ঈদ মানেই যেন নতুন পোশাকের আনন্দ। সারা বছর না হলেও ঈদে সবাই চায় নতুন জামা-জুতা। উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত সবাই চায় তার সর্বোচ্চটা দিয়ে নিজেকে রাঙাতে। তবে এই উৎসবের আনন্দ যখন আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে চায় তখন ত্রাতা হয়ে দাঁড়ায় ফুটপাতের দোকানগুলো। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের ফুটপাতের দোকানগুলো এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ঈদ কেনাকাটার প্রধান ভরসাস্থল। ফুটপাতের এই বাজারগুলো শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, এটি বিত্তহীন মানুষদের রুটিরুজি ও ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যম। অনেকেরই সাধ্য ও সাধের সমন্বয় ঘটে এই ফুটপাথেই। পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জের ফুটপাতগুলোতে জমে ওঠেছে কেনাকাটা। উচ্চবিত্তরা নামিদামি শপিংমল থেকে কেনাকাটা করলেও নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা হয়ে ওঠেছে শহরের ফুটপাতের দোকানগুলো। ধনীদের অধিকাংশই ইতোমধ্যে কেনাকাটা সেরে নিয়েছে। আর শেষ মুহূর্তে এসে কেনাকাটা করছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা।ঈদের আগে চাকরিজীবীরা হাতে পেয়েছেন বেতন ও বোনাস। বিভিন্ন পেশার মানুষও সারা বছর কিছু টাকা সঞ্চয় করে রাখেন। সেই অর্থ দিয়েই পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন জামাকাপড় ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনছেন তারা। তবে, বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেকের পক্ষেই বড় মার্কেটে কেনাকাটা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে, ফুটপাতের স্বল্পমূল্যের কাপড় ও পণ্যের দোকানগুলোই তাদের কাছে ‘গরিবের মার্কেট’ হিসেবে পরিচিত এসব ফুটপাতের দোকানগুলো এখন ঈদের কেনাকাটার অন্যতম ভরসা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বড় শপিংমল বা অভিজাত মার্কেটের বদলে ফুটপাতেই খুঁজছেন সাধ্যের মধ্যে ঈদের পোশাক।ক্রেতারা জানান, সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কিনতে চান। আর সেই চাহিদা পূরণে ফুটপাতের দোকানগুলোতে পণ্যের বাজার স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এক ধরনের স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার দাম বেশি রাখা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন মধ্যম আয়ের ক্রেতারা। তারা কিছুটা কম দামে পেতে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছুটে বেড়াচ্ছেন। এদিকে বিক্রেতারা বলছেন, ঈদের মৌসুম তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। অনেকেই সারা বছর অপেক্ষা করেন এই সময়ের জন্য। ঈদের আগে কয়েক সপ্তাহের ব্যবসাতেই তাদের বছরের বড় অংশের আয় হয়ে যায়। ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ভাগাভাগি করে নেওয়ার ইচ্ছা থাকে। কিন্তু গত বছরের চেয়ে এবার পাইকারিভাবে বাড়তি দামে বিভিন্ন পোশাক কিনতে হয়েছে। এতে খুচরা ক্রেতা পর্যায়ে দাম বেড়েছে। তবে ঈদের সময় ঘনিয়ে আসায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে ঈদের কেনাকাটা। দাম একটু বেশি থাকলেও আশানুরূপ বিক্রি হচ্ছে। এতে খুশি দোকানিরা। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) রাতে সরেজমিনে জেলা শহরের গৌরাঙ্গ বাজার, রথখলা ও তেরিপট্টি এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাতের সারি সারি অস্থায়ী দোকানে সাজানো রয়েছে শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, শিশুদের পোশাক এবং বিভিন্ন ধরনের জুতা-স্যান্ডেল। দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের জন্য একসঙ্গে কয়েকটি পোশাক কিনছেন। অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ফুটপাতের এই বাজারই হয়ে উঠেছে ঈদের কেনাকাটার প্রধান ভরসা। শপিংমল বা বড় দোকানের তুলনায় অনেক কম দামে পোশাক পাওয়ায় মানুষ এসব দোকানের দিকে ঝুঁকছেন তারা। চার শো থেকে শুরু করে ছয়শো টাকায় শার্ট, প্যান্ট ও পাঞ্জাবি মিলছে ফুটপাতের দোকানগুলোতে। আবার হাজার টাকার পোশাকও মিলছে এখানে। দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের দর কষাকষি চললেও ক্রেতারা কিনে নিচ্ছেন পছন্দের পোশাক। ঈদ সামনে রেখে রাতেও এসব দোকানগুলোতে কেনাকাটার ভিড় বাড়ছে। দোকানগুলোও রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে ফুটপাতের এই জমজমাট বাজার পথচারীদের জন্য কিছুটা ভোগান্তির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় দোকান বসানোর কারণে ফুটপাত সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে পথচারীদের চলাচলে সমস্যাও হচ্ছে।ছেলেমেয়ের জন্য ফুটপাত থেকে প্যান্ট আর থ্রি-পিস কিনতে আসা রিতু আক্তার বলেন, ফুটপাত বলেই যে কাপড় খারাপ বিষয়টা তা নয়। দেখে-শুনে কিনতে পারলে এখান থেকে অল্প দামে অনেক ভালো জামা-কাপড় কেনা যায়। আমার ছেলে তায়েফের জন্য একটা প্যান্ট কিনেছি ৪০০ টাকায়। শপিং মলে ঢুকলে এই প্যান্টের দাম কম করে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা হতো। কারণ তাদের আবার বাড়তি খরচ আছে। মেয়ের জন্য একটা থ্রি-পিস কিনেছি ৪০০ টাকায়। এই থ্রি-পিস দোকান থেকে নিলে আরও চারশো টাকা বাড়তি দিয়ে নিতে হতো। তাহলে আমি ফুটপাতে যখন সস্তায় ভালো জিনিস নিতে পারছি শুধু শুধু শপিং মলে গিয়ে টাকা নষ্ট করার কোনও মানে নেই।তিনি আরও বলেন, এখন সবকিছুর দাম বাড়তি। একজনের আয় দিয়ে সংসারের খরচ চালানো অনেক কষ্টের। মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় করলেও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। সংসারের খরচ, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ দিতেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ঈদ এলে ছেলেমেয়ে নতুন জামা কাপড় না পেলে মন খারাপ করে ফেলে। এজন্য যাই কিছু হোক নতুন কাপড় কেনার চেষ্টা করি। ফুটপাত থেকে কাপড় কিনতে হলে দোকানদারের সঙ্গে একটু বেশি দামাদামি করতে হয়। মাঝেমধ্যে কটু কথাও শুনতে হয়। তবে এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে ফুটপাত আছে বলেই অন্তত আমাদের মতো পরিবারের শখ-আহ্লাদ কিছুটা পূরণ হয়।দুলাল মিয়া নামে একজন ক্রেতা বলেন, ফুটপাত থেকে সস্তায় কেনাকাটা করা যায়। তাই আমার ছেলেকে নিয়ে এসেছি তার পছন্দের পোশাক কিনতে। তার জন্য একটা হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি কিনেছি। সঙ্গে নতুন জুতাও নিয়েছি। এখন তার মায়ের জন্যও কিনবো। গত ঈদেও তাকে কিছু দেওয়া হয়নি। তাই এই ঈদে সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন একটা শাড়ি দেবো। নিজের জন্য কী কিনেছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দেখি কী কেনা যায়! আগে পরিবারের সবার কেনাকাটা শেষ করি তারপর।ক্রেতা মিজান বলেন, আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করি আমার বেতন খুব বেশি না। শপিংমল থেকে সবাইকে ঈদের কাপড় কিনে দেওয়া সম্ভব না। তাই প্রতি বছরই ফুটপাত থেকে কিনি। এখানে কম দামে মোটামুটি ভালো পোশাক পাওয়া যায়। এবার আমার জন্য একটি শার্ট এবং ছেলের জন্য একটি প্যান্ট কিনেছি। সব মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৮০০ টাকা।শহরের বিভিন্ন জায়গায় ভ্যানে করে শিশুদের পোশাক বিক্রি করেন হারুন মিয়া। তিনি বলেন, দিনমজুর, রিকশাচালক ও নিম্নআয়ের মানুষ আমাদের এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। আবার মধ্যবিত্তরাও আসেন। অনেক মধ্যবিত্ত মানুষ আছেন, যারা বেতনে কুলাতে পারেন না, আর্থিক সামর্থ্য কম। তারা এখানে কেনাকাটা করতে আসেন।তেরিপট্টি এলাকার ফুটপাতের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ কাঞ্চন মিয়ার বলেন, ঈদের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ক্রেতাদের ভিড় ততই বাড়ছে। ‘আমাদের দোকানে বেশির ভাগই স্টকলট আর রিজেক্ট পণ্য। বড় বড় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে এগুলো পাইকারি দামে কিনে এনে বিক্রি করি। নতুন মার্কেটের তুলনায় এখানে দাম অনেক কম। তাই গরিব মানুষ বেশি আসে। একটি ব্র্যান্ডেড শার্ট যেখানে শপিংমলে দুই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে ফুটপাতে একই ধরনের স্টকলট শার্ট ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়।’গৌরাঙ্গ বাজার এলাকার ফুটপাতের ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, ফুটপাতে অল্প টাকায় ইচ্ছে পূরণ করা যায়। নিজের পছন্দ মতো পোশাক পাওয়া যায়। এজন্য নিম্ন আয়ের মানুষের প্রথম পছন্দ ফুটপাত। তবে শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ ফুটপাত থেকে পোশাক কিনে বিষয়টা এমন না, অনেকে ভিআইপি গেটাপ নিয়েও ফুটপাত থেকে কেনাকাটা করেন। গত এক সপ্তাহে আমি মোটামুটি ভালো বেচাকেনা করেছি। প্রতিদিন ন্যূনতম ১৫-২০ হাজার টাকার বেচাকেনা হয়েছে। গত দুই দিন একটু বেশি হয়েছে। আজকেও বেশ ভালো বেচাকেনা হচ্ছে। আশা করি বৃষ্টি না হলে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত এমন চলবে।ঈদের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বাড়বে ক্রেতাদের ভিড়। আর সেই ভিড়ের মধ্যেই জীবিকার আশা খুঁজে নেন ফুটপাতের হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাদের প্রত্যাশা, অন্তত ঈদের এই মৌসুমে ভালো বিক্রি হবে, কিছুটা স্বস্তি মিলবে সংসারের খরচ মেটাতে।পিএম

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
হুঁশ ফিরেছে নুরের
হুঁশ ফিরেছে নুরের

Source: রাইজিং বিডি

শাহজাদপুরে ট্যাংকলরির ধাক্কায় পশু চিকিৎসকের মৃত্যু
শাহজাদপুরে ট্যাংকলরির ধাক্কায় পশু চিকিৎসকের মৃত্যু

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ট্যাংকলরির ধাক্কায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার যাত্রী সঞ্জয় কুমার সুত্রধর জীবন (৩০) নামে এক পশু চিকিৎসক নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে থাকা Read more

যুক্তরাষ্ট্র স্থল হামলা চালালে আমিরাতকে তছনছ করা হবে
যুক্তরাষ্ট্র স্থল হামলা চালালে আমিরাতকে তছনছ করা হবে

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে স্থল হামলা চালায় তাহলে Read more

ইরান যুদ্ধ শেষে ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র
ইরান যুদ্ধ শেষে ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে যখন যুদ্ধ শেষ হবে তখন ন্যাটোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র তার সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। Read more

১১ বছর পর চাকরি ফিরে পেলেন জামায়াত নেতা
১১ বছর পর চাকরি ফিরে পেলেন জামায়াত নেতা

২০১৪ সালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে চাকরি হারিয়েছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের জয়েন্ট সেক্রেটারি মাওলানা জহিরুল ইসলাম। তখন তিনি বাঁশখালী Read more

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সীমিত করা হবে না: ইরান
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সীমিত করা হবে না: ইরান

যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলছে যে, ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে দেবে না বা সমৃদ্ধ করতে দেবে না। এমনকি চলমান শান্তিচুক্তির আলোচনারও অন্যতম Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন