবস শুধু অনুষ্ঠান, সভা, মিছিল প্রভৃতির আনুষ্ঠানিকতায় আবর্তিত থাকে। এরই অদম্য প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বময় উন্মত্ত দাবানল, বনাঞ্চলে অগ্নিসংযোগে সংশ্লিষ্ট এলাকা উজাড় হয়ে যাওয়াকে কোনভাবেই ঠেকানো সম্ভব হয়নি। হরেকরকম প্রাকৃতিক বিপর্যয় পৃথিবীময় দাপট তৈরি করলেও তার থেকে যথাযথ মুক্তির পথ এখনও সেভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে না। আর অতিবৃষ্টিতে পাহাড় ধসে ঢল নামাও নিত্যনৈমিত্তিক দুর্ঘটনা। প্রকৃতিকে তার অবস্থান থেকে প্রযুক্তির অসহনীয় কোপানলে সরিয়ে দেয়া- সে তো কোলের সন্তানের ওপর চরম প্রতিশোধ নেয়া। রুক্ষ্ম, রুদ্র প্রকৃতি রুষ্ট হলে তার দাম দিতে হয় তার সন্তানদেরই। যদিও আমরা এখন প্রকৃতির প্রবল প্রকোপে বসবাস করতে করতে যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো শিল্পোন্নত দেশগুলো এই জলবায়ু বিপন্নতায় নিজেদের মধ্যে সহমতে পৌঁছাতে পারছে না। বায়ু দূষণের অস্তিত্ব সঙ্কট মোকাবেলায় যা একান্ত জরুরী ছিল। মানুষের সৃষ্ট উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্র আবিষ্কার ও ব্যবহারে নৈসর্গের যে বিরূপ প্রতিপত্তি তাকে জোরালোভাবে ঠেকানোও পরিস্থিতির অনিবার্য দাবি। শুধু তাই নয়, এমন শোচনীয় প্রতিবেশ থেকে মুক্তির যথার্থ নির্দেশনাও সময়ের চাহিদা।
অনেক মূল্যবান সময় পার হয়ে গেছে অনাদরে, অবহেলায়। আর পেছনের দিকে তাকানোরই সুযোগ নেই। সঙ্কট মোকাবেলায় যা যা করণীয় সবটাই করতে সব রাষ্ট্রকেই এক কাতারে দাঁড়াতেই হবে। প্রতি বছর শুধু ‘বিশ্ব পরিবেশ’ দিবস পালনের মধ্যে তার তাৎপর্য রেখে দিলে সমস্যা থেকে বেরোনোর পথ রুদ্ধতার জালেই আটকে যাবে। মানুষ, দেশ আর পৃথিবীর স্বার্থে সবাইকে একই পতাকার নিচে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প অন্য কোন পথ খোলাই নেই। যান্ত্রিক কলাকৌশলের নেতিবাচক প্রক্রিয়ায় গ্রীন হাউস গ্যাস যে মাত্রায় প্রকৃতিকে বিপন্ন করছে সেখান থেকে তার মাত্রা যত নিম্নগামী কিংবা শূন্যের দিকে যাবে ততই ধরিত্রী সমূহ বিপর্যয় থেকে সরে আসবে। শিল্প বিকাশের পূর্ববর্তী আবহের চেয়ে মাত্র দেড় ডিগ্রী উষ্ণতা বাড়ানোই ছিল বাঞ্ছনীয়। সেখানে ২ ডিগ্রীতে পৌঁছালে অবস্থা যে কত ভয়ঙ্কর হবে ভাবাই যাচ্ছে না। আগামীর পৃথিবী যদি বায়ু দূষণের মাত্রাকে তার সীমা অতিক্রম করতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তবেই বিশ্ব তার সুরক্ষাকে নিশ্চিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। এ সব কারণে কয়লা, গ্যাস ও তেলের মাধ্যমে বিদ্যুত উৎপাদন কমানোই শুধু নয়, বন্ধ করাও একান্ত আবশ্যক। ডিজেল কিংবা পেট্রোল দিয়ে গাড়ি চালানোও থামাতে হবে। এর জন্য বিকল্প জ্বালানি উদ্ভাবনও সহায়তা নিতান্ত জরুরী।
ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যিক রূপও আগের মতো নেই। জীব বৈচিত্র্যের যথেষ্ট ভারসাম্যতায় নৈসর্গ তার নিজস্ব গতিতে আবর্তিত হয়। এর ব্যত্যয় প্রকৃতিকে দূষণের মাত্রায় ধবিত করতে যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। তবে বায়ুম-লে কার্বন গ্যাস নির্গমন তেমন সম্ভাবনাকে বারবার বিঘিœত করছে। তাই আগের মতো বর্ষণের জন্য বর্ষাকাল পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয় না। শরৎ কিংবা হেমন্তের আগমন বার্তা তার কোলের সন্তানদের সেভাবে আলোড়িতও করে না। আগাম বর্ষণ যেন এখন প্রকৃতিরই অমোঘ বিধান। এখন তো তেমন প্রাকৃতিক আবহই আমাদেরকে ঘিরে রেখেছে। কৃষিনির্ভর জমির ফসল উৎপাদনেও বিপত্তি তৈরি হয় প্রকৃতির বৈরিতায়। সময়মতো রোদ বৃষ্টির অভাবে কৃষকের গোলায় ধানের প্রাচুর্য আর আগের মতো নেই। প্রকৃতি সৃষ্টি বিপন্নতায় মানুষই জোরালোভাবে সুরক্ষা দেবে তার বাসযোগ্য বিশ্বকে।

লেখক : সাংবাদিক

The Daily Janakantha website developed by BIKIRAN.COM

Source: জনকন্ঠ

সম্পর্কিত সংবাদ
‘১৭ কর্নার থেকে গোল না পাওয়া দুঃখজনক’

‘১৭ কর্নার থেকে গোল না পাওয়া দুঃখজনক’ খেলার খবর 28 Jun 2022 28 Jun 2022 Daily Janakantha স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ Read more

মোহামেডানের কাছে হার শেখ জামালের

মোহামেডানের কাছে হার শেখ জামালের খেলার খবর 28 Jun 2022 28 Jun 2022 Daily Janakantha স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার Read more

রোনাল্ডো-নেইমারের ঠিকানা বদলের গুঞ্জন

রোনাল্ডো-নেইমারের ঠিকানা বদলের গুঞ্জন খেলার খবর 28 Jun 2022 28 Jun 2022 Daily Janakantha স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ আবারও দলবদলের বাজার Read more

পদ্মা সেতুর নাটবোল্ট খোলা অন্তর্ঘাত ॥ সিআইডি

পদ্মা সেতুর নাটবোল্ট খোলা অন্তর্ঘাত ॥ সিআইডি প্রথম পাতা 27 Jun 2022 27 Jun 2022 Daily Janakantha স্টাফ রিপোর্টার ॥ Read more

হোল্ডিংকে ছাড়িয়ে কেমার রোচ

হোল্ডিংকে ছাড়িয়ে কেমার রোচ খেলার খবর 28 Jun 2022 28 Jun 2022 Daily Janakantha স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ তার প্রিয় Read more

’৫৭ সালের মধ্যেই পদ্মা সেতুর অর্থ উঠে আসবে

’৫৭ সালের মধ্যেই পদ্মা সেতুর অর্থ উঠে আসবে প্রথম পাতা 27 Jun 2022 27 Jun 2022 Daily Janakantha সংসদ রিপোর্টার Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন