By: Daily Janakantha

গল্প ॥ দ্রৌপদী

সাহিত্য

28 Jan 2022
28 Jan 2022

Daily Janakantha

কলিম চৌধুরীর কাছে একটা কাজ ছিল, আজ দেয়ার কথা। আনতে যেয়ে দেখি হয়নি। আমাকে দেখে লজ্জিত হেসে বললেন, শেষ করে উঠতে পারিনি। তবে আজ করে ফেলব। আপনি বসেন, চা খান। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
কাজটা হচ্ছে অফিসার্স এ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিতব্য স্যুভেনিরের কভার ডিজাইন। আজ দেয়ার কথা, দেখি আমাদের কাজটা নিয়েই বসেছেন। কাগজের উপর সবে রঙ চড়ান শুরু করেছেন। দেখে আশ্বস্ত হলাম। বললাম, আমি বসলে কাজের অসুবিধা হবে। বরং আমি ঘুরে আসি। তিনি হেসে বললেন, এক ঘণ্টা নয়, তাহলে ঠিক দুই ঘণ্টা পরে আসেন। ওয়াটার কালার তো, শুকোতে কিছু সময় লাগবে। ঘড়ি দেখে বললাম, ঠিক আছে, দুই ঘণ্টা পরেই আসছি। তখন ছবিও নেব, চা ও খাব।
খুশি হয়ে এমন প্রাণখোলা হাসি দিলেন যে আমার মনে জমা অসন্তোষ মুহূর্তে উড়ে গেল। খুশি মনে বেরিয়ে এলাম। পথ শর্ট করার জন্য অফিসের গাড়ি রেখেছিলাম প্রাচীরের এ পাশে। প্রাচীর ভাঙ্গা পথ দিয়ে এপাশে খোলা চত্বরে আসতে অদূরে দোতালা দালানের মাথায় টেরাকোটা দিয়ে লেখা প্রতিষ্ঠানের নাম দেখে মনে পড়ল মুন্নি এখানে আছে। গতবার ঈদে বাড়িতে গেলে অনেকদিন পরে মুন্নির সঙ্গে দেখা। তাও খুব কম সময়ের জন্য। আমিও ঢাকায় রয়েছি জেনে ঠিকানা দিয়ে বারবার করে অনুরোধ করছিল দেখা করার। আমার টিকানা নেয়নি। হয়ত মেয়ে বলেই আগে দেখা করার দায়ভাগ আমার। ক’মাস হয়ে গেছে দেখা করা হয়নি। সত্যি বলতে কি মনেও পড়েনি। আজ হাতে সময় রয়েছে দেখে জিপে না উঠে সেপথের দিকে এগোই। নিচতলার সিঁড়ির মুখে খোজ করতে যেয়ে থামতে হয়। মুন্নির ডাকনামে নিশ্চয়ই অফিসে কেউ চিনবে না। ভাল নাম মনে করার জন্য অনেকগুলো নাম মনে মনে আউড়ে তবেই পাই, ওর ভাল নাম মাহমুদা সিদ্দিকা।
এটা একটা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। ওর পজিশন বোধহয় ভালই। জিজ্ঞেস করতে পিয়ন পৌঁছে দেয় দোতালায় ওর রুমে। মুন্নি রুমেই ছিল। সামনে ছিল আরও দুই মহিলা। আমাকে দেখে খুশি গলায় নান্নু ভাই বলে এমন ডাক ছাড়ল যে তার সামনে বসা দুই মহিলা দ্রুত উঠে প্রস্থান করল। সত্যি যে আমি এসেছি তা যেন মুন্নি বিশ্বাসই করতে চায় না।
স্লিভলেস ব্লাউজ সুতি শাড়িতে মুন্নিকে বেশ লাগছে। একটু মুটিয়েছে, মুখেও কিছু বয়সের ছাপ। কিন্তু গলায় উচ্ছ্বাস আর আনন্দ তাকে চঞ্চলা কিশোরী করে তোলে। দেখে আমার খুব ভাললাগে। আমি সামনে চেযার টেনে বসি। বলি, হ্যা আমি নান্নু, তোমার ফুফাত ভাই।
রিমোটের সুইচ টিপে যেমন টিভি স্ক্রিনে ঝড়-তুফান থামিয়ে দেয়া যায় ও তেমনি মুহূর্তে ওর সব উচ্ছ্বাস থামিয়ে আমার দিকে চোখ বড় করে চেয়ে থাকে। না কোন কথা, না কোন হাসি। এমন কি মুখে কোন কুঞ্চনও নয়। শুধু চোখের দৃষ্টি ইষৎ বড় হয়। আমি অবাক হই। জিজ্ঞেস করি, কি হলো? ও চেয়েই থাকে। কথা বলে না। আমি আবারও জিজ্ঞেস করি, কি হলো? এবার কথা বলে, তুমি কি বললে?
: কোন কথা? আমি আরও অবাক হয়ে জানতে চাই।
: তুমি আমার কে হও বলবে?
: ফুফাত ভাই।
: তুমি শুধুই আমার ফুফাত ভাই?
: শুধুই কি না জানি না নে, তবে তুমি যে আমার মামাত বোন আর আমি তোমার ফুফাত ভাই?
: তা ঠিক। তবে এইটেই কি সব?
মুন্নি বলে কি? মুহূর্তে আমার বয়স, পোশাক, ফটোসল বাইফোকাল লেন্সের চশমা, চাকরিতে গুরত্বপূর্ণ অবস্থান সব ধসে পড়া শুরু করে। আমি কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা ফেলা অবুঝ তরুণ হয়ে উঠি। আমার ঠোট নড়ে ওঠে গলা কেঁপে ভীরু প্রেমিক হয়ে বলি, মুন্নি আমি তোর কে ছিলাম?
মুহূর্তে বদলে গেল মুন্নি। এতক্ষণ দাঁড়িয়েই ছিল। রেক্সিন মোড়া ফোম চেয়ার বসে বলল, তোমাকে কিন্তু ফার্স্ট ইয়ারে পড়া বোকা ছেলের মত লাগছে।
আমার আবেগ মিইয়ে আসে। আমি ফিরে আসি নিজের মধ্যে। দুর্নীতি দমন বিভাগের তরুণ এডি হয়ে জিজ্ঞেস করি, কেমন আছ?
: যেমন দেখছ।
আমি ভাল করে দেখে নিয়ে বলি, দেখে বাইরের স্বাস্থ্য বোঝা যেতে পারে কিন্তু সত্যি কেমন আছ তা কি বোঝা যায়?
মুন্নি হেসে জিজ্ঞেস করে বসল, তুমি কি এখনও কবিতা লেখ?
বললাম, লেখা তো দূরের কথা পড়িও না। মুন্নি চায়ের কথা বলে বলল, তাড়া নেই তো?
চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বললাম, না। পুরো দুই ঘণ্টার জন্য ফ্রি।
শুনে চোখ ছোট করে কি ভাবল এক মুহূর্ত তারপর আমার দিকে চেয়ে বলল, এক কাজ করি তাহলে।
আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করি, কি?
মুন্নি বলল না। বেল টিপে চা আনতে বলা আয়াকে নিষেধ করল।
তারপর বলল, চল চা’টা বাইরে খেয়ে আসি।
আমি দুপকেটে দুই হাত ভরে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলি, চল কোথায় নিয়ে যেতে চাও।
: দূরে নয় কাছেই, বাড়ির নিচতলায় ইনটেরিয়র ডেকোরেশন করে এসি লাগিয়ে এক মহিলা খুলে বসেছেন সৌখিন মিনি চায়নিজ রেস্তরাঁ। লাঞ্চ আওয়ারের বেশ দেরি। কলেজ পালানো কটা মেয়ে এবং এক কোনে এক জোড়া তরুণ-তরুণী। প্রথম দৃষ্টিতেই বোঝা যায় প্রেমিক-প্রেমিকা। কম আলো, মৃদুলয়ে মিউজিক আর ঘরের শীতল পরিবেশে মনে হলে বয়সটা কমে গেছে।
এখানে এসেছি রিক্সায় দেরি হবে দেখে জিপ ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে রিক্সায়। শীতের মিষ্টি রোদে মুন্নির সঙ্গে রিক্সায় চড়ে আসতে সেই অল্প বয়েসী আমেজে ফিরে গিয়েছিলাম। এর আগে মুন্নির সঙ্গে রিক্সায় চড়েছি কলেজে পড়ার সময় চার-পাঁচদিন। মুন্নি মাতাজীরহাট হাইস্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করে আমাদের বাসায় এলো কলেজে পড়তে। ভর্তি হলো আর্টসে। আমি সায়েন্সে এক ক্লাস উপরে। কলেজ একই, নওগাঁ ডিগ্রী কলেজ। যেদিন সকালে প্রাকটিকাল থাকে না সেদিন বাসা থেকে এক সঙ্গে বেরোই, রিক্সায়। কিন্তু বেশিদিন রিক্সায় ওর সহযাত্রী হওয়া ভাগ্যে সইল না। একদিন মুন্নির পাশে বসবার জন্য রিক্সায় উঠেতে যাচ্ছি মা পেছন থেকে বললেন, এখান থেকে কলেজ তুই মেয়েদের মতো রিক্সায় যাবি কেন? হেঁটে যা। তারপর নরম গলায় নিজের ভায়ের মেয়েকে বললেন, মুন্নি তুমি একাই যাও।
ক’দিন পরে উকিল পাড়ায় একই সঙ্গে একটা মেয়ে জুটে গেল, মুন্নি তার সঙ্গে রিক্সায় যায়, আসে। কখনও কখনও এমন হয় আমি একা হেঁটে যাচ্ছি মুন্নিকে নিয়ে রিক্সা ওভারটেক করল। আমি মুখ ফিরিয়ে নেই, দেখেও না দেখার ভান করি। মুন্নিও মন খারাপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকে রিক্সায়। দেখে আবার আমারই মন খারাপ হয়ে যায় ওর কথা ভেবে। এই নিয়ে বাসায় কোন কথা বলা নিরাপদ নয় তাই একদিন মুন্নিকে ডেকে নিয়ে গেলাম কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরিতে। মার হয়ে মাফ চাইলাম। মুন্নি আমার গা ছুয়ে বলল, দূর আমি কিছু মনে করিনি।
মুখে বলল, হাসলও, কিন্তু অমি বেশ বুঝতে পারলাম মুন্নি কষ্ট পেয়েছে ফুফুর ব্যবহারে। হয়ত সেইজন্যই ফস্ করে বলে বসলাম,
: আমি তোকে ভালবাসি।
যাহ্ বলে মুন্নি চমকে উঠে এদিক-ওদিক চায়।
কেমিস্ট্রি ল্যাবে তখন কেউ নেই। শুধু পিয়ন রাধা পরের ব্যাচের প্রাকটিক্যালের জন্য টেবিল গোছাচ্ছিল।
আমি সিরিয়াস হয়ে বলি, মা রিক্সায় উঠতে নিষেধ না করলে হয়ত বুঝতে পারতাম না। অথবা বুঝতে আরও দেরি হতো। বাধা দেয়ায় সহজেই বুঝতে পারলাম তোকে আমি কত ভালবাসি। বলে মুন্নির একটা হাত নিজের হাতে তুলে নেই। মুন্নি বাধা দেয় না। শুধু একবার ঘাড় ঘুড়িয়ে দরজার দিকে চায়। আমিও দেখি। যায়গাটা নিরিবিলি নিরাপদও। কেউ এলে করিডোরে পায়ের শব্দ পাওয়া যাবে। ঘরে ঢুকলেও হাত ধরা দেখতে পাবে না কারণ আমাদের সামনে রয়েছে ছোট ছোট বোতলে কেমিক্যাল রিত্রজেন্ট সাজানো শেলফ। মুন্নি হাত ছাড়িয়ে নিল না দেখে আমার সাহস বাড়ে। গলায় মেশে আবেগ। জিজ্ঞেস করি, মুন্নি তুই?
মুন্নি একবার চোখ তুলে আমাকে দেখে নিয়ে বলল, তোমাদের ক্লাসে কত সুন্দর-সুন্দর মেয়ে রয়েছে।
আমি বেশ বুঝতে পারি আমার ছুঁড়ে দেয়া বল মুন্নির গোলবারে স্পর্শ করেছে। খুশিতে ঝুঁকে পড়ে মুন্নির হাতে ঠোঁট ছোঁওয়াই বলি,
: মুন্নি তোকে আমি খুব ভালবাসব। শ্যামলা রঙা মুন্নির মুখ লজ্জায় রাঙা হয়। আমি জিজ্ঞেস করি,
: মুন্নি তুই?
মুন্নি মুখে কিছু বলে না। ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে। মাথাটা শুধু আলতো করে ওপাশে হেলায়। তারপর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রওনা দেয়। আমি ডাকি না। বাধা দেই না। বোকার মতো অথবা বিজয়ী বীরের মতো জোর গলায় ল্যাব-পিয়নকে ডেকে বলি, রাধাদা আমি আজ তোমাকে ম্যাটিনী শো দেখাব।
খাওয়াবে কে এই নিয়ে অকারণে কিছু কথা বিনিময়ের পরে, অর্ডার দেয় মুন্নিই। গরম স্যুপে চুমুক দিয়ে মুন্নিকে বলি, আজকালকার ছেলে-মেয়েরা কত ফ্রি।
নিজেদের ভেতর মগ্ন প্রেমিক যুগলের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলি, আমাদের সময়ে এমন সুযোগ থাকলে তোমাকে নিয়ে এই রকম একদিন আসতাম। মুন্নি ঠোঁট টিপে হাসল। খেয়াল করি আমরা কেউই ঘরের কথা বলছি না। জিজ্ঞেস করছি না। তাই আমিই প্রথম জিজ্ঞেস করলাম, মজহার কেমন আছে? মুন্নির সাফ জওয়াব, সে যেমন। ভার্সিটিতে দেখেছি মজহার বেশ বেপরোয়া। স্বাস্থ্যে ও পিতার অর্থে তা বেশ মানিয়ে যেত। হয়ত এসব কারণেই মুন্নি ভুলেছিল।
আমাদের বাসার থেকে কলেজে পড়বে বলে মুন্নি আপন ফুফুর কাছে এসেছিল। কিন্তু বেশিদিন থাকা হয়নি। আপন ভায়ের মেয়ে হলেও মা একটা সোমথ মেয়েকে আমাদের বাসায় থেকে পড়া পছন্দ করেননি। এমনিতেই আমাদের টানাটানির সংসার, তার উপর আমরা একের পর এক পাঁচ ভাই। বড়ভাই শুধু বাইরে, ফার্মেসিতে পড়ে হলে থেকে। আর সবাই পিঠেপিঠি। আমার ছোট চুন্নু আমার এক বছরের ছোট। বয়সে এবং পড়েও মুন্নির সঙ্গেই কলেজে। তবে সায়েন্সে। আমাদের বাসায় আসার তিন মাসের মাথায় বড় মামা হুট করে মুন্নিকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করলেন রাজশাহী মহিলা কলেজে। ওখানে থাকল হোস্টেলে। মনে মনে এর জন্য দায়ী করলাম মাকে। তার সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু এসব করে আমার মার কাছে কোন লাভ নেই। আমার মা যে কি চিজ্ তা আমরা সব ভাই বোন জানি। বাইরে থেকে দেখতে সাদাসিধা-গোবেচারা। কিন্তু সংসার পরিচালনায় তিনি মার্গারেট থ্যাচার। কোন ব্যাপারে ভাঙ্গবেন কিন্তু মচকাবেন না। আর না হয়েই বা উপায় কি? নির্বিবাদী ভাল মানুষ আব্বা তার মাসের বেতনা মায়ের হাতে তুলে দিয়েই খালাস। মাস আঠাস দিনেই হোক আর একত্রিশ দিনেই হোক মাসের বেতন দিয়েই মাকে সংসার চালাতে হয়। এতগুলো ভাইবোন পড়ে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কাজেই তার কথার উপরে আর কে কথা বলে?
কলেজ শেষ করে আমি যাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এক বছর পরে মুন্নিও চলে আসে। চুন্নু গেল বুয়েটে। আমি খুব খুশি। এবার কে ঠেকায় আমাদের। মতিহারের সবুজ চত্বর ভরে তুলব ভালবাসার ফুলে। মায়ের উপর শোধ তুলে আমি আর মুন্নি এক হয়ে ঘুরব। কিন্তু আমার আশা পূরণ হলো না। মুন্নি কেন যেন নিজেকে গুটিয়ে নিল। দেখা হয় ক্যাম্পাসে, কথাও হয়। কিন্তু সে মামাত-ফুফাত ভাইবোনের কথা। যার হাতে চুমু দিয়ে গভীর বিশ্বাসে বলেছিলাম, তোকে আমি খুব খুব ভালবাসি, তাকে আর পাই না। এবং কিছুদিন পরে দেখতে হলো মুন্নি বলিষ্ঠ এক যুবকের পাশে-পাশে ঘুরছে। বোঝাপড়া করব বলে একদিন ওকে পাকড়াও করলে, মুন্নি হেসে বলল ভার্সিটিতে কত সুন্দরী মেয়ে রয়েছে। একজন কাউকে পছন্দ করে নাও না। আমি রেগে তার হাত চেপে ধরলে সে ছাড়ার চেষ্টা করল না। স্লান হেসে বলল, আমি তোমার কালো মামাত বোন, তাই থাকতে চাই। একটু থেমে আমাদের একমাত্র ছোট বোন চাঁপা, তার নাম নিয়ে বলল, চাঁপার মতোই আমাকে আদর কর।
মুন্নির কালো ডাগর চোখের গভীর নরম গলার স্বরে কি ছিল জানি না কিন্তু রাগ করতে পারি না। হাত ছেড়ে দিয়ে ওর মুখ নিচু করা মুখের দিকে চেয়ে বলি, আমি ভালবেসেই যাব।
বলেছিলাম, কিন্তু আমি আমার কথা রাখিনি। রাখতে পারিনি ক্লাস, পড়াশোনা, বন্ধু-বান্ধব, বান্ধবীও ছিল, অনার্স পাস করে বিসিএসের জন্য প্রস্তুত-এসবের ভেতর মুন্নি অথবা অন্য কোন মেয়ে বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি। মুন্নিরও সময় ছিল না। সে দ্রুত এগিয়ে যায়। সেকেন্ডে ইয়ারে উঠে লুকিয়ে বিয়ে করে বসে মজহারকে। আগে দেখে বা যেমন শোনা গিয়েছিল, মজহারের বাড়ির অবস্থা তেমন ভাল না। খুব চালবাজ ছেলে, ডাইনিং হলের টাকা জমা দিত না। একের পর এক বন্ধুদের কাছে টাকা ধার করে আর শোধ করত না। থাকত ফিটফাট বড় বড় কথা বলত দেখে মনে হতো বড় লোকের ছেলে।
লুকিয়ে বিয়ে করে মুন্নি পড়ে গেল বিপদে। বড় মামা বিয়ে মেনে নিলেন না। মজহারের বাড়িতেও না। মুন্নির সে কি দিন গেছে। বিয়ে করেছে বলে হল থেকে বের করে দিল। ওর আর অনার্স পড়া হোল না। পাস কোর্সে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি নিল ফ্যামিলি প্লানিং এ। মজহার থাকল ভার্সিটিতে। মুন্নিই তাকে পড়া ছাড়তে দিল না। নিজে চাকরি করে মজহারের পড়ার খরচ জুগিয়ে গেল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। সেন্ট্রলি লাইব্রেরি থেকে একটা বই চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। হাতে-নাতে ধরা পড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করে। ধস্তাধস্তি হয়, শেষে ঘুসি মেরে বসে এ্যাসিসট্যান্ট লাইব্রেরিয়ানকে। আর এই নিয়ে লাইব্রেরির পুরো স্টাফরা লাগাতার ধর্মঘট করে। ফলে বাধ্য হয়েই সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে ফোর্স টিসি দেয়া হয় মজহারকে। তার আর মাস্টার্স ডিগ্রী নেয়া হয় না। ভাগ্যিস সেকেন্ডে ক্লাস পেয়ে অনার্স পাস করেছিল পল সায়েন্সে। পরে আর ওদের খবর রাখা হতো না। বাড়ি গেলে শুনতাম কিছু কিছু। তবে ভাল খবর না। তবে ইদানীং খবর পাই। মুন্নিদের এক ক্লাসমেট বর্তমানে আমার কলিগ। সে আবার ভার্সিটির বন্ধু বান্ধবদের বেশ খবর রাখে। তার কাছেই শোনা মজহার এক এনজিওতে আছে। বেশ ভাল পদে। মাঝে ব্যবসাও করেছে।
বর্তমানে ফিরে আসি। সুপ্য খেতে খেতে জিজ্ঞেস করি, মুন্নি কেমন আছ?
মুন্নি হাসে। ঘরের হালকা সবুজ আলোয় শ্যামলা রঙ মুন্নির ঠোঁটে খেলা করে। হাসিকে মনে হয় স্লান। আমার কষ্ট হয়। বুকের ভেতর চিনচিন করে বটে।
জিজ্ঞেস করি, মজহার কেমন আছে?
: ও যেমন। চিরদিনই বেপরোয়া। ভাল বেতন পায় কিন্তু সংসারের দায়-দায়িত্ব নেবে না।
: তুমি বাধা দাও না?
: দিয়ে দেখেছি তাতে লাভ হয় না। বিপত্তিই বাড়ে শুধু। সব পাখিই সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে এই নীতি মেনে নিয়েছি।
এসব কথা তুলে তাকে কষ্ট দেয়া হলো ভেবে টেবিলের ওপর রাখা ওর হাত ছুয়ে বলি, আমি দুঃখিত। তোমার মনে কষ্ট দিলাম।
মুন্নি ফিরে আসে স্বাভাবিকতায়। হেসে বলে, আমার কিন্তু আনন্দের দিকও রয়েছে।
: তাই? আমি খুশি গলায় বলি।
: আমার মেয়ে তিন্নি পড়াশোনায় ভাল। ফাইভে ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পেয়েছে। ভাল গাইতে পারে। এর মধ্যে গান গেয়ে অনেক পুরস্কার পেয়েছে।
: তাহ’লেতো ভাগ্নিকে আদর জানাতে যেতেই হয়।
মুন্নি বলে, এসো! ভাবিকে নিয়ে এসো, খুব খুশি হব। ওঠার মুখে জিজ্ঞেস করি সেই প্রশ্নটা, যা এতদিনও জানা হয়নি।
: সেই যে কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরিতে তোমার হাতে চুমু খেয়ে যা জানিয়েছিলাম তারপর তো আর এগুতে পারিনি। তুমি চলে গেরে রাজশাহীতে।আবার দেখা হলো রাজশাহীতে। ভাবলাম সুদে-আসলে উসুল করে নেব। মতিহারের সবুজ চত্বর আমাদের ভালবাসায় রঙিন করে তুলব। কিন্তু তা আর হলো না। তুমি কেন যে আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেলে তা আজও রহস্যই রয়ে গেছে।
মুন্নির সারামুখে হাসি খেলে যায়। আমি জিজ্ঞেস করি, সে কি মজহারের জন্য?
মুন্নি হাসে, না। ওতো এলো আরও পরে। তার আগেই আমি তোমার কাছ থেকে গুটিয়ে নেই।
আমি দারুণ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করি, কি ব্যাপার, বলবে না?
মুন্নি হাসি থামিয়ে আমার চোখে চোখ রাখে। জিজ্ঞেস করে,
: তুমি সত্যি কিছু জান না?
আমি মাথা নেড়ে আমার অপারগতার কথা জানাই। মুন্নি হাসি থামিয়ে বলে, সে এক মজার ব্যাপার। আমার মাা বড়ভাই- এর সঙ্গে আমার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল ফুফুর কাছে। ফুফু রাজি হয়নি। আব্বা এতে মনোক্ষুণœ হয়ে আমাকে নিয়ে ভর্তি করান রাজশাহী মহিলা কলেজে।’
বড়ভাই মানে আমার বড় ভাই, ফার্মেসিতে পাস করে তখন ভাল বেতনে সবে ঢুকেছে এক ওষুুধ কোম্পানিতে। ভায়ের সঙ্গে মুন্নির বিয়ের একটা প্রস্তাবের কথা কানাঘুষায় শুনেছিলাম। কিন্তু আমাদের বাড়িতে কথাটা গুরুত্ব পায়নি। তাই আমিও গুরুত্ব দেইনি। পরে ভুলেই গিয়েছিলাম।
সে কথা উল্লেখ না করে প্রশ্ন করি, এই কারণে?
: না। আরও আছে। তোমার ছোট ভাই চুন্নু আমাকে প্রেমপত্র দিয়েছিল।
নতুন নতুন তথ্যে আমি থ’ হয়ে যাই। এসব আমি জানতাম না। না জেনে রাগ করেছিলাম মা’র উপর। অভিমান করেছিলাম মুন্নির উপর।
মুন্নি হেসে বলে, তাইতো আমি সব কিছু নিয়ে ভাল করে ভাবি। আর ভেবে ঠিক করি, এক বাড়িতে তিনজনের হয়ে থাকতে পারব না।
আমি খুব অবাক হয়ে মুন্নিকে নুতন করে দেখতে থাকি।

The Daily Janakantha website developed by BIKIRAN.COM

Source: জনকন্ঠ

সম্পর্কিত সংবাদ
শনিবার গ্যাস থাকবে না রাজধানীর যেসব এলাকায়

শনিবার গ্যাস থাকবে না রাজধানীর যেসব এলাকায় জাতীয় 20 May 2022 20 May 2022 Daily Janakantha অনলাইন রিপোর্টার ॥ গ্যাস Read more

ফরাসি ওপেনে একই অর্ধে রাফায়েল-নোভাক

ফরাসি ওপেনে একই অর্ধে রাফায়েল-নোভাক খেলার খবর 20 May 2022 20 May 2022 Daily Janakantha অনলাইন ডেস্ক ॥ গত বারের Read more

বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি

বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি শেষের পাতা 19 May 2022 19 May 2022 Daily Janakantha মোরসালিন মিজান ॥ বেড়েই চলেছে গরম। Read more

আজ সুলতানা জামানের দশম মৃত্যুবার্ষিকী

আজ সুলতানা জামানের দশম মৃত্যুবার্ষিকী শেষের পাতা 20 May 2022 20 May 2022 Daily Janakantha বাংলাদেশ সরকারের আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত ষাটের Read more

গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা

গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা দেশের খবর 20 May 2022 20 May 2022 Daily Janakantha স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর ॥ Read more

কর্মকর্তা লাঞ্ছিত ॥ প্রতিবাদে রেল কর্মচারীদের বিক্ষোভ

কর্মকর্তা লাঞ্ছিত ॥ প্রতিবাদে রেল কর্মচারীদের বিক্ষোভ দেশের খবর 20 May 2022 20 May 2022 Daily Janakantha স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন