By: Daily Janakantha

সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য ॥ অরক্ষিত হাতিরঝিল লেক

প্রথম পাতা

11 Jun 2022
11 Jun 2022

Daily Janakantha

নিয়াজ আহমেদ লাবু ॥ রাজধানীর হাতিরঝিল লেক এখন অরক্ষিত। বুধবার সকালে হাতিরঝিল লেক থেকে বেসরকারী টেলিভিশন স্টেশন ডিবিসি নিউজের মোঃ আব্দুল বারি (২৮) নামে সংবাদ কর্মীর গলা কাটা ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধারের পর ফের এই লেকটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে। এর আগে এখানে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৮ জানুয়ারি মধ্যরাতে হাতিরঝিলে সড়ক দুর্ঘটনায় দৈনিক সময়ের আলোর সিনিয়র রিপোর্টার হাবীবুর রহমান নিহত হন। কীভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশায় পুলিশ। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ছাড়া আর কোন তথ্য প্রমাণ এখনও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ বলছে, দুর্ঘটনাস্থলের পাশে কোন সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না। দূরে একটি ক্যামেরা ছিল সেটির ফুটেজ কুয়াশার কারণে ঝাপসা দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হাতিরঝিলের অধিকাংশ সিসিটিভি ক্যামরা নষ্ট। রাতের গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে হাতিরঝিল চলে যায় ভবঘুরে, ছিনতাইকারী, মাদকসেবীসহ নানা অপরাধীর দখলে। চলে অনৈতিক কাজও। লেকটি হয়ে ওঠে ভুতুড়ে নগরী। দিনভর সেখানে থাকে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের আনাগোনা। আর ছিঁচকে মস্তান ও বখাটেদের উৎপাত অতিষ্ঠ ভ্রমণপিপাসুরা। এ ছাড়া কখনও কখনও এক শ্রেণীর কিশোর উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল চালিয়ে পরিবেশ নষ্ট করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ তরুণীদের টিজ করে। হিজড়াদের জ্বালায় অতিষ্ঠ আগত দশনার্থীরা। ৩০২ একর জমির হাতিরঝিল লেকটি ঘিরে ৫টি থানা থাকার পরও এখানে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। রাতে থাকে না পুলিশের কোন টহল। লেকঘিরে নেই কোন নিরাপত্তা কেন্দ্র।
অপরাধ বিশ্লেষকরা জানান, হাতিরঝিল লেক সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। তা পর্যবেক্ষণের জন্য নিরাপত্তা কেন্দ্র থাকা উচিত। তা না হলে রাজধানীর অন্যতম নান্দনিক স্থান হাতিরঝিলের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে। সেখানে অপরাধীদের আনা গোনা, ছিনতাইয়ের ঘটনা এবং খুনের ঘটনায় আতঙ্কে সেখানে দর্শনার্থী কমে গেছে। এক সময় হাতিরঝিল ছিল রাজধানীর সবচেয়ে বেশি নিরাপদ কেন্দ্র। এখন রীতিমতো আতঙ্কের নগরী হিসেবে পরিণত হয়েছে। তবে মাঝে মধ্যে পুলিশ সেখান থেকে অপরাধীদের গ্রেফতার করে থাকে। তারপর থামছে না সেখানে অপরাধ কার্যক্রম।
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল রশিদ জনকণ্ঠকে জানান, হাতিরঝিলে বখাটে আর থাকবে না। রাতে টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি জানান, আমাদের টহল টিম নিজ থানা এলাকায় টহল দিয়ে থাকে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার নাজমুল হাসান ফিরোজ জানান, ডিবিসি নিউজের সংবাদকর্মী মোঃ আব্দুল বারি হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। হাতিরঝিল নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান জানান, বারি হত্যাকা-ের এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। হাতিরঝিলে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত টহল দেয়া হচ্ছে।
এ ব্যাপারে হাতিরঝিল তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, হাতিরঝিল এলাকায় যান চলাচলে কোন সমস্যা যাতে না হয় সেই বিষয়টিই ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা দেখভাল করে থাকে। তবে সামনে কোন অপরাধকর্ম হলে তা ছাড় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। ২/৩ মাস আগে এখানে কিছু অপরাধকর্মের অভিযোগ পেলেও তা এখন কমে গেছে।
আতঙ্কের নাম হাতিরঝিল ॥ বুধবার সকালে রাজধানীর হাতিরঝিলে বেসরকারী টেলিভিশন স্টেশন ডিবিসি নিউজের মোঃ আব্দুল বারিকে (২৮) গলা কেটে ও এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। সকাল ৭টার দিকে পুলিশ কনকর্ড প্লাজার উল্টো দিকে লেকের ধারের সড়কে তার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত দু’দিনও এ হত্যাকা-ের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।
সংবাদকর্মী বারি হত্যার একদিন পর শুক্রবার সকাল রাজধানীর হাতিরঝিল থানার মালিবাগ বাগানবাড়ি এলাকায় নিজ ফ্ল্যাট থেকে আশিক এলাহী (৭৯) নামে সাবেক এক খাদ্য কর্মকর্তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
গত বছরের ৬ জানুয়ারি মগবাজার ফ্লাইওভারের পাশে হাতিরঝিল লেক এলাকায় রাজধানীর এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমানের লাশ পাওয়া যায়। এই হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। যা অনেকটা সিনেমার গল্পের মতো। সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা মিজানুর রহমানকে খুন করে। সিএনজিচালিত অটোরিক্সায় তুলে মিজানকে খুন করা হয়। খুনীরা তার লাশ ফেলে রেখে যায় হাতিরঝিলের উড়াল সড়কের ওপর। মিজানুর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত তিন আসামি নুরুল ইসলাম, আবদুল্লাহ বাবু ও মোঃ জালাল ঢাকার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। এ ঘটনায় মিজানুরের ছোট ভাই আরিফ হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তৎকালীন হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আবদুর রশীদ জানান, এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিজানুরকে যারা খুন করেছে, তারা ভয়ংকর সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। তিন আসামি আদালতের কাছে স্বীকার করেছেন, মিজানুর রহমানকে খুন করার আগে তাঁরা আরও তিনটি খুনের ঘটনা ঘটিয়েছেন।
এর আগে গত বছর ১২ অক্টোবর সকাল ৭টায় হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রান্তে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার হাত পা রশি দিয়ে বাধা ছিল। বেডশিট-মশারি ও পলিথিনে মোড়ানো ছিল পুরো শরীর। মুখমণ্ডল, হাত, আঙ্গুল ও শরীরের বিভিন্ন স্থান ছিল বিকৃত। যে কারণে ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহের মাধ্যমেও তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। মৃতদেহ ভেসে থাকার জায়গা থেকে প্রায় ৫০ মিটার উত্তরে লেকের পানি ঘেঁষে পড়ে থাকা ছেঁড়া কাগজে লেখা ছিল একটি মোবাইল নম্বর। এর সূত্র ধরে মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করে। তার নাম আজিজুল ইসলাম মেহেদী (২৪)। তিনি আন্তর্জাতিক ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত আহসান, তামিম, আলাউদ্দিন ও রহিমকে গ্রেফতার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। পরে তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। আমেরিকা প্রবাসী বাবার একমাত্র ছেলে আজিজুল। আজিজুল ইসলাম মেহেদীর জন্ম চট্টগ্রাম জেলার সন্দীপের বাউরিয়া গ্রামে হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে মাকে নিয়ে চট্টগ্রামের ফিরোজ শাহ এলাকায় থাকতেন তিনি। লেখাপড়া শেষ করে কানাডায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। লেখাপাড়ার পাশাপাশি পরিচিতজনদের পাসপোর্ট ও ভিসা প্রসেসিংয়ে সহায়তা করতেন মেহেদী। এর আগে সিরাজুল ইসলাম (২০) নামের এক যুবকের রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচ্ছন্নতা কর্মী ছিলেন। পুলিশ বলেছে, মরদেহের ক্ষতচিহ্ন দেখে ধারণা করা হচ্ছে তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর কাওরান বাজারে হোটেল সোনারগাঁওয়ের সামনে দিয়ে একটু এগোতেই হাতিরঝিল উড়াল সড়কে ভুতুড়ে অন্ধকার। সড়ক ও ফ্লাইওভারের ওপরে লাইটপোস্ট থাকলেও কিছু স্থানে বাতি জ্বলে না। যেন ভুতুড়ে অবস্থা। ভুতুড়ে-অন্ধকার এমন অবস্থার কারণে এলাকায় টানাপার্টি ও ছিনতাইকারীসহ পেশাদার অপরাধীদের তৎপরতাও বেড়ে যায় বেড়ে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। এ কারণে রাতে এসব অন্ধাকারাচ্ছন্ন রাস্তায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে সাধারণ মানুষ। এসব সড়ক ও নিরাপত্তার জন্য তেমন একটা পুলিশী টহলও লক্ষ্য করা যায় না। এমনকি মোড়ে বা বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন কিংবা অন্য কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থাও থাকে না। হাতিরঝিল লেকে অধিকাংশ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট। এ কারণে দৈনিক সময়ের আলোর সিনিয়র রিপোর্টার হাবীবুর রহমান মৃত্যুর বিষয়টি এখনও অন্ধকারে রয়েছে। কারণ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট ছিল। হাবীবুরের অপমৃত্যুর মামলার তদন্তে ঘটনাস্থলে গিয়ে কোন সিসিটিভি ক্যামেরা পায়নি পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে কিছু দূরে একটি ক্যামেরা পাওয়া গেছে। তবে সেটির ফুটেজ ঝাপসা। কর্তৃপক্ষ বলছে, কুয়াশার কারণে সেই ক্যামেরার ফুটেজ ঝাপসা এসেছে। একটা সিসিটিভি পেলেও সেটার ফুটেজে স্পষ্ট কিছু পাইনি।
কয়েক দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে হাতিরঝিল চলে যায় ভবঘুরে, ছিনতাইকারী, মাদকসেবীসহ নানা অপরাধীর দখলে। চলে অনৈতিক কাজও। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে পুলিশের চেকপোস্ট থাকলেও তা কোন কাজে আসছে না। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দায় নিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট এলাকার ট্রাফিক কর্মকর্তারা। উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কথা শোনা যায়। তারা বলছেন এ এলাকায় ট্রাফিকের কাজ মূলত ট্রাফিক সংশ্লিষ্ট বিষয় দেখভাল করা। অপরাধ সংক্রান্ত বিষয় দেখার জন্য থানা পুলিশ রয়েছে।
তারা জানান, প্রায় সর্বত্রই ভবঘুরে আর বখাটে মাদকসেবীদের দখলদারিত্ব। রাত যত বাড়তে থাকে ততই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে পরিবেশ। বাড়তে থাকে ছিনতাইকারী, মাদকসেবী আর ভাসমান দেহজীবীদের সংখ্যা। মাসুদ নামে এক শিক্ষার্থী জানান, কয়েকদিন আগে হাতিরঝিলে ঘুরতে এসে বখাটেদের খপ্পরে পড়ে নিজের মোবাইল ও টাকা খুইয়েছেন। গ্রাম থেকে ঢাকায় পরীক্ষা দিতে আসা বোন ও তার এক বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে আসেন হাতিরঝিলে। সেখানে রাত সাড়ে ৯টার দিকে ৮/১০ জন বখাটেদের খপ্পরে পড়েন তারা। এরপর সম্মান আর হেনস্তা হওয়ার ভয়ে তিনি একটি দামী মোবাইল ও মানিব্যাগে থাকা ২ হাজার টাকা দিয়ে রেহাই পান। এ রকম আরও অনেকের অভিযোগ পাওয়া গেলেও দেখার যেন কেউ নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রামপুরা পয়েন্টের অদূরে এবং এফডিসি মোড়সংলগ্ন তেজগাঁও পয়েন্টে দুটি ব্যারিকেড। এখানে চেকপোস্ট থাকলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোন পুলিশ সদস্যের টিকিটিও মেলেনি। এফডিসি মোড় হয়ে হাতিরঝিলের শুরুতেই অন্ধকার। রামপুরা পয়েন্টেও আলো কম থাকার সুযোগে বেড়েছে ছিনতাইয়ের ঘটনাও। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির অভাবে রাতে হাতিরঝিল অনিরাপদ হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন দর্শনার্থীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হাতিরঝিলের সঙ্গে লাগোয়া ৩৫টির বেশি গলি পথ। বাসাবাড়ির গেট ভেদ করে সেখানে পৌঁছে না আলো। রাত ১০টার পর গুলশান পয়েন্ট দিয়ে ঢুকে পড়ে নানা বয়সী মানুষ। নিকেতন ঘেঁষা নাইট ক্লাবের ডিজে পার্টির সদস্যরাও আসে হরহামেশা। তাদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণে ও খোলামেলা পোশাকে রীতিমতো ব্রিবত হচ্ছেন সাধারণ দর্শনার্থীরা।
গুলশানের এক বাসিন্দা জানান, সাংবাদিক বারিকে যেখানে খুন করা হয়েছে সেখানে বিকেলে এবং সন্ধ্যায় লোকজন হাঁটাহাঁটি করে। অনেক বয়স্ক লোক ওই পাড় দিয়ে শরীর চর্চা করেন। কিন্তু রাতে তেমন কোন লোকজনের আনাগোনা থাকে না। রাতে সেখানে বখাটে ও ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে। পুলিশের ধারণা, খুনী স্থান বুঝেই সেখানে বারিকে হত্যা করেছে। যেখান থেকে বারির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ওই স্থানের পাশে কিছু কচুরিপানা রয়েছে। সেখানে বারি কী একা গেছেন? নাকি তাকে জোর করে বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, বাড্ডা, গুলশান, রামপুরা, রমনা ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার সীমানায় এই হাতিরঝিল এলাকা। হাতিরঝিলের মাঝ বরাবর দুই পয়েন্টে পুলিশের অবস্থান দেখা গেলেও প্রায় এলাকাই অরক্ষিত। এই সুযোগে রাতে স্বল্প আলোর স্থানগুলোতে আপত্তিকর কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে কাউকে কাউকে। হাতিরঝিল তেজগাঁওয়ের কুনিপাড়া ও বেগুনবাড়ী অংশের বস্তিঘরগুলোর সঙ্গেই লাগোয়া রয়েছে ঝিলের রাস্তায়-ফুটপাথ। সম্প্রতি সেখানে বহিরাগত কোন দর্শনার্থী গেলেই নানাভাবে হেনস্তা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কাওরান বাজারের দিক থেকে প্রবেশপথের ডান দিকে আলোর ব্যবস্থা নেই। এ রকম আরও কয়েকটি স্থানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। মগবাজার ও তেজগাঁও এলাকার আশপাশে রয়েছে কিছু বস্তি এলাকার সংযোগ। এসব এলাকাকে ঘিরে চলে চুরি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০১৩ সালে উদ্বোধন করা হয় রাজধানীর অন্যতম দৃষ্টিনন্দন বিনোদন কেন্দ্র হাতিরঝিল প্রকল্প। এরপর থেকে এর ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন (এসডব্লিউও)।
সূত্র জানিয়েছে, ২০২১ সালে ৩০ জুন রাজউকের কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তর করে সেনাবাহিনী। এরপর কেটেছে প্রায় এক বছর। কিন্তু অবহেলায় প্রকল্প এলাকায় দেখা দিয়েছে নানা দুর্গতি। অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
প্রকল্পের মধুবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় আশপাশের মানুষ এসে ময়লা ফেলছে হাতিরঝিলে। মধুবাগের বেগুনবাড়ী এলাকার ওয়াকওয়ের ওপর নির্মিত ড্রেনগুলোর গ্রিল খুলে নেয়া হয়েছে। বেখেয়ালে চললে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন পথচারীরা। সেখানে লেকে লাশ পাওয়া যাচ্ছে। ছিনতাই বেড়েছে। বখাটদের উৎপাতে অতিষ্ঠ দর্শনার্থী ও স্থানীয়বাসিন্দারা।
রাজউক জানিয়েছে, চলতি বছর জানুয়ারিতে প্রকল্প হস্তান্তরের আগে রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে জটিলতার কথা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছিল। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিপিপিতে কোন বরাদ্দ বা নির্দেশনা ছিল না। এ জন্য বছরে প্রায় ১৮ কোটি টাকা দরকার। প্রকল্প এলাকায় দোকানপাট বরাদ্দসহ অন্যান্য খাত থেকে ১০ কোটি টাকা আসে। ঘাটতি মেটাতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজউককেই এই খরচ দিতে হবে।
প্রকল্পটি নিয়ে গত ২০২০ সালের ২ জুন রাজউক চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে বেগুনবাড়ী খালসহ হাতিরঝিল এলাকার সমন্বিত উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম প্রস্তাবনা পর্যালোচনায় গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভা হয়। সভায় কিছু সুপারিশ করা হয়। বলা হয়, হাতিরঝিল ও বেগুনবাড়ী খাল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে একটি স্টর্ম ওয়াটার বেসিন করা হয়েছে। জলাধার ও সবুজের সমারোহে প্রকল্পটি পর্যটকদের কাছে বিনোদন কেন্দ্র রয়েছে। তাই এর রক্ষণাবেক্ষণে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচী নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পরিচালনার জন্য একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়। বাৎসরিক পরিচালন স্কিমও প্রস্তাব করা হয়। সম্ভাব্য আয় ধরা হয় ১০ কোটি টাকা। পরিচালনা ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৮ কোটি টাকা। চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৮ কোটি টাকার। যা সরকারী কর্মসূচী ব্যয় হিসেবে সংগ্রহ করতে স্কিম তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তখন মন্ত্রণালয় রাজউককেই এই অর্থের সংস্থান করতে বলে।
রাজউক জানিয়েছে, ঢাকার একটি বৃহৎ এলাকার ‘ক্যাচমেন্ট বেসিন’ হিসেবে হাতিরঝিলের লেকটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হলে ঢাকার একটি বড় অংশে জলাবদ্ধতা হবে।
হাতিরঝিলের আওতায় নির্মিত ৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার এক্সপ্রেস রোড, ৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার সার্ভিস রোড, ৪টি সেতু, ৪টি ওভারপাস, ৩টি ভায়াডাক্ট ও ২টি ইউলুপ রয়েছে। এগুলোরও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। দরকার জনবল, যন্ত্রপাতি ও কার্যক্রম। কিন্তু এসএসডিএসগুলো ভরাট হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিয়মিত পানি প্রবাহও ব্যাহত হচ্ছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তার জন্য তিন শিফটে ১৭১ জন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা ও গাছের নিরাপত্তায় ৫৬ জন কর্মী রয়েছে। সব মিলিয়ে আছে ২২৭ জন। এদের পেছনেও মাসে ব্যয় প্রায় সাড়ে ২৮ লাখ টাকা।
উল্লেখ্য, হাতিরঝিলসহ তেজগাঁও এলাকায় ভাওয়ালের রাজার এস্টেটের অনেক ভূসম্পত্তি ছিল। এস্টেটের হাতির পাল এখানকার ঝিলে স্নান করতে বা পানি খেতে বিচরণ করত বলে কালক্রমে এর নাম হাতিরঝিল হয়। হাতিরঝিল প্রকল্প চালুর কারণে ঢাকার মগবাজার, তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী , ফার্মগেট, কাওরান বাজার ও বেগুনবাড়ীর বাসিন্দাসহ এ পথ দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীরা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন।
হাতিরঝিল প্রকল্পটি এক হাজার ৯৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রকল্পটি ২০০৭ সালের অক্টোবরে একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়। ৩ বছর মেয়াদের এ প্রকল্পটি প্রথমে ২০১০ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর কাজ শুরু হয় ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। পরবর্তীতে প্রকল্পটি সংশোধন করে আরও দেড় বছর সময় ও বরাদ্দ বাড়ানো হয়। প্রকল্প ব্যয় ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৩০ লাখ টাকার মধ্যে বাস্তবায়নকারী সংস্থা রাজউকের ১ হাজার ১১৩ কোটি ৭ লাখ টাকা, এলজিইডির ২৭৬ কোটি এবং ঢাকা ওয়াসার ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা রয়েছে। ঢাকা মহানগরীর পূর্ব-পশ্চিমে সংযোগের লক্ষ্যে হাতিরঝিল প্রকল্পে ৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেস সড়ক নির্মাণ, স্থানীয় জনগণের যোগাযোগ সহজ করার জন্য ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সার্ভিস রোড, ৪৭৭ দশমিক ২৫ মিটার দীর্ঘ চারটি সেতু নির্মাণ, পথচারী ও ভ্রমণকারীদের সুবিধার্থে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফুটপাথ এবং ৯ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ হ্রদের পাশে হাঁটারপথ নির্মাণ, ২৬০ মিটার দীর্ঘ তিনটি ভায়াডাক্ট নির্মাণ এবং প্রকল্প এলাকা যানজটমুুক্ত রাখতে ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ওভারপাস, ইন্টারসেকশন ও রাউন্ড এ্যাবাউট নির্মাণ করা হয়।

The Daily Janakantha website developed by BIKIRAN.COM

Source: জনকন্ঠ

সম্পর্কিত সংবাদ
তিন বছর পর গার্সিয়ার শিরোপা

তিন বছর পর গার্সিয়ার শিরোপা খেলার খবর 28 Jun 2022 28 Jun 2022 Daily Janakantha স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ অবশেষে দীর্ঘদিনের Read more

মোহামেডানের কাছে হার শেখ জামালের

মোহামেডানের কাছে হার শেখ জামালের খেলার খবর 28 Jun 2022 28 Jun 2022 Daily Janakantha স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার Read more

পদ্মা সেতুর নাটবোল্ট খোলা অন্তর্ঘাত ॥ সিআইডি

পদ্মা সেতুর নাটবোল্ট খোলা অন্তর্ঘাত ॥ সিআইডি প্রথম পাতা 27 Jun 2022 27 Jun 2022 Daily Janakantha স্টাফ রিপোর্টার ॥ Read more

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিক্ষা সাগর 28 Jun 2022 28 Jun 2022 Daily Janakantha প্রাক্তন শিক্ষক ম্যাপেললিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা Read more

পদ্মা সেতুর এ্যাপ্রোচ সড়কে পেঁয়াজ ভর্তি ট্রাক উল্টে আহত ৪

পদ্মা সেতুর এ্যাপ্রোচ সড়কে পেঁয়াজ ভর্তি ট্রাক উল্টে আহত ৪ প্রথম পাতা 27 Jun 2022 27 Jun 2022 Daily Janakantha Read more

অনিয়ম চলবে না ॥ পদ্মা সেতুর নিরাপত্তায় কঠোর অবস্থান

অনিয়ম চলবে না ॥ পদ্মা সেতুর নিরাপত্তায় কঠোর অবস্থান প্রথম পাতা 27 Jun 2022 27 Jun 2022 Daily Janakantha জনকণ্ঠ Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন