বাংলাদেশের বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানই এখন বন ধ্বংসের মূল মঞ্চে পরিণত হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থার ভেতরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যারা গাছ নয়, বরং টাকার বনে ফল ফলাচ্ছে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি থেকে শুরু করে প্রকল্পের বরাদ্দ- সবখানেই চলছে গোপন দরকষাকষি, ঘুষ আর তদবির বাণিজ্য।জানা গেছে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বন অধিদপ্তরটি এখন কার্যত এক দুর্নীতির দুর্গে পরিণত হয়েছে। ডিএফও থেকে শুরু করে বিট কর্মকর্তার পর্যায় পর্যন্ত- সব স্তরেই চলছে ভয়াবহ বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য। বন রক্ষার নামে একের পর এক প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও, সেসব প্রকল্প এখন কেবল টাকা লুটপাটের উৎসে পরিণত হয়েছে। নিয়োগ, বদলি ও টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা উপার্জনই যেন সিনিয়র কর্মকর্তাদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, আলোচনার বাইরে থাকা এই দপ্তরে কয়েক বছর চাকরি করেই অনেক কর্মকর্তা হয়ে যাচ্ছেন বাড়ি-গাড়ির মালিক, এমনকি বিদেশেও কিনছেন সম্পদ।অভিযোগ আছে, অবৈধ অর্থ পাচার হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে। অনেকেই বলছেন- যদি বন অধিদপ্তরের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়, তবে আলোচিত ওসমান গনির টাকার বস্তার মতো দৃশ্য এখানেও দেখা যাবে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, অর্থের বিনিময়ে বহিষ্কৃত ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি থেকে শুরু করে ফরেস্টারদের বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জের দায়িত্বে বসানো হচ্ছে। কেউ বেশি টাকা দিতে পারলে নিজের এলাকায়ই পাচ্ছেন পোস্টিং, কেউ বা একই স্টেশনে বছরের পর বছর বসে আছেন। একাধিক কর্মকর্তার ভাষায়, ‘বন বিভাগে এখন টাকা ছাড়া কোনো কাজই হয় না- নিয়োগ থেকে বদলি, সবকিছুরই আলাদা দাম নির্ধারিত।’অভিযোগ উঠেছে, এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেন চৌধুরী, উপপ্রধান বন সংরক্ষক মঈনুদ্দিন খান এবং সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক বহুল বিতর্কিত মো: তৌফিকুল ইসলাম। তাদের যোগসাজশেই বন অধিদপ্তরের প্রশাসন এখন এক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। কর্মকর্তা বদলি, পদোন্নতি কিংবা নতুন নিয়োগ- সব ক্ষেত্রেই নির্ধারক হয়ে উঠেছে আর্থিক লেনদেন। অভিযোগ আছে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতির পেছনে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে এই সিন্ডিকেটের ছায়ায়।সাম্প্রতিক ডেপুটি রেঞ্জার পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পর এই সিন্ডিকেটের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পদোন্নতি কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন উপপ্রধান বন সংরক্ষক মঈনুদ্দিন খান এবং সদস্য সচিব সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক তৌফিকুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রত্যক্ষ তদবিরে সিন্ডিকেটের ইচ্ছামতো কর্মকর্তাদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়। সিনিয়রদের উপেক্ষা করে জুনিয়রদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিনিময়ে হাতবদল হয়েছে মোটা অঙ্কের ঘুষ। এমনকি বরখাস্ত, মামলাজট ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদেরও বিপুল অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।জানা গেছে, প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেন চৌধুরী আইনি পরামর্শ উপেক্ষা করে ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট সদস্যদের মাধ্যমে পুরো পদোন্নতি প্রক্রিয়াটি অনুমোদন করেন। ‘সময়ের কণ্ঠস্বর’-এর তিন পর্বের ধারাবাহিক অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে উঠে এসেছে, কীভাবে এই সিন্ডিকেট বন অধিদপ্তরের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির প্রক্রিয়াকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ভয়াবহ দুর্নীতির জাল বিস্তার করেছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ৪৫৪ জনের ‘ডেপুটি রেঞ্জার’ পদোন্নতি তালিকায় ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন অর্ধশতাধিক বন কর্মকর্তা। পরে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মামলাজট, বরখাস্ত ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তারাও বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি পেয়েছেন—যা বন অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে বিস্তৃত দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার ভয়াবহ বাস্তবতা উন্মোচন করেছে।খান জুলফিকার আলী নামে এক বন কর্মকর্তা ২০২৩ থেকে ২৫ পর্যন্ত সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। অভিযোগ আছে, বিপুল অর্থের বিনিময়ে বরখাস্ত প্রত্যাহার করে তাকে রাতারাতি পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।মোহাম্মদ সুলতানুল আলম চৌধুরী। কক্সবাজারের মহেশখালী ইউসুফ হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি (মামলা নং সিআর ১৩৫/২০)। অভিযোগ উঠেছে, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে তিনিও পদোন্নতি পান।মামলার বাদী নেজাম উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী যিনি, তার বিরুদ্ধেই এখন আদালতে মামলা চলছে। অথচ সেই অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে টাকার জোরে বাঁচাতে প্রধান বন সংরক্ষক ও তার সিন্ডিকেট একের পর এক নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। শুধু তাই নয়, পরে তাকেই বিপুল অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে- যা বিচার ও প্রশাসনের প্রতি এক চরম উপহাস।’চিন্ময় মধু নামে আরেক বন কর্মকর্তাও দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় অভিযুক্ত। দুদক তার ও পরিবারের নামে থাকা ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ও ১৫০ ভরি স্বর্ণ জব্দ করেছে। সেই মামলার বিচার চলমান থাকা সত্ত্বেও প্রায় কোটি টাকার বিনিময়ে তাকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।পদোন্নতি পাওয়া বাগেরহাটের রেঞ্জ কর্মকর্তা চিন্ময় মধু সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তবে সেটি এখন তদন্তাধীন।’ তবে মামলার তদন্ত চলাকালীন কিভাবে পদোন্নতি পেয়েছেন তা তিনি ব্যাখ্যা করতে পারেননি।এছাড়াও বন কর্মকর্তা নিশিকান্ত মালাকার গাছ পাচার ও জমি দখল মামলায় ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বরখাস্ত ছিলেন। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাকেও রাতারাতি পদোন্নতি দেওয়া হয়।এখানেই শেষ নয়! আব্দুর রউব নামের একজনকে মৃত্যুর পরও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে বন অধিদপ্তরের ভেতরে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে বিষয়টি ঢাকতে তড়িঘড়ি করে পদোন্নতির তালিকা সংশোধন করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।আইনি নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় সরকারি কর্মবিধি ও জ্যেষ্ঠতা নীতিমালা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রকাশিত হওয়া ২০১৬ সালের গ্রেডুয়েশন তালিকাও এখানে মানা হয়নি। পরবর্তীতে ২০২০ সালের কোনো গ্রেডুয়েশন তালিকা প্রকাশ করা না হলেও চলতি বছরে এসে ২০২০ সালের পদোন্নতি দেখানো হয় একাধিক কর্মকর্তাকে। এছাড়া তালিকায় ডিপ্লোমা কোর্সের যোগ্যতা এবং প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতাকেও অবজ্ঞা করা হয়েছে।নিয়মানুযায়ী, পদোন্নতি তালিকায় নাম থাকা প্রত্যেক কর্মকর্তার কাছে গ্রেডুয়েশন তালিকা ডাকযোগে পৌঁছানোর বিধান রয়েছে। তবে ২০২৫ সালে গ্রেডুয়েশন তালিকা নামমাত্র ওয়েবসাইটে প্রকাশ করলেও সেই খবর কেউ জানেননা বলে জানিয়েছেন একাধিক বন কর্মকর্তা। এভাবেই মনগড়া তালিকা তৈরি করে নিজেদের পছন্দমতো নাম যুক্ত করা হয়েছে- আর সেই সুযোগে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ‘পদোন্নতি কমিটি’ নামের এই প্রভাবশালী চক্র। অভ্যন্তরীণ নথি বলছে, প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেন চৌধুরীর স্বাক্ষরে কাগজে অনুমোদন দেওয়া হলেও পুরো প্রক্রিয়ার ‘মেকানিজম’ পরিচালনা করেন সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক তৌফিকুল ইসলাম। আর নির্ধারিত কমিশনের নিশ্চয়তায় নীরব ভূমিকা রাখেন উপপ্রধান বন সংরক্ষক মঈনুদ্দিন খান।যদিও একাধিক কর্মকর্তা ইতোমধ্যে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। মামলার শুনানি আগামী ৫ নভেম্বর নির্ধারিত আছে বলে জানিয়েছেন বন অধিদপ্তরের কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তা।সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়:অনুসন্ধানে জানা গেছে, সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তৌফিকুল ইসলামের অপকৌশল ব্যবহার করে একেরপর এক নিয়োগ, পদোন্নতি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এর আগে ওয়ান-ইলেভেনের সময় আলোচিত ‘বনের রাজা’ ওসমান গনির উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তাকে পদোন্নতি কমিটির সদস্য সচিব পদে বসানো হয়- যা বন অধিদপ্তরের ভেতরে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। কর্মজীবনের শুরু থেকেই নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকা তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, বদলি বাণিজ্য ও প্রভাব খাটানোর অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তবুও তাকে সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক পদে পদায়ন করা হয়, যা সিন্ডিকেটের প্রভাব ও দুর্নীতির গভীর শিকড়ের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।সম্প্রতি ২৮৬ জন ফরেস্ট গার্ড (বন প্রহরী) নিয়োগেও প্রার্থীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয় বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ বাণিজ্যের এই অর্থ সিন্ডিকেটভুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগাভাগি করা হয়।সূত্রের দাবি, সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক তৌফিকুল ইসলাম বন অধিদপ্তরে যোগদানের আগে থেকেই নানা জেলায় দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগ, রাঙামাটি, ভোলা ও সিলেটসহ একাধিক স্থানে তার কর্মকাণ্ড ঘিরে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে।জানা যায়, পদোন্নতি সিন্ডিকেটের ঘুষ লেনদেনের মূল মাধ্যম হিসেবেও কাজ করেছেন তৌহিদুল ইসলাম। তার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে, যা বন অধিদপ্তরের দুর্নীতির চক্রকে আরও শক্তিশালী করেছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়েও চলছে ব্যাপক অনিয়ম। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ আসে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার সামান্য অংশও ব্যয় হয় না। বরাদ্দের বড় অংশ ভাগ হয়ে যায় সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠ মহলে। অভিযোগ আছে, কিছু পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে গাছ লাগানো বা সংরক্ষণের কাজ কাগজে-কলমে দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতক্ষীরার সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগে এসিএফ থাকা অবস্থায় তিনি মাসে তিন হাজার লিটার জ্বালানি তেল আত্মসাৎ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি স্টেশন থেকে মাসে এক লাখ টাকা করে চাঁদা নিতেন। ওই সময় থেকেই তার দুর্নীতির কৌশল শুরু হয়, যা পরবর্তী প্রতিটি কর্মস্থলে ছড়িয়ে পড়ে।এছাড়াও ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালে রাঙামাটি দক্ষিণ বনবিভাগে ডিএফও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রায় ২৭ লাখ ঘনফুট ভুয়া গাছের জোত পারমিট দেন। প্রতি ঘনফুটে ২৫০ টাকা করে ঘুষ নিতেন, টিপি (পরিবহন পারমিট) প্রতি গাড়িতে ১২,৫০০ টাকা করে আদায় করতেন। শুধু জোত বাণিজ্য থেকেই হাতিয়ে নেন আনুমানিক ৬৭ কোটি টাকার বেশি। অভিযোগ আছে, তৎকালীন সময়ে অনিয়মের প্রমাণ মুছে ফেলতে তিনি ডিভিশনের নথিতে ‘আগুন’ লাগিয়ে দেন এবং সেটিকে দুর্ঘটনা বলে প্রচার করেন।অন্যদিকে, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালে ভোলা উপকূলীয় বনবিভাগে দায়িত্বে থাকাকালে ৫,৫০০ হেক্টর বনায়ন প্রকল্পের প্রতিটি বরাদ্দ থেকে ৪০ শতাংশ করে অর্থ আত্মসাৎ করেন। রেঞ্জ অফিসারদের পোস্টিং বাবদ ১০ লাখ, বিট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। চরাঞ্চলে মহিষ চড়ানো ও জেলে লিজ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য হয় তার ছত্রছায়ায়।পরবর্তীতে ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সিলেট বনবিভাগে দায়িত্বকালেও একই ধারা অব্যাহত থাকে। সেখানে ৪,৫০০ হেক্টর বনায়নের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, ভুয়া জোত ও টিপি বাণিজ্য, এবং বালি-পাথর খাতে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসিক চাঁদা ও পোস্টিং ফি আদায়ের রেকর্ডও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘বনের প্রকৃত রক্ষকরা এখন অবহেলিত, আর সিন্ডিকেটের পছন্দের কর্মকর্তারা পদে পদে পুরস্কৃত হচ্ছেন। বন বিভাগে পদোন্নতির সুপারিশ ও অনুমোদনের তালিকায় নিয়মিত ওঠানামা করছে ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নাম। তাদের দাবি, যারা ঘুষ দিতে ব্যর্থ হন, তাদের বদলি করে দেওয়া হয় দুর্গম অঞ্চলে, আর অনুগতদের স্থান দেওয়া হয় লাভজনক বা রাজধানীকেন্দ্রিক দপ্তরে।’যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন অনেক কর্মকর্তা। তাদের দাবি, সিন্ডিকেটের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে, কেউ ভিন্নমত পোষণ করলেই তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের মামলা, বদলি কিংবা পদাবনতি ঘটে। ফলে, অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বন-কর্মকর্তা জানান, পদোন্নতির আগে গ্রেডুয়েশন তালিকা প্রকাশ করতে হয়। সেই তালিকা প্রত্যেকের কাছে পৌঁছায় এবং যাচাই-বাছাই করে সব কিছু সঠিক থাকলেই পদোন্নতির ফাইনাল তালিকা প্রকাশ করা হয়। এখানে ২০২০ ও ২০২৫ সালে পদোন্নতির গ্রেডুয়েশন তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। হয়তো গোপনে প্রকাশ করলেও কোনো কর্মকর্তার কাছে সেটি পৌঁছাইনি। এমনকী কোন বিজ্ঞপ্তি বা সরকারি ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি।একাধিক বন কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন আর যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা নয়, পদোন্নতির মূল মাপকাঠি হচ্ছে সিন্ডিকেটের অনুমোদন। যে কর্মকর্তা তাদের ‘সন্তুষ্ট’ করতে পারেন, তিনিই অগ্রাধিকার পান।’ তাদের মতে, বন অধিদপ্তর একসময় পরিবেশ রক্ষার প্রতীক ছিল। এখন এটি দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই তিনজন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া এখন কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই হয় না।এসব বিষয়ে জানতে সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক তৌফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাড়া দেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তারিত অভিযোগ পাঠানো হলে তিনি জবাবে জানান, সব পদোন্নতি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়েছে। সেখানে আমি একা নই, আহ্বায়কসহ বেশ কয়েকজন সদস্যের মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।পদোন্নতি কমিটির আহ্বায়ক মো. মঈনুদ্দিন খান সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘আইনি মতামত ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এখানে কমিটির আলাদা কোনো ভূমিকা নেই। কে মামলা বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়টি আমার জানা নেই।’এ বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেন চৌধুরী সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি পাওয়া কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। বিতর্কিত ব্যক্তিদেরও পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। আইনি মতামতে যা উল্লেখ আছে, সেই বিধান মেনেই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।’পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বন অধিদপ্তরে সিন্ডিকেট সংস্কৃতি দেশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা শুধু সরকারি অর্থ নয়, প্রকৃতির ভারসাম্যও নষ্ট করছেন।’ তাদের মতে, এই সিন্ডিকেটকে ভেঙে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ রক্ষার ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে পড়বে।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
