মানবিক কারণে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের অনেকেই এখন বাংলাদেশে এক ভয়ংকর বাস্তবতার নাম। তাদের কেউ শ্রমজীবী, কেউ ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত- আবার কেউ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় গড়ে তুলেছেন মাদক সাম্রাজ্য। এমনই এক নাম রোহিঙ্গা ফরিদ, যিনি উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের বাইরে একটি ফার্মেসি খুলে চিকিৎসক সেজে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-সংলগ্ন এলাকায় গেলে চোখে পড়ে একটি আধাপাকা ঘর, উপরে টিন আর বাইরে মোড়ানো ত্রিপল- তাতেই ঝুলছে একটি সাইনবোর্ড, নাম ‘নূর ফার্মেসি অ্যান্ড মেডিসিন কর্নার’। বাইরে থেকে সাধারণ দোকান মনে হলেও, স্থানীয়দের দাবি- এটাই রোহিঙ্গা ফরিদের গোপন ইয়াবা আড্ডা।অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ফরিদ তার ফার্মেসিকে ব্যবহার করছেন আন্তর্জাতিক মাদক লেনদেনের আড়াল হিসেবে। তিনি সীমান্তপথে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ওষুধ মিয়ানমারে পাচার করেন। সেই ওষুধ মূলত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিকিৎসা সহায়তার নামে পাঠানো হলেও বাস্তবে তা যায় মিয়ানমারের মাদক চক্রের হাতে। বিনিময়ে ফরিদ দেশে আনেন বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট, যা পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে উখিয়া ও টেকনাফজুড়ে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই লেনদেন প্রতিদিন রাতের আঁধারে নাফ নদী পাড় হয়ে চলে নির্বিঘ্নে, অথচ প্রশাসনের চোখ যেন সেদিকে ইচ্ছাকৃতভাবেই বন্ধ।একাধিক রোহিঙ্গা সূত্র জানায়, ফরিদ আসলে ডাক্তার না, সে শুধু অভিনয় করে। দোকানে বসে প্রেসক্রিপশন লেখে, কিন্তু তার আসল কাজ মাদক বিক্রি করা। ফার্মেসির ভেতরে থাকা টিনের আলমারিতে থাকে ইয়াবা ও মাদক সরবরাহের হিসাব।ফরিদ শুধুমাত্র একজন খুচরা বিক্রেতা নন- তিনি পুরো নেটওয়ার্কের পাইকারি সরবরাহকারী। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যাম্পের ভেতরে তার বেশ কয়েকটি ছোট ফার্মেসি ও দোকান রয়েছে, যেখানে নিয়মিত সরবরাহ করেন বিভিন্ন ধরণের ঘুমের ট্যাবলেট, কোডিন সিরাপ এবং ইয়াবা ট্যাবলেট। এসব দোকানের মালিক নামমাত্র কর্মচারী, কিন্তু তাদের পেছনে নিয়ন্ত্রক হিসেবে রয়েছেন ফরিদ।অভিযোগ রয়েছে, ফরিদ নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে প্রতিদিন ক্যাম্পের রোগীদের এন্টিবায়োটিক ও ইনজেকশন প্রয়োগ করেন- যে রোগই হোক না কেন। কেউ মাথাব্যথা নিয়ে গেলেও তাকে ইনজেকশনসহ অপ্রয়োজনীয় ওষুধ দেন এবং এভাবে প্রতিদিন বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। ফলে চিকিৎসার নামে চলছে ভয়ংকর প্রতারণা, আর অজ্ঞতার সুযোগে সাধারণ রোহিঙ্গারা ঝুঁকছেন মৃত্যুর মুখে।স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ফরিদের এসব মাদক মালামাল আসে সীমান্তবর্তী নাফ নদীর পয়েন্ট দিয়ে। সেখানে রয়েছে তার রোহিঙ্গা সিন্ডিকেট, যারা মাঝেমধ্যে বাংলাদেশি পাচারকারীদের মাধ্যমেও সরবরাহ করে।একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, ফরিদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু দালালও জড়িত। তার দোকানে নিয়মিত দেখা যায় বাইরের এলাকার যুবকদের আসা-যাওয়া। কিন্তু কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।যেখানে অধিকাংশ রোহিঙ্গা এখনো ত্রিপলের ঘরে দিন কাটান, সেখানে ফরিদের রয়েছে নিজস্ব পাকা ঘর, ব্যয়বহুল মোটরসাইকেল ও জমিজমা। এমনকি সৌদি আরবে তার নামে একটি ফার্নিচার শো-রুমও রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা।ক্যাম্পে বসবাস করা এক রোহিঙ্গা বলেন, ফরিদের ভাই সৌদিতে থাকে। তারা টাকা পাঠায়, কিন্তু সেই টাকা আসে ইয়াবার ব্যবসা থেকে। ওদের জীবনযাত্রা এখন ধনীদের মতো।ফরিদের বিরুদ্ধে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ হলেও প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং তিনি প্রায়ই স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজনের ছত্রছায়ায় থেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।উখিয়ার এক জনপ্রতিনিধি বলেন, আমরা একাধিকবার বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু অভিযোগের পরও এখনো কোনো অভিযান হয়নি। এভাবে প্রশাসন নীরব থাকলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো মাদক কারখানায় পরিণত হবে।বালুখালী ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকার তরুণরা এখন ভয়ংকর আসক্তির শিকার। প্রতিদিনই নতুন নতুন কিশোর মাদক জগতে প্রবেশ করছে। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা বলছেন, মাদকের প্রভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হিংস্রতা ও অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ছেলেরা এখন ফরিদের দোকান ঘিরেই ঘোরে। চিকিৎসার দোকান বলে কেউ কিছু বলতে পারে না, কিন্তু আমরা জানি ভিতরে কী চলে।মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গারা এখন যদি ফার্মেসির আড়ালে মাদক ব্যবসা চালায়, তবে সেটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়- আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও সীমান্তে নজরদারির অভাবে এই নেটওয়ার্ক দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত ফরিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফার্মেসি চালানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।উখিয়ার ঔষধ প্রশাসন কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গারা দোকান চালাচ্ছে- এটি নতুন কিছু নয়। তবে যদি কেউ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকে, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব। খুব দ্রুত অভিযান চালানো হবে।অন্যদিকে, উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউল হক বলেন, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। ফরিদ নামে কেউ যদি সত্যিই ফার্মেসির আড়ালে মাদক ব্যবসা করে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদুল হক বলেন, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছে। খুব শিগগিরই উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করবে।এসআর

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
ড. তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টার শোক
ড. তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টার শোক

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও স্থানীয় সরকার বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও Read more

নড়াইলের দুটি আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ ৯, বাতিল ১৩, স্থগিত ২
নড়াইলের দুটি আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ ৯, বাতিল ১৩, স্থগিত ২

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নড়াইলে দুইটি সংসদীয় আসনে মোট ২৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে ৯ জন প্রার্থীর Read more

ইসরায়েলি সেনাদের আশ্রয়কেন্দ্র উড়িয়ে দিলো ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধারা
ইসরায়েলি সেনাদের আশ্রয়কেন্দ্র উড়িয়ে দিলো  ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধারা

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার পূর্ব খান ইউনিসে ইসরায়েলি সেনাদের আশ্রয় নেয়া একটি বাড়ি উড়িয়ে দিয়েছে ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের যোদ্ধারা। আজ মঙ্গলবার (০১ Read more

মিরপুরে ভবন থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার
মিরপুরে ভবন থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার

রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের পাশে একটি গার্মেন্টস এক্সেসরিজের অফিস থেকে ইমরান হোসেন আফজাল নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন