চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক। দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক। প্রতিদিন হাজারো বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার যাতায়াত করে এই পথে। নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের অজুহাতে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের চেকপোস্ট বসানো হয়। কিন্তু এই চেকপোস্টেই যদি পুলিশের বদলে সাধারণ কিছু লোক গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চালায়—তাহলে সেটি কতটা বৈধ?শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার পর চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেরানীহাটের উত্তরে খুনি বটতল চেকপোস্টে এমনই চাঞ্চল্যকর দৃশ্য চোখে পড়ে এ প্রতিবেদকের। পুলিশের বদলে সাধারণ পোশাক পরা কয়েকজন যুবক বাস-ট্রাক থামাচ্ছিলেন, যাত্রীদের ব্যাগপত্র নাড়াচাড়া করছিলেন, এমনকি গাড়ির ভেতরে ঢুকেও উঁকি মারছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যরা তখন কেবল তাকিয়ে ছিলেন। এই দৃশ্যের ভিডিও প্রমাণও সংগ্রহ করেন প্রতিবেদক। আইনের শাসনের প্রশ্নে একে গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।শনিবার রাত ৮টার পর মহাসড়ক ধরে চলতে গিয়ে দেখা যায়, একদল যুবক চেকপোস্টে প্রাইভেট কার তল্লাশি করছে। তাদের কারও গায়ে পুলিশের পোশাক নেই, কোনো সরকারি পরিচয়পত্রও নেই। গাড়ির ভেতর উঁকি দিয়ে ব্যাগপত্র নেড়েচেড়ে দেখছেন তারা। চালকদের সঙ্গে তর্কও করছেন।একজন চালক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা তো জানিই না এরা কারা। পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তল্লাশি করে এরা। এরা সুযোগ পেলেই টাকা চায়।’একই কথা বললেন একটি দূরপাল্লার বাসের সুপারভাইজার। তার ভাষায়, ‘গাড়ি থামাল বাইরের লোক, যাত্রীদের ব্যাগ খুলে দেখছে তারাই। পুলিশ যদি তল্লাশি করত, অন্তত ভয় থাকত না। এখন তো বোঝার উপায় নেই—এরা কারা, কী উদ্দেশ্যে আসছে।’বাংলাদেশ পুলিশ আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, যানবাহন থামানো, যাত্রী বা মালামাল তল্লাশি করার ক্ষমতা কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের। কোনো বেসরকারি ব্যক্তি এ কাজ করতে পারে না।চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, ‘চেকপোস্টে বাইরের লোক দিয়ে গাড়ি থামানো বেআইনি। আইনের চোখে তারা অপরাধ করছে। এতে শুধু নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন হয় না, বরং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। যদি এরা কারও কাছে মাদক বা অবৈধ কিছু গোপনে ঢুকিয়ে দেয়—তাহলে দায় নেবে কে?’তিনি আরও বলেন, ‘চেকপোস্টের উদ্দেশ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেখানে যদি অজানা লোকজন ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তাহলে নিরাপত্তা নয়—বরং ঝুঁকিই বাড়বে।’সাতকানিয়ার এক কলেজছাত্রী বলেন, ‘বাসে ভ্রমণের সময় এসব বাইরের লোক এসে ব্যাগ খুলে দেখে। আমরা মেয়েরা ভয়ে থাকি—কোনো অশোভন আচরণ করলে কার কাছে অভিযোগ করব?’অনেকে বলছেন, পুলিশ কি তাহলে এখন আউটসোর্সিং করছে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ যদি বাইরের লোককে দেওয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা পাবে কীভাবে?আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যদি নিজেরাই আইন ভঙ্গ করে, তাহলে নাগরিক আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজন হলে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে, দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘চেকপোস্টে বাইরের লোক তল্লাশির কাজে জড়িত হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
