বেতন হাতে পেলেই সাধারণত চাকরিজীবীদের মুখে হাসি ফোটে। কিন্তু সেই হাসি বেশিদিন টেকে না। মাসের শুরুতেই বাসা ভাড়, বাজার, কিস্তি, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল মেটাতে গিয়ে দ্রুতই পকেট হালকা হতে শুরু করে। মাসের মাঝামাঝি আসতেই অনেকে নতুন খরচে বিপাকে পড়েন। আর মাসের শেষ সপ্তাহ যেন একেবারে ‘টাকার অনাহারে’ কাটে।বর্তমান নগরজীবনে এ চিত্র নতুৃন কিছু নয়। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও তরুণ চাকরিজীবী শ্রেণি বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। অনেকে আবার অগত্যা ধার করেই চলতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনভাবে পরিকল্পনা না করলে এই ‘দুষ্টচক্র’ থেকে বের হওয়া কঠিন।সাধারণ বেতনের সাথে খরচের প্রবণতা এক ধরনের সমানুপাতিক যোগ রয়েছে। তাছাড়া পরিবার বা ব্যক্তিগত জীবনের চাহিদা বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। এসব কারণেই মূলত মাস শেষে হিমশীম খেতে হয় নির্দিষ্ট আয়ের চাকরীজীবীদের। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে কিছু অদৃশ্য কারণ। এগুলো হলো: -নির্দিষ্ট বাজেট না থাকা: বেশিরভাগ মানুষ মাসিক খরচের কোনো লিখিত বাজেট করেন না। ফলে কতখানি খরচ হয়ে গেল, তা বুঝে ওঠার আগেই টাকায় টান পড়ে। -অপ্রয়োজনীয় খরচ: শপিং, রেস্টুরেন্টে খাওয়া, অনলাইন কেনাকাটা ইত্যাদি খরচ পরিকল্পনার বাইরে চলে গেলে সঞ্চয়ের সুযোগ থাকে না।-ক্রেডিট কার্ডের ফাঁদ: বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো লোভজনক অফারে গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ড প্রদান করে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাংকগুলোর এসব অফার সুবিধাজনক মনে হলেও এগুলো আসলে একধরনের ফাঁদ। মাস শেষে এই ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করতে গিয়ে চাপ বেড়ে যায় অনেকে।-জীবনধারার চাপ: মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বাস করতে গিয়ে অনেকেই অন্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চাই। এতে করে অনেকেই আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করেন।করণীয় কী?১. বাজেট তৈরি ও তা মানামাসের শুরুতেই বাজেট তৈরি করে নিন। বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, বিদ্যুৎ, পানি, জরুরি খরচ সেই অনুযায়ী খরচ করুন। মাসের শুরুতে আয় থেকে কিছু অংশ জমিয়ে রাখুন। সেই টাকা বাজেটের বাইরে প্রয়োজন না হলে খরচ করবেন না।২. ৫০–৩০–২০ ফর্মুলাবিশ্বব্যাপি ‘মানি ম্যানেজম্যানন্টের’ (অর্থ ব্যবস্থাপনা) একটি জনপ্রিয় ফর্মুলা হলো ৫০–৩০–২০। এ নিয়ম অনুযায়ী, আপনার আয়ের ৫০% আয় যাবে প্রয়োজনীয় খরচে (ভাড়া, বাজার, বিল ইত্যাদি), ৩০% আয় ব্যবহার হবে ব্যক্তিগত ইচ্ছা পূরণে (শপিং, বিনোদন), ২০% আয় যাবে সঞ্চয়ে। এই নিয়ম মেনে চললে মাস শেষে টাকার ঘাটতি কমে আসবে।৩. সঞ্চয়ের আলাদা অ্যাকাউন্টবেতন হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা অন্য একটি সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করুন। সেই টাকা আর স্পর্শ করবেন না।৪. খরচ ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহারবর্তমানে অনেক ফ্রি মোবাইল অ্যাপ আছে যেখানে প্রতিটি খরচের হিসাব রাখা যায়। দিনে দিনে খরচ লিখে রাখলে বুঝতে পারবেন কোন খাতে অপ্রয়োজনীয় খরচ হচ্ছে।৫. জরুরি তহবিল তৈরিহঠাৎ কোনো অসুস্থতা বা দুর্ঘটনায় ধার না করতে হয়, এজন্য আলাদা একটি এমার্জেন্সি ফান্ড রাখা জরুরি। ধীরে ধীরে হলেও এটি জমাতে হবে।৬. ক্রেডিট কার্ডে সতর্কতাবিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের অভ্যাস ত্যাগ করুন। ইচ্ছেমতো শপিং করতে গিয়ে মাস শেষে বড় অঙ্কের বিল মেটানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে।৭. সংযমপ্রতিদিন রেস্টুরেন্টে খাওয়ার বদলে সপ্তাহে একদিন বাইরে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিন। অনলাইনে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার অভ্যাস কমান। ছোট ছোট পরিবর্তন বড় সাশ্রয় এনে দেবে।মাস শেষে হাতে টাকা না থাকা এখন অনেকেরই নিত্যদিনের যন্ত্রণা। তবে এর সমাধান অসম্ভব নয়। একটু সচেতনতা, পরিকল্পিত খরচ এবং সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলেই পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। অন্যথায় মাস শেষে পকেট শূন্যতার দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্তি মিলবে না।আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
