বাংলাদেশে গণভোট, জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধের মধ্যেই সারা দেশে নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি।বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগেই তিনি দেশে ফিরছেন এবং নির্বাচনেও অংশ নেবেন।বিএনপি দেশের বিভিন্ন সংসদীয় আসনে দলীয় প্রার্থী বাছাই, তৃণমূলে সভা-সমাবেশ এবং ধানের শীষের পক্ষে গণসংযোগ শুরু করেছে মাসখানেক আগে।তবে এবার বিএনপি এমন এক সময়ে নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করেছে যখন মাঠে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ নেই। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশ নেওয়াও অনিশ্চিত।এমন অবস্থায় বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে চলে এসেছে বিএনপিরই একসময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী। দলটি নির্বাচনের প্রার্থী নির্দিষ্ট করে প্রস্তুতি শুরু করেছে আরও প্রায় বছরখানেক আগে।যদিও অতীতে নির্বাচনে দলটির যে ভোট তাতে করে জামায়াত বিএনপিকে আদৌ কোনো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারবে কি-না, সে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।তবে মাঠপর্যায়ে জামায়াতকে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপের ফলে জামায়াতের সমর্থন বিএনপির কাছাকাছি উঠে আসায় জামায়াতের নেতারাও বিভিন্ন সময় আগামী নির্বাচনে জয়ের আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।জামায়াত বিভিন্ন দলকে নিয়ে বিএনপি বিরোধী আলাদা একটি জোট তৈরির চেষ্টাও করছে।তবে এর বাইরেও নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকরা ভোট দিতে যাবেন কিনা কিংবা গেলে কোন দলকে সমর্থন করবেন, সেটাও নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে বলে অনেকে মনে করছেন।গত সোমবার সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ঝিকিরা মধ্যপাড়াগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট এক মাঠে বিএনপির জনা পঞ্চাশেক কর্মী জড়ো হয়েছেন। বৈঠকটির আয়োজক ছিলেন উল্লাপাড়া উপজেলা বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতা।উঠান বৈঠকে বিএনপির একত্রিশ দফা সম্বলিত লিফলেট তুলে দেওয়া হয় কর্মী-সমর্থকদের হাতে। দলের পক্ষে এবং ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার আহ্বানও জানানো হয়।যদিও উল্লাপড়ার আসনটিতে দলের প্রার্থী নির্দিষ্ট করা হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে অন্তত: ছয়জন সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে আছেন দলীয় সমর্থন পাওয়ার আশায়।নির্বাচনের প্রস্তুতি কেমন, এমন প্রশ্নে উল্লাপাড়া পৌর বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তৃণমূলে সব গ্রামে তারা ছোট ছোট সভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।তিনি, বলেন, আমরা সব ইউনিয়নে ও গ্রামে উঠান বৈঠক এবং প্রচারণা করছি। আমরা প্রচারণা একটু পরে শুরু করেছি এটা ঠিক। এর একটা কারণ হচ্ছে আমাদে বিএনপিতে পাঁচ থেকে ছয়জন ক্যান্ডিডেট। এখন আমরা যার যার মতো ধানের শীষ প্রতীকে প্রচারণা চালাচ্ছি।বিএনপি যখন উঠান বৈঠকে ব্যস্ত সেই একইদিনে জামায়াতকেও দেখা যায় উল্লাপাড়ার করতোয়া নদীর পাড়ে নিজস্ব কর্মসূচিতে। তাদের আয়োজন অবশ্য নৌকাবাইচ।নদীর পাড়ে বড় মঞ্চ বানিয়ে সেখানে নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা যায় উল্লাপাড়ায় জামায়াতের প্রার্থী এবং দলটির কেন্দ্রীয় নেতা রফিকুল ইসলাম খানকে। মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে নেতাকর্মীরা দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট চেয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন।দলটির উল্লাপাড়া উপজেলা আমীর শাহজাহান আলী বলেন, তারা প্রচারণা শুরু করেছেন একবছর আগে। তিনি বলেন, আমরা বলা যায় প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়েছি। কোনখানে বাদ রাখি নাই। সামাজিক কাজ, দলীয় প্রোগ্রাম, সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সবকিছুর মাধ্যমে দলের প্রার্থী মানুষের কাছে গেছেন। ভোটের জন্য এজেন্ট নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের কাজও আমাদের শেষের পথে।তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে শুধু জিতবো না বরং দুই-তৃতীয়াংশ আসনে ইনশাআল্লাহ জয়ী হবো’ বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলছিলেন উপজেলা জামায়াত আমির শাহজাহান আলী।কিন্তু এতো আত্মবিশ্বাসেরও কয়েকটি কারণ উল্লেখ করছে জামায়াত আমির।এক. জামায়াত তাদের প্রার্থী ঠিক করে ফেলেছে। অন্যদিকে বিএনপি এখনও প্রার্থী নির্দিষ্ট করতে পারেনি। তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী আবার একাধিক।দুই. বিএনপির ‘চাঁদাবাজি ও দখলের কারণে’ মানুষ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।তিন. ভোটাররা ‘পরিবর্তন চায়’।তবে বিএনপি আবার এসব কারণ নাকচ করছে। দলটির উল্লাপাড়া পৌর বিএনপির আহ্বায়ক আহ্বায়ক বিবিসিকে বলেন, ‘উল্লাপাড়া বিএনপির ঘাঁটি। ফলে এখানে জামায়াত কখনই বিএনপির ভোট কাটতে পারবে না।’এর কারণগুলোও তুলে ধরেন তিনি।প্রথমত: দলে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলেও তারা মূলত: ধানের শীষের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। এতে দলের লাভ হচ্ছে। তাছাড়া দলে কোনো কোন্দলও নেই।দ্বিতীয়ত: ৫ আগস্টের পরে কিছু চাঁদাবাজি ও দখলের ঘটনা ঘটলেও এখন সেটা বন্ধ হয়েছে। বরং ‘জামায়াত এখন চাঁদাবাজি ও দখল করছে’।এখন প্রশ্ন জামায়াত কি পারবে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করতে? উল্লাপাড়ায় এর আগে জামায়াতের কারও সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ইতিহাস নেই। আসনটিতে এতোদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে মূলত: আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। কিন্তু ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মাঠে কার্যত: আওয়ামী লীগ নেই।অন্যদিকে একক প্রার্থী ঠিক করে আগেভাগেই প্রস্তুতি শুরু করায় জামায়াত মনে করছে তাদের অবস্থান এমনকি নির্বাচনে জেতার মতো পর্যায়ে চলে গেছে।সবমিলিয়ে বিএনপি মনে করে জামায়াত তাদের জন্য বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। অন্যদিকে জামায়াত মনে করছে, তারা জেতার মতো অবস্থায় আছে।কিন্তু সাধারণ ভোটাররা কী মনে করছেন?উল্লাপাড়ার সোনতলা ব্রিজের কাছে কথা হয় কয়েকজনের সঙ্গে। এদের মধ্যে জামান মিয়া নামে একজন মুদি দোকান ব্যবসায়ী বলেন, নির্বাচনে লড়াই হবে।‘আওয়ামী লীগ তো এখন নাই। কিন্তু বিএনপি আর জামায়াত টক্কর হবে।’আওয়ামী লীগের ভোটে নজর দুই দলেরসিরাজগঞ্জে সংসদীয় আসন আছে ছয়টি। এর সবগুলোতেই জেতার কথা বলছে বিএনপি এবং জামায়াত উভয় দলই।তবে সিরাজগঞ্জের জামায়াত কিংবা বিএনপি উভয় দলের নেতারাই মনে করছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকদের ভোট তারাই পাবেন।তবে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সহসভাপতি অমর কৃষ্ণ দাস বলেন, গণতন্ত্রের প্রয়োজনেই আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা বিএনপিকে সাপোর্ট করবে।এবি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
