By: Daily Janakantha

গণতন্ত্র বনাম জাতীয় সরকার

চতুরঙ্গ

13 Jan 2022
13 Jan 2022

Daily Janakantha

হালে রাজনীতিতে একটি নতুন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এটি হচ্ছে ‘জাতীয় সরকার’। আবারও রাজনীতির আলোচনায় ‘জাতীয় সরকার’ ইস্যুটি টেনে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এমন দলগুলোর পক্ষ থেকে এই ইস্যুর পালে হাওয়া দেয়া হচ্ছে, যাদের দেশের রাজনীতিতে কোন গণভিত্তি নেই। এই দলগুলোর প্রার্থীরা জাতীয় নির্বাচনে দাঁড়ালে তাদের জামানতই শুধু বাজেয়াফত হয় না, তাদের প্রাপ্ত ভোট ছোট ছোট শিশুরাও অবলীলায় বলে দিতে পারে। বড় দলগুলোকে বিবেচনায় নিলে এই দলগুলোকে গ্রাম্য ভাষায়, ‘ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। দেশের অতি পরিচিত গৃহপালিত প্রাণী ছাগলের যদি তিনটি বাচ্চা হয়, তখন দেখা যায় বড় দুটি বাচ্চার গায়ে বেশ শক্তি থাকে। তারাই মায়ের দুধ পান করে বেশ নাদুস নুদুস হয়ে ওঠে। আর তিন নম্বর বাচ্চাটি দুধ খেতে না পেয়ে বেশ রোগা হয় এবং বেশি লাফালাফি করে। দেশের ওই রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থাও তেমন। জনগণের সঙ্গে তাদের কোন যোগাযোগ অথবা সম্পৃক্ততা না থাকলে কি হবে, তাদের লম্ফঝম্প আর উচ্চবাচ্য খুব বেশি। আজকাল ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অনলাইন গণমাধ্যমের সুবাদে তাদের এই উচ্চবাচ্য ভাচুর্য়াল মাধ্যমে বেশি শোনা যায়। তবে সনাতন গণমাধ্যম তথা প্রিন্ট মিডিয়া এমনকি ইলেকট্রনিক মিডিয়াও তাদের এই উচ্চবাচ্যকে খুব একটা পাত্তা দেয় না।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে। হাতে আর দুই বছরও সময় নেই। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো জোরেশোরে মাঠে নামবে এটাই স্বাভাবিক। গণভিত্তি থাকুক আর নাই থাকুক রাজনীতি করতে হলে নামতে হবে মাঠে। যেতে হবে জনগণের কাছে। জনগণের ইস্যুগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে। কিন্তু এই দলগুলো সেটি করছে না। নির্বাচন নিয়েও বোধকরি তাদের কোন মাথাব্যথা নেই। কারণ, নির্বাচনে গেলে তো তাদের ভোটের ফল হবে ভরাডুবি তথা লজ্জাস্কর। তাই তারা নির্বাচনের আগেই সরকার পরিবর্তন করতে চায়। ঠিক সরকার পরিবর্তন বললে ভুল হবে। তারা চায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তথা স্বাধীন বাংলাদেশের নেতৃত্বদানকারী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে। সেটিও আবার কোন সাংবিধানিক কায়দায় নয়, একেবারে অসাংবিধানিক কায়দায়। তারা চায় জাতীয় সরকার। সাংবিধানিক কায়দায় জাতীয় সরকার গঠন করতে হলে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে সংবিধানে। কিন্তু বর্তমান সংবিধানে এ ধরনের কোন বিধান নেই। সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে, নির্বাচনের মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে এই দলগুলোকে সংবিধান পরিবর্তন করে তাতে জাতীয় সরকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সংবিধান সংশোধন অনুযায়ী সেটি নির্বাচনকালীনও জাতীয় সরকার হতে পারে, আবার দেশ পরিচালনায়ও জাতীয় সরকার হতে পারে। অর্থাৎ যে প্রয়োজনেই জাতীয় সরকার চাওয়া হোক না কেন, তা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে হতে হবে। এখানে সংবিধান লঙ্ঘনের কোন সুযোগ নেই।
আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টির মতো বড় রাজনৈতিক দলের বাইরে দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে ‘জাতীয় সরকার’ প্রশ্নে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রক্রিয়াটিকে একটি ‘ইস্যু’ হিসেবে দাঁড় করানোর অপচেষ্টাও চলছে। যদিও এখন পর্যন্ত উদ্যোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে এবং বিক্ষিপ্তভাবেই আলোচিত হচ্ছে।
জাতীয় সরকারের ফর্মুলাটি আলোচনায় আসে মূলত ওয়ান-ইলেভেনের সময়, ২০০৭-২০০৮ সালে। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও আলোচিত হয় ফর্মুলাটি। যদিও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় তখন এ আলোচনা ছিল অনেকটা ক্ষীণ। এরপর গত এক বছর ধরে ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, অলি আহমদ, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না, সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জোনায়েদ সাকিসহ তরুণ কয়েকজন রাজনীতিক বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ‘জাতীয় সরকার’ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছেন। গত ৮ জানুয়ারি জাতীয় সরকারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচী পালন করেছে আ স ম রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি।
জাতীয় সরকারের বিষয়ে ক্ষুদ্র দলগুলোর কিছু যুক্তি আছে। যদিও এসব খোঁড়া যুক্তি ধোপে টেকে না। তারপরও আলোচনার খাতিরে যুক্তিগুলো সম্পর্কে একটু আলোকপাত করতে চাই। জাতীয় পার্টিসহ বড় তিনটি রাজনৈতিক দলের বাইরে ক্ষুদ্র দলগুলো মনে করছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে করার চেষ্টা হলেও তাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না। পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিলে ক্ষমতাসীন দলের ‘এক্সিট-পয়েন্ট’ বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ায় একমাত্র পথ সমঝোতাভিত্তিক সরকার। যেটিকে তারা ‘জাতীয় সরকার’ বলে আখ্যায়িত করতে চাচ্ছে। ইস্যুটি মূলত আলোচনায় আসে ২০১৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সরকারের দাবিতে গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়ার সই করা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিবৃতির মাধ্যমে। সেই বিবৃতিতে তিনটি দাবি জানানো হয়েছিল। সেই দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করে জাতীয় সরকার ঘোষণা করা এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সরকার ইস্যুতে ইতোমধ্যে নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, মওলানা ভাসানী অনুসারী পরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন আলোচনা করছে। দুই দফায় বৈঠকও করেছে সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা। এই প্রক্রিয়ায় জেএসডি, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য সংগঠনও যুক্ত হতে পারে। তবে আলোচনাগুলো এখনও রয়েছে প্রাথমিক অবস্থায়। কারও কারও মধ্যে এই প্রস্তাব নিয়ে মতপার্থক্যও তৈরি হয়েছে। জাতীয় সরকার নিয়ে সক্রিয়দের মধ্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অন্যতম। সম্ভাব্য ঐকমত্যের সরকারে তিনি আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ অন্য দলগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতা চান। এই সরকারে তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার নামও প্রস্তাব করেছেন আগ্রহী নেতাদের কাছে। তবে এ বিষয়টি নিয়ে অনেক নেতার মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদিও জাফরুল্লাহ চৌধুরী এই মতবিরোধ নিরসন করার চেষ্টা করছেন।
উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করছেন, মানুষ সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য আগ্রহ না দেখালেও অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে দেশের পরিস্থিতি অনেক জটিল। অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা বোঝাতে চাইছে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে আন্দোলন। আর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি হিসেবে তারা নিয়ে আসতে চাইছে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ না জানানো। তবে এ বিষয়গুলো নিয়ে তাদের স্পষ্ট কোন ধারণা নেই। ফলে এই ইস্যুটিকে কিভাবে কাজে লাগাবেন তা তারা নিজেরাই বুঝতে পারছেন না। শেষে না আবার হিতে বিপরীত হয়ে যায়! এজন্য তারা এ দুটি ইস্যুকে নিয়ে খুব জোরেশোরে এগোতে পারছে না। জাতীয় সরকারের দাবির সঙ্গে বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোও যুক্ত আছে। তাদের আবার মার্কিন স¤্রাজ্যবাদ নিয়ে চুলকানি (এলার্জি) আছে। কারণ, আমেরিকার ইস্যু নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামলে তাদের ওই দেশটির পক্ষে কথা বলতে হবে। এটা আবার তাদের রাজনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে চলে যায়। ফলে এই ইস্যু নিয়েও তারা আছে দোটানায়।
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি জাতীয় সরকারের ইস্যুতে নেই। তাদের ইস্যু সংবিধান থেকে বাতিল হয়ে যাওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বিএনপি প্রকাশ্যে বলছে, জাতীয় সরকার ইস্যুতে তারা নেই। উল্টো বরং এটিকে ভিন্ন কোন ষড়যন্ত্র হিসেবে তারা উল্লেখ করতে চাইছে। বিএনপিকে নিয়েও ক্ষুদ্র দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত আছে। তারা মনে করে, ক্ষমতা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে না। কারণ, ক্ষমতা পরিবর্তন হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। তাহলে বিষয়টি ‘যে লাউ সেই কদুই’ দাঁড়াবে। আর বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এই দলগুলোর কোন লাভ হবে না। ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি তাদের পাত্তা দেবে না। অর্থাৎ তাদের হিসাবে ক্ষমতাসীন দলের বিকল্প হতে পারে না বিএনপি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে গণতন্ত্র বা নির্বাচনের পথ সুগম করতে মধ্যবর্তী ব্যবস্থা হচ্ছে ‘জাতীয় সরকার’। যে সরকার দেশে অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করবে। যদিও অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এই দলগুলোর যে আদৌ কোন লাভ হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়।
তাদের মতে, জাতীয় সরকার হলে তখন সবাই আসবে। তাতে সব দলের অংশগ্রহণ থাকবে। তারা এই জাতীয় সরকার প্রক্রিয়ার সঙ্গে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোকেই রাখতে চাইছে না, এই সরকার ব্যবস্থায় সমাজের পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও রাখতে চাইছে। অর্থাৎ শুধু রাজনীতিকদের ওপর তাদের ভরসা কম। এজন্য তারা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও দারস্থ হতে চাইছে।
এখন প্রশ্ন হলো, জাতীয় সরাকর ব্যবস্থা কী চিরজীবনের জন্য হবে, নাকি কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হবে। জাতীয় সরকারের অন্যতম প্রবক্তা জাফরুল্লাহ চৌধুরী দুই বছরের জন্য জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব রেখেছেন। আর এতে প্রধান দুই দল, অর্থাৎ আওয়ামী লীগের দুজন এবং বিএনপির দুজন প্রতিনিধি থাকবে। অন্য দলগুলো থেকে একজন করে প্রতিনিধি থাকবে। এছাড়া সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বুদ্ধিজীবী ও আইনজীবীও থাকবে। এই দুই বছরে জাতীয় সরকার কি কাজ করবে তার কোন কার্যপরিধি নিয়ে এখনও তাদের কোন আলোচনা শোনা যায়নি। তবে তাদের অন্যতম কাজ হবে নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা। আর এগুলো করতে গেলে ঐকমত্যের মাধ্যমেই করতে হবে। গণফোরা প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টা ড. কামাল হোসেন গত ১০ জানুয়ারি একটি আলোচনা সভায় আবারও এই ঐক্যের পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এ মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। আমি সবসময় ঐক্যের কথা বলেছি। দেশ ও জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ঐক্যের কথা আবারও বলছি। দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে ঐক্য করুন।’
তবে তাদের এই জাতীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দেশের সুশীল সমাজের মধ্যে তেমন কোন নড়াচড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এর একটাই অর্থ, এর পেছনে কোন আন্তর্জাতিক পক্ষ নেই। আন্তর্জাতিক পক্ষ থেকে কোন সিগন্যাল থাকলে সুশীল সমাজের মধ্যে অন্যরকম দৌড়ঝাপ শুরু হয়ে যেত। ফলে এই উদ্যোগ এখন পর্যন্ত তাদের নিজেদের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ঝড় তোলার মতো কোন শক্তি সঞ্চয় করতে পারছে না। তাই এই উদ্যোগ যে মাঠেই মারা যাবে, তা বলে দেয়া যায় এখনই।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পাশাপাশি যে সরকারের নাম বিশেষভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে, তা হলো ওয়ান ইলেভেনের সরকার। ওই সরকারটি ছিল মূলত সুশীল সমাজের সরকার। এখন যে ক্ষুদ্র দলগুলো জাতীয় সরকার নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে, ওই সরকারে তাদেরও সমর্থন ছিল। বর্তমানে যে ইস্যুগুলো নিয়ে এই দলগুলো জাতীয় সরকারের ঝান্ডা ওড়াতে চাইছে, সেই ইস্যুগুলো তখনও বিদ্যমান ছিল। ওয়ান ইলেভেন সরকার কেন নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন না করে রাজনৈতিক দলগুলোর কায়দায় নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিল? ওয়ান ইলেভেন সরকার দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। তাদের ছিল অগাধ ক্ষমতা। ছিল না কোন পিছুটান কিংবা দায়বদ্ধতা। ফলে ওই সরকারই তো পারত নির্বাচনী অবকাঠানো এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে। প্রশাসন সংস্কার করে একটি আধুনিক দক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে। জাতীয় সরকারের মূল ইস্যু হচ্ছে নির্বাচনী ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। ওই কাজ তো তখনই করে ফেলা যেত এবং ওই সরকারের জন্যও এটি ছিল আদর্শ কাজ। গণতান্ত্রিক সরকারগুলো জনপ্রিয়তার ভয়ে অনেক সময় অনেক কাজ করতে পারে না। বাংলাদেশের ৩৫ বছরের যে সমস্যা বা জঞ্জাল ছিল সেগুলোতো তাদেরই পরিষ্কার করার কথা ছিল। তারা তো সেই উদ্দেশ্য নিয়েই ক্ষমতায় এসেছিল। তখন তারা ওই কাজগুলো করল না কেন?
আসলে এখন যে জাতীয় সরকার বা জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে বর্তমান সরকারের পরিবর্তন। এখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না থাকলে বিকল্প কি? দেশের এখনকার বাস্তবতায় বিকল্প হচ্ছে বিএনপি। কারণ, আওয়ামী লীগের পর বিএনপিই বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। যদিও এই উদ্যোগের সঙ্গে বিএনপি নেই। কিন্তু বিএনপি না থাকলেও এটি বিএনপিরই একটি অপকৌশল হতে পারে। নিজেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের পাশাপাশি আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর জোট গঠনের অংশ হিসেবে ছোট দলগুলোকে এই ইস্যুতে মাঠে নামানো একটি কৌশল হলেও হতে পারে। কারণ, বিএনপিও চায় বর্তমান সরকারের পতন। এখানেই বিএনপির সঙ্গে জাতীয় সরকার প্রত্যাশীদের মিল। আর এতে বিএনপিরই শতভাগ লাভ।
আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই নানা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। বিএনপি একদিকে যেমন বৃহত্তর জোট গঠনের চিন্তাভাবনা করছে, অন্যদিকে একই জোটভুক্ত না হয়ে সমান্তরালে ভিন্ন জোট গঠনেরও প্রচেষ্টা নিয়ে রাজনীতির মাঠে চলছে আলোচনা। কারণ, জাতীয় সরকারের ইস্যুকে সমর্থন দেয়া দলগুলো কারান্তরীণ খালেদা জিয়ারও মুক্তি দাবি করছে। ফলে জাতীয় সরকার ইস্যু যে ওই রাজনীতির মেরুকরণেরও একটি অংশ সেটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জাতীয় সরকার ইস্যুতে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এই দলগুলো আবারও অগণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতায় আনার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কারণ, বর্তমান সংবিধানে দুই বছর বা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা কোন সময়ের জন্যই জাতীয় সরকার গঠনের সুযোগ নেই। জাতীয় সরকার গঠন করতে হলে দুইভাবে করতে হবে। প্রথমটি হচ্ছে, সংবিধান পরিবর্তন করে সেটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, অগণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে। বর্তমানে গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচন এবং ক্ষমতার পালা বদলের বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত আছে। বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশেই এই নিয়মে নির্বাচন হচ্ছে এবং ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এই ব্যবস্থাটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে এই সরকারের তো সংবিধান সংশোধন করে আর অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। আর সেটি করা কোন গণতান্ত্রিক সরকারের কাজও নয়।
অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা বদলের কারণে দেশের একটি শ্রেষ্ঠ সংবিধান অনেক কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। সংবিধানে এতো কাটাছেঁড়া রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন একটি দেশের জন্য শোভন নয়। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রে বিশ্বাসীদের মতে, সংবিধানের বর্তমান সরকার পরিবর্তন ব্যবস্থা পাল্টানোর আদৌ কোন সুযোগ নেই। এখন কোন দল নির্বাচনে না এলে ফাঁকা মাঠে তো অনেক দল অনেকভাবেই গোল দেয় বা দেয়ার সুযোগ পায়। সেজন্য যে সকল দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি বা যে সকল দল জাতীয় সরকারের দাবি জানাচ্ছে, তারাও সমানভাবে দায়ী। কারণ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সব রাজনৈতিক দলের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কোন কারণে কোন রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ না করলে, সেটা তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা।
আর দ্বিতীয় উপায়টি হচ্ছে, অগণতান্ত্রিক উপায়ে জাতীয় সরকার গঠন। যে পন্থায় জিয়া-এরশাদ ক্ষমতায় এসেছে। যে পন্থায় ওয়ান ইলেভেনের সৃষ্টি হয়েছে দেশে। ফলে জাতীয় সরকার ইস্যু সৃষ্টির মাধ্যমে দেশে আবার অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে কিনা, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।
তবে এ ধরনের অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ এখন আর দেশে নেই। দেশের মানুষকে বার বার বোকা বানানো হয়েছে। আর তারা বোকা বনতে রাজি নয়। এখন মানুষ অনেক সচেতন। এখনকার প্রজন্ম আর আন্দোলন, হরতালে জ্বালাও-পোড়াওসহ লাশের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। বিশ্ব এখন অনেদ দূর এগিয়ে গেছে। দেশে দেশে এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হাতছানি দিচ্ছে। মানুষ এখন ব্যক্তি জীবন, ব্যক্তি উন্নয়ন নিয়ে বেশি ব্যস্ত। আছে করোনার আগ্রাসন। রাজনীতির পেছনে সময় দেয়ার সময় তাদের নেই। ভোটের প্রতিও তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। গণতন্ত্র যত বিকশিত হবে, ভোটের প্রতি আগ্রহ আরও কমে যাবে। মানুষ এখন দেখছে, যে সরকার ক্ষমতায় আছে তারা তাদের ব্যক্তি উন্নয়নের পথকে কতটা মসৃণ ও সুগম করতে পারছে। ব্যক্তি জীবনের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারছে। পাশাপাশি হচ্ছে দেশের উন্নয়নও।
রাজনীতি করতে চাইলে এখন দলগুলোকে সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ করতে হবে। প্রথাগত রাজনীতির দিন শেষ। রাজনীতিকদের এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এর আলোকে রাজনীতি করতে হবে। জনগণের অগ্রাধিকারের তালিকাকে সামনে রেখে কাজ করতে হবে। জনগণের অগ্রাধিকারের তালিকায় জাতীয় সরকার ইস্যু অনেক তলানিতে। সেটি কোনভাবে ওপরে উঠে আসার কোন সুযোগ নেই।

১২.০১.২০২২
লেখক : সাংবাদিক

The Daily Janakantha website developed by BIKIRAN.COM

Source: জনকন্ঠ

সম্পর্কিত সংবাদ
রসভাপতি নাসিম সম্পাদক রওনক

রসভাপতি নাসিম সম্পাদক রওনক শেষের পাতা 29 Jan 2022 29 Jan 2022 Daily Janakantha স্টাফ রিপোর্টার ॥ টেলিভিশন শিল্পীদের সংগঠন Read more

সাড়ে ৬শ’ বছর আগের প্রত্নবস্তু উদ্ধার, রাখা হবে জাদুঘরে

সাড়ে ৬শ’ বছর আগের প্রত্নবস্তু উদ্ধার, রাখা হবে জাদুঘরে শেষের পাতা 28 Jan 2022 28 Jan 2022 Daily Janakantha বাবুল Read more

উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হলো চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন

উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হলো চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন শেষের পাতা 28 Jan 2022 28 Jan 2022 Daily Janakantha স্টাফ রিপোর্টার Read more

৭ বাংলাদেশির লাশ দেশে ফেরাতে আলোচনা চলছে: দূতাবাস

লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া ৭ বাংলাদেশির লাশ দেশে ফেরত আনতে ইতালি সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। 

ফতুল্লায় ছুরিকাঘাতে গার্মেন্টস কর্মী নিহত

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাসদাইর পাকাপুল এলাকায় আমান উল্লাহ আমান নামের এক  গার্মেন্টস কর্মীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। 

ইলিয়াস কাঞ্চন সভাপতি, জায়েদ খান সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নতুন সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন জায়েদ খান। এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন