সকালবেলা ভোরের নীরবতা ভেঙে শোনা যায় কাঠের ঘানির কর্কশ শব্দ। সেই শব্দই জানিয়ে দেয় সরিষা থেকে ঝরছে খাঁটি তেল। তবে এ ঘানি কোনো গরু বা আধুনিক মেশিনে চলে না। এ ঘানির শক্তি হলো মানুষের বুকের জোর। আর সেই মানুষটি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি পাগলাটারি গ্রামের বাসিন্দা মোস্তাকিন আলী।বয়স তার ৬৫। শরীরের জোড় ভেঙে পড়েছে, তবুও থেমে নেই সংগ্রাম। ঘানি টানার চক্রে পেটের সাথে বাঁধা কাঠ, আর সঙ্গে রয়েছেন জীবনের সঙ্গী ছকিনা বেগম। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে স্বামী–স্ত্রী মিলে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুরতেই থাকে তাদের এই জীবনের চাকা।দিনে পাঁচ কেজি সরিষা ভাঙতে ঘানি টানতে হয় টানা ৮ ঘণ্টা। তাতে মেলে মাত্র সোয়া লিটার তেল আর তিন কেজির মতো খৈল। এত অমানুষিক পরিশ্রমের পরও তাদের সংসার চলে অতি কষ্টে। ফজরের নামাজ শেষে শুরু হয় জীবনযুদ্ধ, আর শেষ হয় যহরের সময়। দু’জনের ক্লান্ত শরীর-ঘাম আর পরিশ্রম মিশে তৈরি হয় প্রতিদিনের সোনালি রঙের সরিষার তেল।বিকেলে স্থানীয় বাজার কিংবা গ্রামে নিয়ে গিয়ে কেজি প্রতি ২০০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। সব খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে সর্বোচ্চ আড়াইশ টাকা। এ টাকা দিয়েই চলছে তাদের ছয় সদস্যের সংসার। সংসারে আছেন দুই প্রতিবন্ধী ছেলে, তালাকপ্রাপ্ত মেয়ে এবং নাতি। সবাই একসঙ্গে ভরসা রেখেছেন বৃদ্ধ দম্পতির ঘানি টানা আয়ের ওপর।একসময় গরু ছিল, সেই গরুই চালাত তাদের ঘানি। কিন্তু অভাবের তাড়নায় সেই গরু বিক্রি করতে হয়েছে তার। এখন সহায়-সম্পত্তি বলতে আছে শুধু ভিটেমাটি আর শেষ সম্বল এই কাঠের ঘানি। তবুও থেমে যায়নি তাদের লড়াই-সংগ্রাম।তবে এখন আর আগের মতো শক্তি নেই। ক্লান্ত শরীর, ভাঙা বয়স, তবুও বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের শরীর দিয়েই ঘানি চালান মোস্তাকিন আলী। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এসেছে, তবুও জীবিকার টানে প্রতিদিনই তাকে ঘানি টানতে হয়। এসময় পাশে থাকেন তার স্ত্রী, যিনি একদিকে জীবনের সঙ্গী, অন্যদিকে সংগ্রামেরও সাথী।মোস্তাকিন আলী সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ঘানি টানতাম। তারপর প্রায় ৩৫ বছর ধরে এভাবেই সংসার চালিয়ে আসছি। কিন্তু বয়সের কারণে এখন আর শরীর সায় দেয় না, হাঁপিয়ে যাই। আগে গরু দিয়ে কাজ হতো, কিন্তু অভাবের তাড়নায় সেই গরুও বিক্রি করতে হয়েছে। গরু কেনার টাকা আমার নেই, তাই বুক দিয়েই ঘানি টানতে হয়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত খেটে মরলেও সংসার চলে না। যদি কেউ একটা গরু কিনে দিত।’স্ত্রী ছকিনা বেগম সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘এখন বয়স হয়েছে, শরীর আর আগের মতো নেই। তবুও প্রতিদিন স্বামীর সঙ্গে ঘানি টানতে হয়। তিনবেলা ঠিকমতো খাবারও জোটে না, অভাবের টানে দিন কাটাতে হয়। ঘানি টানতে টানতে বুক ব্যথায় হাঁপিয়ে উঠি। যদি একটা গরু থাকত, তাহলে অন্তত আমাদের কষ্ট কিছুটা হলেও কমত।’বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রতিবেশীরা সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, ‘মোস্তাকিন আলী আর ছকিনা বেগম দু’জনই সারাজীবন পরিশ্রম করে সংসার চালাচ্ছেন। এখন বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, তবুও প্রতিদিন বুক দিয়ে ঘানি টেনে সংসার চালাতে হয়। আমরা চোখের সামনে দেখি কী অমানুষিক কষ্ট তারা করে। সংসারে দুই প্রতিবন্ধী ছেলে রয়েছে। মাঝে মাঝে এলাকাবাসী মিলে কিছু সাহায্য করার চেষ্টা করি, কিন্তু সেটা তাদের প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই নয়। এমন পরিস্থিতিতে সত্যিই তাদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। সমাজের বিত্তবানরা যদি একটু সাহায্যের হাত বাড়ান, তবে হয়তো তাদের জীবনে শান্তি ফিরবে।’কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রীতম সাহা সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোস্তাকিন আলীকে এর আগেই দুটি গরু সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি সেই দুটি গরু বিক্রি করে দিয়েছেন। তারপরও আমরা মানবিক দিকটি বিবেচনা করে তাঁকে পুনরায় সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, এমন দারিদ্র্য ও পরিশ্রমী মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জীবনযাত্রা কিছুটা সহজ করা।’এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
