দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এক বছর ধরে চলছে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতি। বেশ কয়েকজন অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও কর্মচারী মাসের পর মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগের পরপরই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যান খানসামা উপজেলার তিন কলেজের অধ্যক্ষ, এক বিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক, এক মাদ্রাসার শিক্ষক এবং একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক।পাকেরহাট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ শাহাদাত আলী সবুজ, খানসামা ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম, হোসেনপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোনায়েম খান, সুবর্ণখুলি সাবুদের হাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আমিনুল হক, খানসামা দ্বি-মূখী ফাজিল মাদ্রাসার ইবতেদায়ী বিভাগের শিক্ষক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মো. মোকসেদুর রহমান, বালাডাঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাফিজুর রহমান সরকার।গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই তারা নিয়মিত অনুপস্থিত থাকলেও সরকারি কোষাগার থেকে এখনো পাচ্ছেন মাসিক বেতন ও ভাতা।প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা জানান, অনুপস্থিত কর্মকর্তারা মাঝে মাঝে হাজিরা খাতায় ভুতুড়ে স্বাক্ষর দিয়ে উপস্থিতির প্রমাণ তৈরি করেন। পরে আবার উধাও হয়ে যান।এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তাঁদের অনেকদিন ধরে দেখা যায় না, কিন্তু হাজিরার খাতায় স্বাক্ষর থাকে। এই স্বাক্ষর কীভাবে হচ্ছে, তা বোঝা বড় কঠিন।’পাকেরহাট সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘কলেজে অধ্যক্ষ নেই, তাই ক্লাসও ঠিকমতো হচ্ছে না। পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’হোসেনপুর ডিগ্রি কলেজ সম্পর্কেও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘অধ্যক্ষ এক বছর ধরে আসেন না। দুপুর ১২টার পর কলেজে তালা পড়ে যায়। শিক্ষক বা ছাত্র—কেউ থাকে না। পুরো কলেজে নীরবতা।’অভিযোগ রয়েছে, এক বছর ধরে দায়িত্বে না থেকেও তারা সরকারি অর্থে নিয়মিত বেতন তুলছেন। এতে সরকারের রাজস্ব খাতে ক্ষতি হচ্ছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।অধ্যক্ষ শাহাদাত আলী সবুজ, মো. সাইফুল ইসলাম, মোনায়েম খান, অফিস সহায়ক আমিনুল হক, শিক্ষক মোকসেদুর রহমান ও হাফিজুর রহমান সরকারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।এ বিষয়ে খানসামা উপজেলা মাধ্যমিক ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা অফিসার মো. শাজাহান সরকার বলেন, ‘পাকেরহাট সরকারি কলেজের বিষয়টি মহাপরিচালক (ডিজি) মহোদয় দেখবেন। বাকি কলেজগুলো আঞ্চলিক পরিচালক পর্যায়ে তদারকি করা হয়। খানসামা দ্বি-মূখী ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষক মোকসেদুর রহমান ইতিমধ্যে শোকজ করা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ম্যানেজিং কমিটির এখতিয়ারে পড়ে, তাই তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে হবে।’এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক আমির আলী বলেন, ‘এখন কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। কলেজ পরিদর্শন ও তদন্ত করে তারপর এই বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’স্থানীয়রা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘এক বছর ধরে কাজ না করেও কীভাবে তারা বেতন পাচ্ছেন? এই দুর্নীতি বন্ধে প্রশাসন কি পদক্ষেপ নেবে?’খানসামা উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ধরনের ভুতুড়ে হাজিরা, অনুপস্থিতি ও বেতন কেলেঙ্কারি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়। এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করছে বলে মনে করছেন শিক্ষানুরাগীরা। তারা অবিলম্বে তদন্ত ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
