ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর পৌর শহরে দেখা মেলে অটোরিকশা ও ভ্যানচালকদের ব্যস্ততা। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত পৌর শহরের সরু রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ায় চালকরা। কিন্তু তাঁদের অনেকেই স্টিয়ারিং বা হ্যান্ডেলের পেছনে বসার আগে নেননি আনুষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ। সেই অভিজ্ঞতার ঘাটতি আর অনিয়ন্ত্রিত চলাচল প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এই বাস্তবতা বদলাতে এবার ভিন্ন পথে হাঁটছে ভূঞাপুর পৌরসভা।পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাজিব হোসেনের উদ্যোগে চালকদের দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়াতে পৌরসভা চালু করতে যাচ্ছে মৌলিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা ব্যবস্থা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চালকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বিশেষ ‘ড্রাইভিং কার্ড’। আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে এই কার্ড ছাড়া পৌরসভার ভেতরে কোনো অটো বা ভ্যান চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। ‘নো কার্ড, নো ড্রাইভ’, এই স্লোগানকে সামনে রেখে শুরু হচ্ছে উদ্যোগটি।পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং চালকদের সচেতন করা এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। নভেম্বর মাসজুড়ে ব্যাচভিত্তিক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের শেখানো হবে সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক আইন, গাড়ি নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, যাত্রী ও পথচারীর প্রতি দায়িত্ববোধসহ পেশাগত আচরণ। প্রশিক্ষণ শেষে মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। যারা উত্তীর্ণ হবেন, তাঁদের দেওয়া হবে পৌরসভা স্বীকৃত ‘ড্রাইভিং কার্ড’।প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে ভূঞাপুর পৌরসভা, তবে প্রশিক্ষক থাকবেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকরা। প্রতি ব্যাচে ১০০ জন করে চালক অংশ নেবেন। কেউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে তিনবার পর্যন্ত পুনরায় সুযোগ পাবেন।জানা গেছে, বর্তমানে ভূঞাপুর পৌরসভায় অনুমোদিত অটোরিকশা ও ভ্যানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাতশ। এসব যানবাহন প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়। রিনিউ ফি হিসেবে অটোরিকশার জন্য এক হাজার টাকা এবং ভ্যানের জন্য চারশ টাকা নির্ধারিত। এ হিসাবে বছরে পৌরসভা রাজস্ব পায় অন্তত ছয় লাখ টাকা। তবে বাস্তবে পৌর এলাকায় চলাচল করছে অন্তত আড়াই থেকে তিন হাজার যানবাহন। সব যানবাহন নিবন্ধনের আওতায় এলে চালকদের সচেতন করার পাশাপাশি এই খাত থেকে বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাজিব হোসেন সময়ের কণ্ঠস্বর-কে বলেন, ‘চালকদের দক্ষতা বাড়ানো এবং সড়কে শৃঙ্খলা আনাই আমাদের মূল লক্ষ্য। যারা পৌরসভাকে রাজস্ব দিচ্ছে, তাদের জন্য কিছু করা আমাদের দায়িত্ব। তাই রাজস্বের একটি অংশ তাদের উন্নয়নে ব্যয় করা হচ্ছে।’তিনি আরও বলেন, ‘অনেক চালক শিক্ষিত নন, তাই লিখিত নয়, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। যারা উত্তীর্ণ হবে, তাদের গলায় ঝুলবে ড্রাইভিং কার্ড। এটি থাকলে বোঝা যাবে চালক প্রশিক্ষিত ও নিয়ম-কানুন জানা।’রাজিব হোসেন জানান, ‘কেউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বা রেজিস্ট্রেশনের আওতায় না এলে পৌরসভার বাইরে, অর্থাৎ ইউনিয়ন এলাকায় গাড়ি চালাতে পারবে। তবে পৌরসভার মধ্যে চালাতে হলে ড্রাইভিং কার্ড বাধ্যতামূলক।’প্রশিক্ষণের লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘চালকদের রোড সাইন চিনতে শেখানো, গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করা, কখন গাড়ি ঘোরাতে হবে এবং সড়ক পরিবহন আইনের প্রযোজ্য অংশগুলো জানা, এসব নিয়েই আমাদের কোর্স সাজানো হয়েছে। যেহেতু এই গাড়িগুলোতে প্রতিদিন মানুষ ওঠে, তাই ন্যূনতম ড্রাইভিং সেন্স না থাকলে দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন।’ভূঞাপুর পৌরসভার এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন স্থানীয়রা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে প্রশংসা ও আলোচনা। অনেকেই এটিকে ‘সময়োপযোগী ও মানবিক সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। চালকদের সচেতন করার মাধ্যমে দুর্ঘটনা কমবে, শহরের সড়ক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরবে, এটাই স্থানীয়দের মূল প্রত্যাশা।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
