কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় এক ব্যক্তির মৎস্য খামার (ফিশারি) থেকে প্রভাব খাটিয়ে জোরপূর্বক মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বাধা দিতে গেলে খামারের মালিককে মারধরের চেষ্টা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।ভুক্তভোগী মো. দেলোয়ার হোসেন এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের ছয়চির গ্রামের মৃত মজনু মিয়ার ছেলে দেলোয়ার হোসেন বর্তমানে পরিবারসহ কিশোরগঞ্জ শহরে বসবাস করলেও গ্রামে তার একটি মৎস্য খামার রয়েছে। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে গিয়ে খামারের দেখভাল করেন। তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে গত ১ এপ্রিল সকালে সুখিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম শামীম, যুবদল নেতা মুরসালিন ইসলাম রনিসহ কয়েকজন বেকু (মাটি কাটার যন্ত্র) দিয়ে খামার থেকে মাটি কাটা শুরু করেন। পরে সেই মাটি স্থানীয় একটি ইটভাটায় বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবাদ পেয়ে দেলোয়ার হোসেন ঘটনাস্থলে গেলে অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মারধরের চেষ্টা করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এমনকি আইনি পদক্ষেপ নিলে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করার ভয়ও দেখানো হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম শামীম ও তার সহযোগীরা এলাকায় রাজনৈতিক খাটিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম করে আসছেন। পদ্মকুড়ি বিলের ফসলি জমি দখল করে মাটি বিক্রি ও অবৈধভাবে ফিশারি খননের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। কিছু দিন আগেও মাটি কাটার অভিযোগে প্রশাসন তাদেরকে জরিমানা করেছে। এতে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে এলাকার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হামিদ টিটুর সঙ্গেও তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন বলেন, এটা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই শামীম ও তার লোকজন ভেকু দিয়ে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি খামারের পাড়ে থাকা তিনটি মেহগনি গাছও কেটে নেওয়া হয়েছে। নিজের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য একটি সরকারি খালের গতিপথ পরিবর্তন করছেন। এর ফলে পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যা পার্শ্ববর্তী ধান জমিগুলোতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করবে। একজন ব্যক্তি কীভাবে নিজের সামান্য স্বার্থে এলাকার এত মানুষের কৃষিজমির অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারেন।তিনি আরও বলেন, আমি একজন সাধারণ মানুষ কিশোরগঞ্জ-২ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন জালাল ভাইয়ের কাছে সুষ্ঠু বিচার চাই। আমরা নিজেরাও বিএনপির রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; আমার বোন জামাই পৌর বিএনপির সভাপতি। আমরা বিশ্বাস করি, দলের নাম ভাঙিয়ে এই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভূমিদস্যুতা কোনোভাবেই দলের আদর্শ হতে পারে না। আমাদের নেতা তারেক রহমান কখনোই সাধারণ মানুষের জমি দখল বা জনস্বার্থ বিঘ্নিত করার নির্দেশ দেননি। আমি এই প্রকাশ্য অন্যায়ের দ্রুত প্রতিকার চাই এবং আমার জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।”স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে মনিরুজ্জামান শামীম জনগুরুত্বপূর্ণ এই খালটি বন্ধ করে দিয়েছেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের পুকুর বড় করা, আর এই কাজ করতে গিয়ে তিনি অন্যের জমির ওপর চরম জুলুম করছেন। পুকুরের আয়তন বাড়াতে গিয়ে খালের পাড় থেকে অন্তত ১০ ফুট মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। ফলে যে খালটি আগে ১০ থেকে ১২ ফুট প্রশস্ত ছিল, তা এখন সংকুচিত হয়ে মাত্র ৩ ফুটে এসে ঠেকেছে। এর ফলে এলাকার বিশাল কৃষিজমি এখন ভয়াবহ জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে। সামান্য বৃষ্টি হলেই সব ধানক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষের বসতবাড়িতে পানি উঠে আসবে। এছাড়া তিনি খালের ওপর ডাইভারশন (বিকল্প বাঁধ) তৈরি করে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ গাড়ি মাটি বিক্রি করেছেন। বর্তমানেও সেই ডাইভারশনটি সেখানে বিদ্যমান।তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম শামীম বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জমিটির সঙ্গে আমার কোনো দালিলিক সম্পর্ক নেই। ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায় ও যুগ্ম আহ্বায়ক তাদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আমার কাছে ভেকু মেশিন চেয়েছিল, আমি শুধু সহায়তা করেছি।”এদিকে সুখিয়া ইউনিয়ন যুবদল যুগ্ম আহবায়ক মুরসালিন ইসলাম রনি দাবি করেন, তিনি বৈধভাবে ফিশারিটি ইজারা নিয়েছেন এবং পাড় সংস্কারের কাজ করছিলেন। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি তাই কাজ বন্ধ রেখেছেন।পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, “অভিযোগটি পাওয়া গেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, সম্প্রতি ওই এলাকায় ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার অভিযোগে একজনকে জরিমানা করা হয়েছে।ইখা
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
