বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এবং আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা একটি উন্নত সমাজের মূল ভিত্তি। যুগে যুগে আইনের লক্ষ্য ছিল মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। তবে সময়ের বিবর্তনে এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে প্রথাগত আইনি প্রক্রিয়ায় অনেক সময় সাধারণ মানুষ দীর্ঘসূত্রতা ও নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন।বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া দিতে উদ্ভাবিত হয়েছে ‘LexGlobal BD’ নামক একটি নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। সম্প্রতি আথেরিওস ল্যাবস-এর প্রতিষ্ঠাতা নাহিদ আলম এই উদ্ভাবনী প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।রাজশাহীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ আলম। ২০২৪ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সায়েন্স ফিয়েস্টায় যখন তিনি তার উদ্ভাবন নিয়ে লড়তে নামেন, তখন তার সামনে ছিল দেশের নামী সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় প্রতিযোগীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, রুয়েট আর ডুয়েটের মেধাবীদের ভিড়ে অনেকেই হয়তো এই সাধারণ তরুণকে পাত্তাই দিতে চায়নি। কিন্তু ফলাফল যখন ঘোষণা হলো তখন সবাইকে পেছনে ফেলে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ছিনিয়ে নিলেন নাহিদ আলম। প্রযুক্তিটি তৈরির কারণ জিজ্ঞাসা করলে নাহিদ আলম বলেন, প্রযুক্তি কেবল জীবনকে সহজ করার জন্য নয়, বরং প্রযুক্তি হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের প্রধান হাতিয়ার। আমি যখন দেখেছি আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ আইনি জটিলতা আর দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার পেতে কতটা ভোগান্তির শিকার হন, তখনই আমি ডিজিটাল সমাধান নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই।নাহিদ আলমের এই উদ্ভাবন কেবল একটি সাধারণ অ্যাপ নয়, বরং এটি সমাজের তিনটি স্তম্ভের জন্য তৈরি করা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্ত্র।সাধারণ মানুষের জন্যকল্পনা করুন, নির্জন পথে কোনো এক নারী বা শিক্ষার্থী বিপদে পড়েছেন। ফোন বের করে কথা বলার পরিস্থিতি নেই। লেক্সগ্লোবাল অ্যাপের স্ক্রিনে কেবল একটি বিশেষ স্পর্শ বা আঙ্গুলের আঁকিবুঁকির (SOS Gestures) মাধ্যমেই মুহূর্তের মধ্যে তার অবস্থান এবং সাহায্যের বার্তা পৌঁছে যাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। এছাড়াও সাধারণ মানুষ এখন আর দালালের খপ্পরে পড়বে না; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনার মামলার ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে যোগ্য আইনজীবীকে খুঁজে দেবে। এমনকি মামলা করার আগেই আপনি জেনে যাবেন আপনার জেতার সম্ভাবনা ঠিক কতটুকু!আইনজীবীদের জন্যআইনজীবীদের জীবনকে সহজ করতে এতে যোগ করা হয়েছে ‘স্মার্ট ক্লায়েন্ট ম্যাচিং’। এখন আর মক্কেলের জন্য অপেক্ষা নয়, বরং প্রযুক্তি মক্কেলকে আপনার কাছে নিয়ে আসবে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে এতে রয়েছে ‘ইনস্ট্যান্ট ড্রাফটিং’ সুবিধা, যার মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার কাজ সম্পন্ন হবে কয়েক সেকেন্ডে। মক্কেলদের ডিজিটাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং ফাইল ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে আইনজীবীরা এখন আরও সুশৃঙ্খলভাবে তাদের পেশা পরিচালনা করতে পারবেন।শিক্ষার্থীদের জন্যআইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এই অ্যাপটি একটি চলমান মহাফেজখানা। মোটা মোটা হাজার হাজার আইনি বইয়ের বোঝা এখন আর কাঁধে নিতে হবে না। ডিজিটাল লাইব্রেরিতে রয়েছে দেশের সমস্ত আইনি নথিপত্র এবং আইনের ধারার সহজতম ব্যাখ্যা। এমনকি বাস্তব জীবনের মামলাগুলোর গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ক্যারিয়ার গাইডেন্স পাবেন সরাসরি এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই।অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, এর মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকেরা অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে এবং হয়রানিমুক্ত উপায়ে আইনি সেবা পাবেন। বিশেষ করে এর ‘জরুরি সংকেত’ ও ‘তাৎক্ষণিক আইনি নথিপত্র লিখন’ সুবিধাটি দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে সাধারণ মানুষ মন্তব্য করছেন।চলতি বছরের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে এই প্ল্যাটফর্ম। সাধারণ গ্রাহক ব্যবহার করতে পারবেন অনায়াসে। রাজশাহীর এই তরুণের উদ্ভাবন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে এবং বিচারব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।ইখা
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
