চট্টগ্রামের রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি–এই তিন উপজেলার সীমান্তঘেঁষা হালদা নদীর পশ্চিম পাড়ে একটি বৃহৎ জনপদ ফতেহনগর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা, নদী তীরের উর্বর মাটি আর ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা। সব মিলিয়ে এই গ্রামটি যেন এক অনন্য সাংস্কৃতিক অধ্যায়। কিন্তু এই প্রাচীন জনপদ আজও আধুনিক উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত। নদীর বুকে দঁড়ি টানা নৌকাই এখানকার কয়েক হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকার একমাত্র ভরসা।রাউজানের নোয়াজিশপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত ফতেহনগর গ্রামটির সংযোগ হাটহাজারী ও ফটিকছড়ির লাঙ্গলমোড়া ও ধর্মপুর ইউনিয়নের সঙ্গে। এই তিন উপজেলার মানুষের আত্মীয়তা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যম হালদা নদীর এই ঘাট।আদিকাল থেকেই এই নদী ছিল তিন উপজেলার মানুষের জীবনরেখা। কিন্তু প্রযুক্তি ও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন ঘটলেও ফতেহনগরের ভাগ্যে আসেনি সেই সৌভাগ্য। আজও এখানকার মানুষের যাতায়াত নির্ভর করে সেই পুরোনো দঁড়ি টানা নৌকা আর মৌসুমি বাঁশের সাঁকোর ওপর।হালদা নদীর তীরে এপার-ওপারে টানানো লম্বা দঁড়ি। তার সঙ্গে বাঁধা একটি বড় নৌকা–মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখা যায় প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শত শত মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, গৃহবধূ, এমনকি বৃদ্ধরাও এই নৌকার জন্য অপেক্ষা করছে। এই ঘাট দিয়ে হাটহাজারী, রাউজান ও ফটিকছড়ির হাজারো মানুষের নিত্যদিনের চলাচল।স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর রাউজানের নোয়াজিশপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ঘাটটির ইজারা দেওয়া হয়। চলতি বছর এই ঘাটের বার্ষিক ইজারা মূল্য ৪০ হাজার টাকা। ইজারাদার রুহুল আমিন মাঝি। তার তত্ত্বাবধানে শুষ্ক মৌসুমে নদীর উপর গাছ ও বাঁশের কাঠামোয় নির্মিত হয় অস্থায়ী সাঁকো, যা দিয়ে মানুষ, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা চলাচল করে। প্রতিজন যাত্রীর টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা, আর যানবাহনের জন্য ২০ টাকা।বর্ষা এলে নদীর পানি ফুলে ওঠে, স্রোতের তীব্রতায় ধসে পড়ে এই অস্থায়ী সাঁকো। তখন পারাপারের ভরসা থাকে বড় নৌকা, যা দঁড়ি টেনে চালানো হয়। স্রোতের মাঝে নৌকাটি টেনে ওপারে নেওয়ার দৃশ্য যেন এক টুকরো জীবন্ত ইতিহাস।ইজারাদারের ছেলে নুরুল আজম সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ‘এই ঘাট দিয়েই দিনে প্রায় এক হাজার মানুষ পার হয়। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী–সবাই এই পথেই চলাচল করে। সাঁকো নির্মাণে এবার প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজন দানশীল ব্যক্তি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।’হালদা পাড়ের গ্রামগুলো উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেন একেবারে পিছিয়ে। নোয়াজিশপুর ও ধর্মপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামের রাস্তা এখনো কাঁচা। বর্ষার সময় কাদা আর গর্তে ভরা রাস্তায় চলাচল একপ্রকার দুঃস্বপ্ন।ষাটোর্ধ্ব আবদুস শুক্কুর, যিনি ফটিকছড়ির ধর্মপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা, তিনি নিজ হাতে সাঁকোর বাঁশের পাটাতন তৈরি করছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের রাউজান ও ফটিকছড়ির দিকের রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই করুণ। হাটহাজারীর দিকে উন্নত রাস্তা থাকলেও আমরা অনেকটা বিচ্ছিন্ন। গ্রামের ছেলেমেয়েরা ওপার হয়ে হাটহাজারীর স্কুল–মাদ্রাসায় যায়। বাজার, চিকিৎসা–সব কাজই ওপারের মানুষের সঙ্গে।’ফতেহনগরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মুছা বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষায় স্রোতে ভেসে যায় সাঁকো। তখন নৌকা দিয়েই মানুষ পার হয়। বর্ষা শেষে আবার নতুন সাঁকো তৈরি করতে হয়। এটা আমাদের বার্ষিক বাস্তবতা।’নৌকার মাঝি মোহাম্মদ লিটন জানান, ‘এই পথে প্রতিদিন হাজারেরও বেশি মানুষ যাতায়াত করে। কেউ কাজের খোঁজে, কেউ স্কুল–কলেজে, কেউ বাজারে। নদীর সঙ্গে আমাদের জীবনের সম্পর্ক রক্তের মতোই প্রবাহমান।’স্থানীয় রাজনীতিকদের মতে, হালদা পাড়ের এই অঞ্চলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন অবহেলা চলে আসছে। নোয়াজিশপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপি নেতা নুরুল হুদা বলেন, ‘১৭ বছর ধরে যারা উন্নয়নের নামে লুটপাট করেছে, তারা চাইলে এই বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোর সড়ক ও সেতু নির্মাণ করতে পারতো। কিন্তু তারা করেনি। বিএনপি ক্ষমতায় এলে এই অঞ্চলের উন্নয়ন হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।’রাউজান উপজেলা প্রকৌশলী আবুল কালাম সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি দল হালদা নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাই করে গিয়েছিল। তবে পরে প্রকল্পটির অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।’এসএম
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
