টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. মোহাম্মদ আব্দুস সোবহান নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণে একের পর এক খবরের শিরোনামে উঠে এসেছিলেন। এভাবে দীর্ঘ তিন বছর পদ আঁকড়ে ধরে থাকলেও অবশেষে কর্তৃপক্ষ তাঁকে বদলি করেছে।সোমবার (৬ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. এবিএম আবু হানিফ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ডা. সোবহানকে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সোহাগপুর ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার হিসেবে বদলি করা হয়।প্রজ্ঞাপনে এই আদেশকে ‘বদলি’ বলা হলেও ভূঞাপুরের সাধারণ মানুষের মতে এটি কার্যত ‘ডিমোশন’। কারণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করার পর তাঁকে শাস্তি স্বরূপ ইউনিয়ন পর্যায়ের ছোট একটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে, যেখানে প্রশাসনিক কোনো ক্ষমতাও নেই।এদিকে টিএইচও আব্দুস সোবহানের বদলির খবর মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। একই সঙ্গে দাবি উঠেছে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার।জানা গেছে, ডা. সোবহান একজন মেডিকেল অফিসার হয়েও ২০২২ সাল থেকে ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। যদিও বদলির প্রজ্ঞাপনে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে তিনি নিজের পদবিতে কখনো ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। বরং পদে বসার পর থেকেই তিনি অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং লুটপাটে ব্যস্ত ছিলেন। তিন বছরের দায়িত্বকালে হাসপাতালের সার্বিক অব্যবস্থাপনা চরমে পৌঁছায়। দীর্ঘদিন চলা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি রোগীদের ভোগান্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।সরকারি অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে তিনি ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ, মসজিদের অনুদানের টাকা নিজের দখলে নেওয়া এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। এছাড়া অফিস সময়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখা ছিল নিয়মিত ঘটনা।হাসপাতালের এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি পরীক্ষার জন্য রোগীদের মধ্যে রসিদ না দিয়ে অল্প সংখ্যক পরীক্ষা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে বাকি টাকা তিনি নিজের দখলে রাখতেন। রসিদ বই ও রেজিস্টার্ড খাতও নিজের কাছে রেখে, সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া টাকা নিজেই রসিদ তৈরি করতেন। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারের হাতে পৌঁছাতো না।এছাড়া, সরকারি বিভিন্ন ট্রেনিং ও প্রোগ্রামের জন্য উত্তোলিত টাকা তিনি চেকের মাধ্যমে অল্প কিছু বিতরণ করে বাকি নিজের পকেটে তোলার অভিযোগ রয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্যপণ্যের ঠিকাদারের কাছ থেকেও বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ায় ঠিকাদাররা ঘুষের টাকার উশুল করতে কম এবং নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করতেন। এর ফলে রোগীরা প্রাপ্য খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং হাসপাতালের সেবা ক্ষুণ্ণ হচ্ছিল।এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত বছরের ১০ জুলাই টাঙ্গাইল সিভিল সার্জন মো: মিনহাজ উদ্দিন মিয়ার নিকট লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পরদিন হাসপাতাল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তবে সিভিল সার্জনের হাসপাতাল থেকে যাওয়ার পর অভিযোগকারীদের উপর নানা ভয়ভীতি প্রয়োগ করে স্বাক্ষরের জন্য সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিতে বাধ্য করতেন ডা. সোবহান। এতে অভিযোগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করেছিল।অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁর অনিয়মের প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি ও বদলির হুমকি দেওয়া হতো। এমনকি তিন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও মামলা করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। যার ফলে তাঁর বিরুদ্ধে হাসপাতালে তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস কেউ পাননি।সময়ের কণ্ঠস্বরসহ একাধিক গণমাধ্যমে এসব অভিযোগ প্রকাশিত হলেও দীর্ঘদিন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকার কারণে তিনি অক্ষত ছিলেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তবে দীর্ঘ সময় পর হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।অভিযোগের বিষয়ে ভূঞাপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুস সোবহান ও টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. ফরাজী মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম মন্জুকে ফোন করা হলেও তারা রিসিভ করেননি।এ সম্পর্কিত আগের সংবাদ- রোগী পরীক্ষার বেশিরভাগ টাকা যায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পকেটে!ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন দুর্ভোগের এক স্থায়ী ঠিকানা!ভূঞাপুর হাসপাতালে ছাদ চুইয়ে পানি, নষ্ট যন্ত্রপাতি ও সেবার বেহাল দশাএসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
