দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় এখন এক ভিন্ন রকম দৃশ্য চোখে পড়ে। ভোরের সূর্য উঠতেই আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছাতিয়ানগাড় গ্রামের মাঠজুড়ে ফুটে থাকা সূর্যমুখীর ফুলগুলো সূর্যের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। হালকা বাতাসে দুলতে থাকা এই সোনালি ফুল দূর থেকে দেখলেই মনে হয়, পুরো মাঠ যেন সোনার সমুদ্রের সঙ্গে মিলেছে। প্রতিটি ফুল যেন কৃষকের পরিশ্রমের গল্প বলে, আর সেই গল্পই মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে।এই সুন্দর দৃশ্যের পেছনে রয়েছে সরকারি সহায়তা ও কৃষকদের উদ্যম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি (১ম সংশোধিত) প্রকল্প এর আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খানসামা উপজেলায় সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো দেশের ভোজ্য তেলের উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকদের বিকল্প লাভজনক ফসল চাষে আগ্রহী করা।প্রকল্পের অংশ হিসেবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্যাটার্নভিত্তিক একক প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্লটে চাষ করা হচ্ছে উন্নত জাতের হাইসান-৩৬ সূর্যমুখী, যা স্বল্প সময়ে ভালো ফলন দেয় এবং তেলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় কৃষকদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।ছাতিয়ানগাড় গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফা এমনই একটি প্রদর্শনী প্লটে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তিনি জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহায়তায় তিনি চাষ শুরু করেন। শুরুতে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও এখন তার জমিতে ফুটে থাকা ফুল দেখে তিনি আশাবাদী। তার মতে, খরচ তুলনামূলক কম এবং লাভের সম্ভাবনা ভালো। গোলাম মোস্তফার সফলতা দেখে আশপাশের অন্য কৃষকরাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ধান বা অন্যান্য প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি সূর্যমুখী তাদের কাছে নতুন বিকল্প হিসেবে স্বাগত পেয়েছে।কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবছর উপজেলায় মোট ৪ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১.২৫ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর হিসাব অনুযায়ী, উপজেলার মোট উৎপাদনের সম্ভাবনা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫ মেট্রিক টন সূর্যমুখীর বীজ। এটি কৃষকের আয়ের পাশাপাশি তেলের বাজারেও নতুন সম্ভাবনার বার্তা দেয়।উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে মিলিয়ে এই সূর্যমুখীর আবাদ এখন শুধু কৃষকের আয়ের উৎস নয়, বরং দর্শনার্থীরাও এই সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। প্রতিদিন স্থানীয় মানুষ ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা এখানে ভিড় করছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।স্থানীয় বাসিন্দা জহুরা বেগম বলেন, রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ চোখে পড়ল এই সূর্যমুখীর মাঠ। এত সুন্দর লাগছিল যে থেমে দাঁড়াতে না পারলে হতো না।আর স্বনালী আক্তার করেন, পরিবার নিয়ে এখানে এসে খুব ভালো লাগল। ফুলগুলো মনকে শান্তি দেয়, আর দেখতে এত সুন্দর যে সময় কেটে গেছে বুঝতেই পারিনি।কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠে গিয়ে কৃষকদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। জমি প্রস্তুত, বীজ বপন, সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ—সব বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে করে নতুন কৃষকরাও সহজে এই চাষে যুক্ত হতে পারছেন।এ বিষয়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম বলেন, হাইসান-৩৬ জাতের সূর্যমুখী কম খরচে ভালো ফলন দেয়। সঠিকভাবে চাষ করলে কৃষকরা সহজেই লাভবান হতে পারবেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে আরও বেশি কৃষক এই চাষে আগ্রহী হন।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে সূর্যমুখী একটি সম্ভাবনাময় তেলজাতীয় ফসল। এটি দেশের ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়ে উৎসাহিত করছে, যাতে তারা নিরাপদ ও লাভজনকভাবে এই ফসল চাষ করতে পারেন।সব মিলিয়ে, খানসামায় সূর্যমুখী চাষ এখন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এটি শুধু কৃষকের আয়ের পথ বাড়াচ্ছে না, বরং গ্রামীণ পরিবেশেও এনে দিয়েছে নতুন সৌন্দর্য। সোনালি ফুলের হাসিতে ভরে উঠছে মাঠ, আর সেই হাসি দেখেই বদলে যাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য। আশা ও সম্ভাবনার এই চাষ যেন খানসামার কৃষি জীবনে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
