একটি কার্যকর ন্যায়বিচার ব্যবস্থা, যা সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে, শান্তি স্থাপন, রাষ্ট্র নির্মাণ ও সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ন্যায়বিচার কেবল আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধ ধারণা নয়; এর পরিধি আরও বিস্তৃত ও মানবিক। যদি আমরা স্থায়ী শান্তি কামনা করি, কিংবা সংঘাতের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে চাই, তবে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি ন্যায়নিষ্ঠ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন করা। কারণ ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক লেনদেন ও প্রতিদিনের আচরণের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। এই সামাজিক অভিজ্ঞতাই নির্ধারণ করে সমাজে বিশ্বাস, স্থিতি ও সহাবস্থানের ভিত্তি।ন্যায়বিচার বুঝতে হলে তার কাঠামোর চেয়ে তার কার্যকারিতাকে গুরুত্ব দিতে হয়। দারিদ্র্য, অনিরাপত্তা ও অন্যায়ের মূল উৎস প্রায়ই মানুষের তৈরি নীতি ও ব্যবস্থার ভেতরেই নিহিত থাকে। যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্পদে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্র সীমিত করা হয়, তখনই জন্ম নেয় অনিরাপত্তা, ক্ষোভ ও সহিংসতার পরিবেশ। তদুপরি, অনিয়ন্ত্রিত বা একপাক্ষিক বিনিয়োগের ফলে যখন সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য, পরিবেশ ধ্বংস ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থা দৃঢ় হয়, তখন তা শুধু উন্নয়নের সুযোগ নষ্ট করে না, বরং সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ায়। বিপরীতে, যদি উন্নয়ন কার্যক্রম হয় অন্তর্ভুক্তিমূলক, সংঘাত-সংবেদনশীল ও ন্যায্য, তবে তা শান্তি স্থাপন ও সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।এখন সময় এসেছে ন্যায়বিচার নিয়ে আমাদের আলোচনাকে আরও সাহসী ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন করার। এমন কোনো কাঠামোকে আমরা সমর্থন করতে পারি না, যা বৈশ্বিকভাবে আরোপিত হলেও বাস্তবে লিঙ্গ বৈষম্য, জীবিকার অসম সুযোগ, ভূমি মালিকানায় বৈষম্য বা অন্যায্য করনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। কারণ এইসব কাঠামোগত অন্যায় দূর না করলে টেকসই শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন কখনোই স্থায়ী হতে পারে না।ন্যায়বিচারকে শান্তি নির্মাণের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করতে হলে প্রথমেই আমাদের নির্ধারণ করতে হবে এই লক্ষ্য অর্জনের বাস্তব পথ কী? প্রতিষ্ঠান গঠন অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। কেবল প্রতিষ্ঠান নির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই জনগণের বাস্তব চাহিদার পরিবর্তে রাজনৈতিক বা দাতা সংস্থার অগ্রাধিকারে সীমিত থাকে। অথচ প্রকৃত ন্যায়বিচারের দর্শন অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকেরই অধিকার থাকা উচিত তাদের শাসনব্যবস্থা গঠন ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার। ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই ন্যায় নিশ্চিত করে না। আইনের অধীনে সমান সুযোগ পাওয়া এক বিষয়, কিন্তু আইনের সামনে প্রকৃত সমতা অর্জন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অধিকতর গভীর একটি লক্ষ্য।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আদালত বা সংবিধানের সীমা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত। এখানে ন্যায় নির্ভর করে স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি বাজেটের ন্যায্য বণ্টন, জাতিগত ও সামাজিক সমতা, এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মতো দৈনন্দিন বাস্তবতার ওপর। এই কারণেই ন্যায় ও শান্তিকে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পারস্পরিক সম্পূরক একটি অভিন্ন ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। শান্তি ও ন্যায়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হতে পারে একটি স্থিতিশীল ও ন্যায্য সমাজ গঠনের কার্যকর পথ।যৌথ প্রয়াসের মাধ্যমে আমরা দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ন্যায়ের কৌশল ও শান্তির পদ্ধতি পুনর্বিন্যাস করতে পারি। সময় ও পরিস্থিতির আলোকে উপযুক্ত পদক্ষেপ বেছে নেওয়া এবং জনগণের অভিজ্ঞতা ভিত্তিক বাস্তবায়ন এগুলোই হতে পারে ভবিষ্যতের টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের ভিত্তি।ন্যায়বিচার মূলত ক্ষমতার কাঠামোর প্রতিফলন। তাই যদি আমরা এমন এক সমাজ গড়তে চাই, যেখানে মানুষ অধিকার, সম্পদ ও সুযোগের অভাবে নয় বরং ন্যায়ের অভিজ্ঞতায় নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করে, তাহলে আমাদের সাহস থাকতে হবে ক্ষমতার বণ্টন ও ব্যবহারকে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় উভয় পর্যায়েই পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্গঠন করার।লেখক: জোসেফ মাহতাব, মানবাধিকার কর্মী।

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
মেয়েকে সাঁতার শেখাতে গিয়ে পানিতে ডুবে বাবা-মেয়ের মৃত্যু
মেয়েকে সাঁতার শেখাতে গিয়ে পানিতে ডুবে বাবা-মেয়ের মৃত্যু

মৌলভীবাজারের জুড়ীতে মেয়েকে সাঁতার শিখাতে গিয়ে পুকুরের পানিতে ডুবে বাবা-মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। আজ সোমবার বিকেল ৪টায় জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের হামিদপুর Read more

ওমরাহ যাওয়ার আগেই কাটতে হবে ফিরতি টিকিট
ওমরাহ যাওয়ার আগেই কাটতে হবে ফিরতি টিকিট

ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যেতে ইচ্ছুক বিশ্বের সব দেশের নাগরিকদের জন্য এবার বাধ্যতামূলকভাবে রিটার্ন টিকিট কাটার নির্দেশ কার্যকর করা Read more

আশুলিয়ায় হত্যা মামলার আসামি ধরতে গিয়ে হামলার শিকার পুলিশ
আশুলিয়ায় হত্যা মামলার আসামি ধরতে গিয়ে হামলার শিকার পুলিশ

আশুলিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ সদস্যের ওপরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আহত পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে স্থানীয় Read more

হাদির দাফন শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাসনাত আব্দুল্লাহ
হাদির দাফন শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাসনাত আব্দুল্লাহ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে শায়িত হলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। শনিবার (২০ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার Read more

দেওয়ানগঞ্জে শসার বাম্পার ফলন, কিন্তু হাসি নেই কৃষকের মুখে
দেওয়ানগঞ্জে শসার বাম্পার ফলন, কিন্তু হাসি নেই কৃষকের মুখে

কৃষিনির্ভর জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় বিগত কয়েক বছর ধরে শসা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কৃষকরা। যেমন ফলন হয়েছে, আবার তেমনি Read more

গৌরীপুরে সাংবাদিকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে সমাবেশ ও স্মারকলিপি
গৌরীপুরে সাংবাদিকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে সমাবেশ ও স্মারকলিপি

জাতীয় গণমাধ্যম সপ্তাহের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে বুধবার (১৬ এপ্রিল) ময়মনসিংহ গৌরীপুরে সাংবাদিকদের সমাবেশ ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন