জমির খাজনা দেওয়ার নিয়ম পরিবর্তনের দাবিতে মাইকিং করায় হোসাইন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (টুটুল) নামের এক ব্যক্তিকে উঠিয়ে নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে । বুধবার (১ মার্চ) বিকেলে বদলগাছী উপজেলার ইউএনও অফিসে এ ঘটনা ঘটে। হোসইন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (৬২) উপজেলার কয়াভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি নিজেকে রজনীগন্ধা ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বলে পরিচয় দেন। হোসাইন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমার নামে ৫ কাঠা জমি আছে। আমি আমার অংশের খাজনা দিতে চাই। কিন্তু ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলে, আমার জমি যে খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত ওই খতিয়ানে থাকা সব দাগের (মোট ৯ একর) খাজনা নাকি আমাকে দিতে হবে। আমি এর প্রতিবাদ করায় আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর করা হয়েছে।’তিনি বলেন, ‘বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জমির খাজনা দেওয়ার এই কালাকানুন পরিবর্তন করার জন্য এবং মানুষকে সচেতন করার জন্য উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে একটি ভ্যানের ওপর চড়ে মাইকে বক্তব্য রাখছিলাম। তখন ভূমি অফিসের লোকজন আমাকে তুলে নিয়ে ইউএনও অফিসে যায়। সেখানে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করার একপর্যায়ে ইউএনও আমাকে লক্ষ্য করে পেপারওয়েট ছুঁড়ে মারেন। পেপার ওয়েটটি আমার বুকে এসে লাগে। ইউএনও রুমে থাকা অন্যান্য লোকজন আমাকে মারধর করে।’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বদলগাছীর ইউএনও ইসরাত জাহান ছনি মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘তাকে আমার অফিসে ডেকে আনা হয়েছিলো জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। তিনি কার প্ররোচনায় মাইকিং করছিলেন সেটি জানার জন্য। তিনি যে আইনের ভুক্তভোগী সেটা তো ইউএনও বা এসিল্যান্ড তৈরি করেননি। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তার গায়ে পেপার ওয়েট ছুড়ে মারা বা মারধর করার কোনো ঘটনা ঘটেনি।’এদিকে আসাদুজ্জামান নামের ওই ব্যক্তিকে মারধর ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গতকাল বুধবার বিকেলে খাজনা দেওয়ার নিয়ম পরির্তনের দাবিতে তিনি যে মাইকিং করছিলেন তাঁর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছড়িয়ে পড়েছে। খাজনা দেওয়ার এই আইনের সংশোধনের জন্য মাইকিং করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই তাঁর প্রশংসা করছেন এবং তাঁকে তুলে নিয়ে মারধর করায় প্রতিবাদ জনাচ্ছেন।ওই ভিডিওতে আসাদুজ্জামানকে উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে একটি ভ্যানের ওপর বসে মাইকে সর্বসাধারণের উদ্দেশ্য কথা বলতে দেখা যায়। তাকে বলতে শোনা যায়, নিজেরা ইচ্ছামতো আইন করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। তারই প্রতিবাদে রজনীগন্ধা ফাউনন্ডেশন ইউএনওর কাছে স্বারকলিপি প্রেরণ করবে। স্মারকলিপির বিষয়বস্তু, বাংলাদেশের ভূমি আইনে যেকোনো জমির একটি খতিয়ান নম্বর থাকে। সেই খতিয়ানে অনেকগুলো দাগ নম্বর থাকে এবং এই দাগ নম্বরে অনেকগুলো জমির সমিষ্টি থাকে। ধরে নিন ৮২ নম্বর খতিয়ানে ৩০২ নম্বর দাগে আমার পাঁচ কাঠা জমি আছে। এই পাঁচ কাঠা জমি যেকোনো কারণেই হোক আমি যদি বিক্রি করতে যাই। তাহলে ভূমি অফিসকে ওই ৮২ নম্বর খতিয়ানের সব জমির খাজনা দিতে হবে। যেটা একজন সাধারণ মানুষের কাছে মরার ওপর খাড়ার ঘা। আমি পাঁচ কাঠা জমির মালিক হয়ে কেন সকল জমির খাজনা দিতে যাবো। এটা কোন আইনের বলে কাদের প্ররোচনায় সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে মোট খতিয়ানের জমির টাকা আদায় করা হয়। মাইকে এসব কথা বলার সময় এক সময় কিছু লোক তাঁকে সেখান থেকে একটি গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যায়। সাদেকুল ইসলাম উজ্জ্বল নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী এক ব্যক্তি বলেন, ‘ওই বৃদ্ধ লোকটি ভূমি অফিসের সামনে ভ্যানে ওপর মাইক ঝুলিয়ে জমির খাজনার আইন পরিবর্তনের জন্য মাইকিং করছিলেন। লোকটি ভালোই কথা বলছিলো। কিন্তু পরে ভূমি অফিসের লোকজন তাঁকে ইউএনও অফিসে তুলে নিয়ে যায় ভ্যান মাইকসহ। পরে শুনলাম তাকে নাকি মারধর করা হয়েছে।’ ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান টুটুল বলেন, ‘একটা অন্যায় নিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করে জনগণকে অবহিত করার জন্য যখন মাইকিং করছিলাম এবং স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন এসিল্যান্ডের ড্রাইভার তাঁর গাড়িতে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে ইউএনওরর রুমে আমাকে নিয়ে যায়। সেখানে কথা বলতে বলতে কুত্তার বাচ্চা ও দালাল বলে ইউএনও ওয়েট পেপার ছুড়ে মারে। ওয়েট পেপারটা আমার বুকে এসে লাগে। পরে আমি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছি। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যদি ওয়েট পেপার ছুঁড়ে মেরে আহত করেন, আমি হতবাক হই। আমার চোখে লাগলে কি হতো? ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু ও প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে আমি এর বিচার চাই।’এ বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর আমি নিজে খোঁজখবর নিয়েছি। কিন্তু এর সত্যতা পাইনি। কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে একজন নাগরিককে ইউএনওর মারধরের প্রশ্নই আসে না। আমি এর কোনো সত্যতা পাইনি। আপনারা ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে দেখতে পারেন।’এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
