বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু সংসদীয় আসন আছে, যেগুলো শুধু ভৌগোলিক সীমার মধ্যে বন্দী নয় বরং রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক, প্রভাবের কেন্দ্র, ইতিহাসের সাক্ষী। এমনই এক আসন নোয়াখালী-৫। একসময় এই আসনেই মুখোমুখি হতেন দেশের দুই প্রভাবশালী নেতা- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং প্রয়াত বিএনপি নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। ১৯৯১ সালের ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এই আসনে এ দুই নেতা ছিলেন একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে নোয়াখালী-৫ এর রাজনৈতিক চিত্র। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মৃত্যু এবং গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ওবায়দুল কাদেরের দেশে না থাকা, সব মিলিয়ে এই আসনের বহু বছরের পুরোনো সমীকরণ ভেঙে পড়েছে। এখন এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।এক সময় জোটসঙ্গী থাকলেও বর্তমানে দল দুটি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে আলাদা পথে হাঁটছে এবং আসন্ন নির্বাচনে স্বাধীনভাবে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।তবে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন? এই প্রশ্নটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। দলের ভেতরে রয়েছে নানা মতভেদ ও দ্বিধা। অনেকেই মনে করেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের অবর্তমানে নোয়াখালী-৫ এ প্রার্থী হতে পারেন তার তার পত্নী ও সাবেক সাংসদ বেগম হাসনা জসিম উদ্দিন মওদুদ। দুঃসময়ে কর্মীদের পাশে থাকা, মওদুদ আহমদের নামে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা, এবং এলাকায় পারিবারিক ভাবমূর্তির কারণে এখনো অনেক ভোটার তাকে “মওদুদ পরিবারের প্রতিনিধি” হিসেবেই দেখেন। স্থানীয় বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, যদি তিনি মনোনয়ন পান, তবে মওদুদ আহমদের পুরোনো সমর্থকগোষ্ঠী আবারও একত্রিত হতে পারে।বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী দলটির সহ-পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে নিজ নির্বাচনি আসনে দীর্ঘদিন ধরে নিজের নির্বাচনি এলাকায় সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে সংগঠন পুনর্গঠন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং নতুন ভোটারদের আস্থা অর্জনে তিনি নিয়মিত মাঠে রয়েছেন। এছাড়া বিএনপির থেকে আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী দলের প্রভাবশালী নেতা ও ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান মো. ফখরুল ইসলাম। নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি ইতিমধ্যে নিজের সমর্থিত নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করছেন প্রতিনিয়ত। ২০০৯ সালে ফখরুল ইসলামকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চারদলীয় জোট থেকে মনোনয়ন দেন বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। সেই সময় থেকে দলীয় সংকট, মামলা-হামলা কিংবা আন্দোলনের সময়- সবক্ষেত্রেই তিনি থেকেছেন মাঠে। অনেকের মতে, এই অব্যাহত উপস্থিতিই তাকে এখন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রেখেছে।জানতে চাইলে বসুরহাট পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল মতিন লিটন বলেন, দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও। স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা দলীয় নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের আলোকে মনোনীত প্রার্থীকে নিয়ে অর্থাৎ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কাজ করবেন।অন্যদিকে, ভোটের ময়দানে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি নোয়াখালী-৫ এ একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আমীর অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেনের নাম। মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই তিনি দুই উপজেলাজুড়ে গণসংযোগে চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও মানবিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন সক্রিয়ভাবে। এমনকি সম্প্রতি দুর্গাপূজা উপলক্ষে দুই উপজেলার সব পূজামণ্ডপে গিয়ে তিনি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়কে।জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলছেন, এই মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রচারণার মধ্য দিয়েই ভোটারদের মাঝে অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেনের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে। বিএনপির একাধিক মনোয়নয়ন প্রত্যাশী থাকায় ভোটের মাঠে জয়ের ব্যপারে আশাবাদী জামায়াতের নেতাকর্মীরা, এমনটাই বলছিলেন বসুরহাট পৌরসভা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মোশাররফ হোসেন।এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে দলটির নোয়াখালী জেলা দক্ষিণের অর্থ সম্পাদক মাওলানা আবু নাছের। ইতিমধ্যে গণসংযোগসহ ভোটারদের মাঝে প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছে তিনি।এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এখন নতুন ধরনের আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন পর আওয়ামী লীগ ছাড়া একটি বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন দেখতে যাচ্ছে নোয়াখালী-৫। ফলে ভোটারদের আগ্রহ বেড়েছে দ্বিগুণ। কেউ কেউ বলছেন, এবার দলের চেয়ে ব্যক্তির ওপরই নির্ভর করবে ভোটের ফলাফল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থানীয় সংগঠনের কাঠামো, প্রার্থী নির্বাচন এবং মাঠপর্যায়ের প্রচার- এই তিন উপাদানই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কে এগিয়ে থাকবে ভোটের লড়াইয়ে।প্রশাসনিকভাবে দুটি উপজেলা অর্থাৎ কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট এবং সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯০ হাজার নয়শত ৫৯ জন। এর মধ্যে নারী ২ লাখ ৩৫ হাজার নয়শত ৫৯ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৫ হাজার জন। নোয়াখালী-৫ এর রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন দ্বন্দ্ব ছিল দলনির্ভর, তেমনি এবার দেখা যাচ্ছে ব্যক্তিনির্ভর প্রতিযোগিতা। বিএনপি ও জামায়াত- দল দুটি এখন মাঠে আলাদাভাবে লড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই- এই “ভিআইপি আসন” এবার কার দখলে যাবে?
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
