উৎসবের আলো, প্রিয়জনের সান্নিধ্য আর আনন্দঘন পরিবেশ, পবিত্র ঈদুল ফিতরের এমন চিরচেনা আবহ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতায় দিনটি কাটাতে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-এ বন্দি হাজারো মানুষ। উঁচু প্রাচীর, লোহার গরাদ আর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতর সীমাবদ্ধ জীবনে ঈদ তাদের কাছে এক ভিন্ন অনুভূতির নাম, যেখানে আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে বেদনা, স্মৃতি আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস।কারাগার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এই কারাগারে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ বন্দি রয়েছেন, যা ঈদের দিন নাগাদ ছয় হাজারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এদের মধ্যে রয়েছেন দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত আসামি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি এবং বিচারাধীন মামলার অভিযুক্তরা। নারী বন্দির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য—মোট ২১২ জন নারী এই কারাগারে অবস্থান করছেন। পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তাদের জন্য ঈদের দিনটি হয়ে ওঠে আরও বেশি আবেগঘন ও নিঃসঙ্গ।তবে সীমাবদ্ধ এই বাস্তবতার মধ্যেও বন্দিদের ঈদকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক করে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানিয়েছেন, ঈদের দিন বন্দিদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দিনের শুরুতে পায়েস ও মুড়ি পরিবেশন করা হবে। দুপুরে থাকবে পোলাও, গরুর মাংস, মুরগির মাংস, সালাদ ও মিষ্টি। রাতের খাবারে থাকবে সাদা ভাত, মাছ ভাজা ও আলুর দম। এছাড়া পান-সুপারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যা বন্দিদের মাঝে উৎসবের আবহ তৈরি করতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ হিসেবে ঈদের দিন কারাগারের ভেতরে তিনটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে, যার প্রথমটি সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নামাজের এই আয়োজন বন্দিদের মানসিক প্রশান্তি এনে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।ঈদকে ঘিরে বন্দিদের জন্য আরও কিছু মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদের পরদিন বন্দিরা তাদের পরিবারের পাঠানো ঘরের রান্না করা খাবার খাওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি ঈদের দিন থেকে পরবর্তী তিন দিন স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ থাকবে। একই সময়ে প্রত্যেক বন্দিকে প্রতিদিন পাঁচ মিনিট করে কারাগারের নির্ধারিত ফোন থেকে স্বজনদের সঙ্গে বিনামূল্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে, যা তাদের মানসিক স্বস্তি অনেকটাই বাড়াবে।যদিও কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো ঈদ উপহার প্রদান করা হচ্ছে না, তবুও বন্দিদের আত্মীয়-স্বজনরা নতুন পোশাকসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কারাগারে পৌঁছে দিতে পারবেন। এ ধরনের সুযোগ বন্দিদের জন্য ঈদের আনন্দের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।এদিকে, এবারের ঈদে এই কারাগারে কোনো ভিআইপি বন্দি নেই বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন মাত্র দুইজন। তাদের একজন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস, যিনি একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অপরজন ইয়াছিন রহমান টিটু, যিনি আলোচিত জিবরান তায়েবি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।সব মিলিয়ে, বাইরের পৃথিবীর উৎসবমুখরতা থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে ঈদ থেমে থাকে না। সীমাবদ্ধতার দেয়াল পেরিয়ে সামান্য আনন্দ, কিছুটা স্বস্তি আর স্বজনদের কণ্ঠস্বর, এই ছোট ছোট প্রাপ্তিগুলোই বন্দিদের জন্য হয়ে ওঠে ঈদের প্রকৃত অনুষঙ্গ। এই নীরব উৎসব যেন মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য এবং মানুষের জীবনে পরিবার ও সম্পর্কের গভীর তাৎপর্য।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
